ফনেটিক ইউনিজয়
বেসরকারি পেনশনে নেই অগ্রগতি
এম ডি হোসাইন

বেসরকারি চাকরিজীবীদের জন্য ২০১৪ সালে পেনশন চালুর উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। এরপর প্রায় চার বছর অতিবাহিত হলেও এর দৃশমান কোনো অগ্রগতি নেই। সরকারের এ উদ্যোগের খবর জানার পর বেসরকারি খাতে কর্মরত চাকরিজীবীদের মধ্যে স্বস্তিও এসেছিল। কিন্তু দীর্ঘ সময় পার হবার পরও তা বাস্তবায়ন না হওয়ায় বেসরকারি চাকরিজীবীদের মধ্যে এখন হতাশা ও ক্ষোভ বিরাজ করছে বলে জানা গেছে।
জানা যায়, আওয়ামী লীগ সরকারের নির্বাচনী অঙ্গীকার ছিল- বেসরকারি খাতে পেনশন দেয়া। সরকারের এই অঙ্গীকার বাস্তবায়নে ২০১৪ সালে অর্থ মন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং বিভাগকে বেসরকারি খাতের জন্য পেনশন স্কিম চূড়ান্ত করার দায়িত্ব দেয়া হয়। কিন্তু অর্থমন্ত্রণালয়ের ব্যাংকিং ও অর্থ বিভাগের জটিলতায় সে উদ্যোগ ভেস্তে যায়। এরপর এ বিষয়ে ২০১৬-১৭ অর্থবছরের বাজেটে ঘোষণা দেন অর্থমন্ত্রী। তারপরও এর কোনো বাস্তবায়ন হয়নি। অবশেষে ওই প্রতিশ্রুতি বাস্তবে রূপ দিতে চলতি (২০১৮-১৯) অর্থবছরে পদক্ষেপ নেয়ার ঘোষণা দিয়েছেন অর্থমন্ত্রী। কিন্তু চূড়ান্ত এই পদক্ষেপের পরও দৃশ্যমান কোনো অগ্রগতি নেই।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, সর্বজনীন পেনশন পদ্ধতির আওতায়, বেসরকারি পর্যায়ে প্রাথমিকভাবে বড় বড় করপোরেট হাউস, শেয়ারবাজারে লিস্টেড কোম্পানিতে কর্মরত চাকরিজীবীদের আনার প্রস্তাব করা হয়েছে। পর্যায়ক্রমে অন্যান্য খাতের চাকরিজীবীদের এর আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে অর্থ মন্ত্রণালয় তথ্যমতে, বর্তমানে সরকারি খাতে চাকরিজীবী প্রায় ১৫ লাখ, যা কর্মক্ষম জনগোষ্ঠীর মাত্র ৫ ভাগ। তারা সবাই পেনশন সুবিধা পান। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতের ৯৫ শতাংশের মধ্যে মাত্র আট ভাগ ফরমাল বা আনুষ্ঠানিক খাতে নিয়োজিত রয়েছেন। তাদের কোনো পেনশন সুবিধা নেই। এছাড়া দেশে গড় আয়ু ও প্রবীণের সংখ্যা বাড়ার কারণে সামাজিকভাবে নিরাপত্তাহীনতার ঝুঁকি বৃদ্ধি পেয়েছে। এই ঝুঁকি মোকাবিলা করা সরকারের একার পক্ষে সম্ভব নয়। তাই সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে অর্থসচিব আব্দুর রউফ তালুকদার জানান, সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার জন্য চূড়ান্ত পর্যায়ের কাজ চলছে। পর্যায়ক্রমে এর কার্যক্রম শুরু হবে। তিনি আরও বলেন, ‘তহবিল গঠন করা কঠিন কাজ নয়, মানুষের সাড়াও মিলবে এতে। কিন্তু সেই তহবিলের অর্থ বিনিয়োগ হবে কোথায়, তা নিয়ে গভীরভাবে ভাবা হচ্ছে। এজন্য কিছু সময় বিলম্বিত হচ্ছে। তবে এটি পুরোপুরি বাস্তবায়ন করতে কয়েক বছর সময়ও লাগবে।’ অর্থনীতিবিদরা বলছেন, বিশাল এ কর্মযজ্ঞের আর্থিক চাহিদা এবং কাঠামোগত সক্ষমতা যাচাই করে নেয়া জরুরি।
