ফনেটিক ইউনিজয়
রোহিঙ্গা সংকট : সাপ-লুডু খেলছে মিয়ানমার
মাসুদুর রহমান

রোহিঙ্গা স্রোত বাংলাদেশে আসার একবছর পেরিয়ে গেলেও সংকটের শেষ কোথায়, তা কেউ বলতে পারছে না। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সেপ্টেম্বরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে দেয়া ভাষণে বলেছেন, বাংলাদেশের পক্ষে আর এ বিপুল সংখ্যক মানুষের বোঝা টানা সম্ভব নয়। চুক্তি করেও রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসনের কথা রাখেনি মিয়ানমার। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় বিশেষ করে পশ্চিমা বিশ্ব মিয়ানমারের ওপর চাপ অব্যাহত রেখেছে। রাখাইন রাজ্যে রোহিঙ্গাদের জন্যে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি করে তাদের ফিরিয়ে নিতে বলেছে। মিয়ানমার তাতে আন্তরিক সাড়া দিচ্ছে না। প্রতিবেশী চীন ও ভারত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জোরালো উদ্যোগ নিচ্ছে না। ফলে রোহিঙ্গা সংকট ক্রমেই বহুমুখী সমস্যার সৃষ্টি করছে। আন্তর্জাতিক চাপ থেকে বাঁচতে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেবে বলে লোক দেখানো চুক্তি করে। এখন আবার আগের জায়গাতেই ফিরে গেছে। মিয়ানমার ধোঁকা দিচ্ছে পৃথিবীকে, আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের সঙ্গে সাপ-লুডু খেলছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তনিও গুঁতেরেস জাতিসংঘ শরণার্থী সংস্থার প্রধান থাকাকালে বাংলাদেশ সফর করেছিলেন। তিনি পুরো বিষয়টি খুব ভালোভাবেই জানেন। যুক্তরাষ্ট্র ও ইইউ রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে। ইইউ মিয়ানমারের বিরুদ্ধে অর্থনৈতিক নিষেধাজ্ঞা আরোপের চিন্তা-ভাবনা করছে। যুক্তরাষ্ট্র নানাভাবে চাপ দিচ্ছে। তবে প্রতিবেশী চীন ও ভারত এ ব্যাপারে জোরালো ভূমিকা না নেয়ায় মিয়ানমারকে চাপে টলানো যাচ্ছে না। এ পরিস্থিতিতে জাতিসংঘ মহাসচিব চীন ও ভারতকে আরও জোরালো ভূমিকা পালনের আহ্বান জানিয়েছেন। বাংলাদেশ রোহিঙ্গা সংকটের কারণে বড় ধরনের সমস্যার মধ্যে পড়েছে। তাই বাংলাদেশের উচিত হবে এ সংকটের ব্যাপারে বিশ্বের সব মানুষের দৃষ্টি আকর্ষণে প্রচারণা চালিয়ে যাওয়া। ভূ-রাজনীতির কারণে চীন ও ভারত রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে জোরালো ভূমিকা নিচ্ছে না। তারা মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক কিছুতেই ক্ষতি করতে চায় না। মিয়ানমারের সঙ্গে ব্যবসা-বাণিজ্য সবই করতে চায়। স্বার্থের কাছে মানবতা পরাজিত হয়েছে। ইউরোপ ও আমেরিকা মানবতার কারণে কিছুটা ভূমিকা পালন করছে। তবে চাপটা আরও জোরালো হওয়া প্রয়োজন।  
মিয়ানমারের সীমান্ত চৌকিতে গত বছরের ২৫ আগস্ট হামলা হলে কয়েকজন মিয়ানমারের সৈন্য নিহত হয়। তার জের হিসেবে মিয়ানমার রোহিঙ্গা অধ্যুষিত রাখাইন রাজ্যে সেনা অভিযান শুরু করে। রোহিঙ্গাদের নির্বিচারে হত্যা করে। তাদের বাড়িঘরে আগুন জ্বালিয়ে দেয়। রোহিঙ্গা নারীদের গণধর্ষণ করে। নিষ্ঠুর দমন-পীড়নের মুখে রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে আশ্রয় নিতে শুরু করে। উদ্ভূত পরিস্থিতিতে মানবিক কারণে বাংলাদেশ সীমান্ত খুলে দেয়। ফলে ১০ লাখের বেশি মিয়ানমারের সংখ্যালঘু রোহিঙ্গা মুসলমান বাংলাদেশে আশ্রয় গ্রহণ করে। এই ঘটনার এক মাস পর জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ভাষণদানকালে রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে