ফনেটিক ইউনিজয়
নীরবতা সমাধান নয়
বাংলাদেশ দখলের হুমকি বিজেপি নেতার
জাকারিয়া পলাশ

ভারতে ক্ষমতাসীন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) নেতা ও দেশটির কেন্দ্রীয় সরকারের উচ্চকক্ষ বা রাজ্যসভার সদস্য সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বরাবরই বাংলাদেশবিরোধী বক্তব্য দিয়ে আসছেন। সম্প্রতি দেশটির অভ্যন্তরে উগ্র হিন্দুত্ববাদের পক্ষে সক্রিয় এ রাজনীতিক বাংলাদেশ দখল করার পরামর্শ দিয়েছেন ভারতীয়দেরকে।
২০১৬ সালে সুব্রহ্মণ্যম স্বামী ভারত সরকারকে বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক নিয়ে সতর্ক থাকতে আহ্বান জানিয়েছিলেন। সে সময় তিনি ভারতকে শেখ হাসিনার সরকারের প্রতি ‘ঝুঁকে থাকা’ বন্ধ করতে পরামর্শ দিয়ে বলেছিলেন, হিন্দু সম্প্রদায়বিরোধী আতঙ্কের বিষয়ে শেখ হাসিনার সরকার ‘অসহায়’ অথবা ‘দুষ্কর্মের সহযোগী’।  
৭৯ বছর বয়সী হিন্দুত্ববাদী এ নেতা গত সপ্তাহে ফের বাংলাদেশের বিরুদ্ধে বিষোদগার করেছেন। বাংলাদেশের সীমান্ত লাগোয়া রাজ্য ত্রিপুরার রাজধানী শহরে সফরে এসে সাংবাদিকদের সামনে এবার সুব্রহ্মণ্যম স্বামী বলেছেন, ‘হিন্দুদের উপরে ক্রমাগত আক্রমণ হচ্ছে বাংলাদেশের মাটিতে। অনেক হিন্দু মন্দির বলপূর্বক দখল করে নেয়া হচ্ছে। বাংলাদেশের দরিদ্র শ্রেণির মানুষের উপরে চাপ সৃষ্টি করে ধর্মান্তরিত করা হচ্ছে। এই প্রবণতা অবিলম্বে বন্ধ না হলে দখল করে নেয়া হবে বাংলাদেশ।’
সুব্রহ্মণ্যম স্বামী আরো বলেছেন, ‘শেখ হাসিনার প্রতি ভারতের সমর্থন রয়েছে। কিন্তু হিন্দুদের গায়ের জোরে ধর্মান্তর এবং মন্দির ভাঙার তাণ্ডব বন্ধ করতে হবে।’ বাংলাদেশের হিন্দুদের উপরে সংখ্যাগুরু সম্প্রদায়ের এই ‘উন্মাদনা’ অবিলম্বে বন্ধ না হলে সমগ্র বাংলাদেশে ‘দিল্লির শাসন’ প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে হুমকি দিয়েছেন ভারতের শাসকদলের এই সাম্প্রদায়িক নেতা।
এদিকে প্রতিবেশী দেশের বিরুদ্ধে এমন বক্তব্য দুই দেশের জনগণের মধ্যকার সম্পর্কে প্রভাব ফেলতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। এ বিষয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন মহল দৃশ্যত নীরবতা অবলম্বন করছে। অথচ দুই দেশে বিভিন্ন ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্প্রীতির স্বার্থে এ বিষয়ে কার্যকর ভূমিকা নেয়া সময়ের দাবি।
প্রসঙ্গত, এ দুই দেশে হিন্দু-মুসলিম সম্প্রদায়ের মধ্যে সম্পর্ক ব্রিটিশ আমল থেকে খুবই স্পর্শকাতর বিষয়। এখানে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পারস্পরিক সহযোগিতার বিপুল প্রচেষ্টা দেখা গেছে। আবার ভ্রাতৃঘাতী সংঘাতও বিভিন্ন সময়ই ব্যাপকতা সৃষ্টি করেছে দুই দেশেই। এ অবস্থায় রাজনৈতিক নেতাদের কাছ থেকে সাম্প্রদায়িক প্রতিহিংসামূলক বক্তব্য আগুনে ঘি ঢালার পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে পারে। বিভিন্ন সমস্যা সত্ত্বেও ভারত ও বাংলাদেশ একটি গতিশীল কূটনৈতিক সম্পর্ক রক্ষা করে আসছে। ফলে একে-অপরের সার্বভৌমত্ব ও অভ্যন্তরীণ বিষয়াবলীতে কূটনৈতিক শিষ্টাচার লঙ্ঘন না করাটাই প্রত্যাশিত। কিন্তু বৃহৎ এ প্রতিবেশী দেশটির জনপ্রতিনিধির কাছ থেকে বারবার বাংলাদেশ বিরোধী বক্তব্য উস্কানিমূলকই বটে।
এ বিষয়ে কেউ কেউ অবশ্য শক্ত কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করার পরামর্শ দিয়েছেন। লন্ডন প্রবাসী শিক্ষক ও বিশ্লেষক মাসুদ রানা এ প্রসঙ্গে সামাজিক মাধ্যমে বলেছেন, ‘একটি স্বাধীন ও মর্যাদাপূর্ণ জাতি হিসেবে বাঙালি ও তার জাতি-রাষ্ট্র হিসেবে বাংলাদেশের ভারতীয় সরকারি দলের এমপি’র ঔদ্ধত্যের একটা সঠিক জবাব দেয়া অবশ্যই কর্তব্য। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচিত ঢাকাস্থ ভারতীয় হাইকমিশনারকে তলব করে তাঁর দেশের ক্ষমতাসীন দলের এমপি’র দেয়া বাংলাদেশ দখলের হুমকির জবাব চাওয়া এবং ভবিষ্যতে এ ধরনের উদ্ধত আচরণ থেকে বিরত থাকার উদ্দেশে সতর্ক করে দেয়া।’ তাছাড়া বাংলাদেশ দখলের হুমকিদানকারী বিদেশি নাগরিকের বিরুদ্ধে কী ব্যবস্থা নেয়া যায়, তার আইনগত অনুসন্ধান করারও পরামর্শ দিয়েছেন তিনি।
অবশ্য আন্তর্জাতিক সম্পর্কের বিশ্লেষকরা কেউ কেউ মনে করেন, সুব্রহ্মণ্যম স্বামীর দেয়া বক্তব্য ভারতের রাষ্ট্রীয় বক্তব্য নয়। কাজেই কূটনৈতিক প্রতিক্রিয়ার চেয়ে রাজনৈতিক প্রতিক্রিয়া দেয়াটাই এখানে বেশি যৌক্তিক। সেক্ষেত্রে অন্তত রাজনৈতিক দলগুলোর পক্ষ থেকে এর বিরুদ্ধে ভূমিকা নেয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় ও সামাজিক সংহতি এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির বিষয়ে বিশেষ দৃষ্টি দেয়া প্রয়োজন। বাংলাদেশকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হিসেবে তুলে ধরার জন্য ব্যাপক উদ্যোগ নেয়ারও পরামর্শ দিয়েছেন বিশ্লেষকরা।

Disconnect