বেসরকারি খাতে পেনশন বাস্তবায়নে বিশ্বব্যাংকের সহায়তায় একটি প্রকল্প ব্যাংকিং বিভাগ হাতে  নেয়। এ লক্ষ্যে প্রায় ৮৮ মিলিয়ন মার্কিন ডলার আর্থিক সহায়তার প্রস্তাব দেয় বিশ্বব্যাংক। অর্থমন্ত্রী  সেটি অনুমোদনও দেন। কথা ছিল, সংস্থাটির টাকায় ‘প্রাইভেট পেনশন রেকর্ড কোম্পানি’ ও ‘প্রাইভেট পেনশন ট্রাস্ট’ গঠন করে বেসরকারি খাতকে পেনশন স্কিমের আওতায় আনা হবে। তবে প্রকল্প গ্রহণের আগে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয় থেকে যখন ডিপিপি চাওয়া হয়, তখনই আপত্তি করে বসে অর্থ বিভাগ। তারা জানায়, যেহেতু সরকারি পেনশন প্রক্রিয়া বাস্তবায়নের সঙ্গে জড়িত অর্থ বিভাগ, তাই এটি তাদের (অর্থ বিভাগ) মাধ্যমেই হওয়া উচিত। এরপর থেকে অর্থ বিভাগই দেখছে সর্বজনীন পেনশন বাস্তবায়নের বিষয়টি। এতে অনেক সময়ও বিলম্বিত হয়েছে।
অর্থ বিভাগের কর্মকর্তারা জানান, প্রথমদিকে বিষয়টি শুধু বেসরকারি খাতের কর্মজীবীদের পেনশন দেয়ার মধ্যে সীমাবদ্ধ ছিল। তবে এখন এটি বৃহত্তর পরিসরে সব নাগরিকের জন্য পেনশন স্কিম চালুর সিদ্ধান্তে রূপ নিয়েছে। ফলে এটি বাস্তবায়ন করতে আরও সময় লাগবে। সর্বজনীন পেনশন চালুর জন্য যে প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো দরকার, সেটিই এখন পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অর্থ ও পরিকল্পনা প্রতিমন্ত্রী এমএ মান্নান বলেন, দেশের বিভিন্ন বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে আলোচনার মধ্য দিয়ে ধাপে ধাপে সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থার উন্নয়ন করা হবে। এজন্য কিছু সময় লাগবে বলেও জানান তিনি। সরকারের পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রস্তাবিত সর্বজনীন পেনশন তহবিল হবে অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে। মূল বেতনের ১০ শতাংশ তহবিলে জমা দেবেন চাকরিজীবী। সমপরিমাণ টাকা দেবেন মালিকপক্ষও। তহবিল পরিচালনা করবে ন্যাশনাল পেনশন অথরিটি। এ প্রক্রিয়াটি জটিল উল্লেখ করে সিপিডি’র গবেষণা পরিচালক ড. খন্দকার গোলাম মোয়াজ্জেম বলেন, সরকার ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের কথা বিবেচনা করতে পারে।  
উল্লেখ্য, সরকারি চাকরিজীবীরা অবসরের পর পেনশন সুবিধা ভোগ করছেন। অন্যদিকে, বেসরকারি খাতে ক্ষেত্রবিশেষ প্রভিডেন্ট ফান্ড থাকলেও অবসরের সময়ে মাসে মাসে পেনশন পান না। এ ক্ষেত্রে সমতা ও সামাজিক সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বেসরকারি খাতের চাকরিজীবীদেরও পেনশনের আওতায় আনার পদক্ষেপ নিয়েছে সরকার। এ লক্ষ্য অর্জনে প্রতিবেশী দেশ ভারত, শ্রীলংকা, অস্ট্রেলিয়ার মতো সর্বজনীন পেনশন ব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনা নেয়া হয়।

Disconnect