মিয়ানমারের ওপর চাপ সৃষ্টির জন্যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি আহ্বান জানান। চাপের মুখে মিয়ানমার রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে রাজি হয়। এ লক্ষ্যে বাংলাদেশের সঙ্গে একটি দ্বিপক্ষীয় চুক্তি সই করে। কিন্তু চুক্তি করেও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেয়নি মিয়ানমার। কার্যত মিয়ানমার আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়কে ধোঁকা দিতে মিথ্যাচার করে যাচ্ছে। তার সর্বশেষ প্রমাণ হলো, ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের একটি ছবিকে তারা রোহিঙ্গাদের নিষ্ঠুরতা বলে চালিয়ে দিয়েছিল। কিন্তু বার্তা সংস্থা রয়টার্স তা পরীক্ষা করে ধরে ফেলে।
রোহিঙ্গা সংকটের কারণ কি শুধু সীমান্ত চৌকিতে হামলার জের, নাকি তারচেয়ে বেশি কিছু- এ নিয়ে আলোচনা হচ্ছে বিভিন্ন মহলে। মিয়ানমারের বৌদ্ধ সমাজে নীতি-নির্ধারক হলেন ধর্মীয় নেতা তথা গেরুয়া বসনের মংগণ। ৫০ বছরের সেনা শাসনকালে সহনশীলতা ও বৈচিত্র্য প্রায় বিলুপ্ত হয়ে গেছে। মহামতি গৌতম বুদ্ধের ‘অহিংসা পরম ধর্ম’- নীতি পাল্টে ধর্মের নামে সমাজে ছড়িয়ে পড়েছে হিংসা, ঘৃণা। এ কারণেই রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের প্রবলভাবে ঘৃণা করা হয় মিয়ানমারের সমাজে। সীমান্ত চৌকিতে হামলার কথা বলা হলেও রোহিঙ্গাদের ওপর যেভাবে নির্বিচারে দমন-পীড়ন চলেছে, তাতে স্পষ্টত ঘৃণার কারণে তাদের ওই সমাজ থেকে উচ্ছেদ করে বিতাড়নই লক্ষ্য। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনারের কথায় সেটাই মনে হয়েছে। জাতিসংঘ মানবাধিকার হাইকমিশনার রাদ আল হোসেন বলেছেন, ‘এটা ছিল জাতিগত নিধন।’
জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের একটি অনুসন্ধানী দল এ ব্যাপারে প্রায় এক মাস কক্সবাজারে অবস্থান করে প্রতিবেদন প্রস্তুত করে। বাংলাদেশে আশ্রয় নেয়া রোহিঙ্গা পরিবারের সঙ্গে কথা বলে তৈরি করা হয় ওই প্রতিবেদন। প্রাথমিক প্রতিবেদন প্রকাশ পেতেই গোটা দুনিয়া কেঁপে ওঠে প্রতিবেদনে দেয়া নিষ্ঠুরতার বর্ণনায়। সম্প্রতি তার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় এটাকে গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধ হিসেবে বলতে শুরু করে। জাতিসংঘ মানবাধিকার কমিশনের রিপোর্টসহ বিশ্বাসযোগ্য তথ্য ও প্রমাণ পাওয়ার পর আইসিসি বিষয়টি বিবেচনায় নেয়।
মিয়ানমার আইসিসি’র রোম সনদে সই করেনি। তাই আইসিসি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মিয়ানমারের বিচার করতে পারবে না বলেই দেশটি মনে করে। বাস্তবে জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদ চাইলে রোম সনদে সই না করলেও আইসিসি গণহত্যা ও মানবতা বিরোধী অপরাধের বিচার করতে পারে। জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা বিভক্ত। পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট নিরাপত্তা পরিষদের দুই সদস্য চীন ও রাশিয়া মিয়ানমারের ওপর বল প্রয়োগের বিরোধী। তবুও আইসিসি রাখাইনে ঘটে যাওয়া বর্বরতার ভয়াবহতায় উৎকণ্ঠিত হয়ে তদন্তে উদ্যোগী হয়েছে। আইসিসি গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে জড়িত জেনারেলদের বিচার করে দোষী সাব্যস্ত করতে পারলে ওইসব জেনারেল মিয়ানমারের বাইরে যেতে পারবে না। বাইরে গেলেই গ্রেপ্তার হবেন। তবে আইসিসি এখন কীভাবে তাদের বিচার করতে পারে- সেটিই খুঁজে দেখা হচ্ছে।

Disconnect