ফনেটিক ইউনিজয়
অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় বড় বাধা ভূমি অধিগ্রহণ
ইমদাদ হক

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। লক্ষ্য অর্জনে নেয়া হচ্ছে বহুমুখী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। যার একটি সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। কয়েক বছর আগে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই নেয়া হয় এ উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে কতদূর এগোলো অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ- এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ দ্বিতীয় পর্ব।

দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা, গোছানো একটি কাঠামোর মধ্যে বিভিন্ন শিল্পের কেন্দ্রীভূতকরণ এবং সার্বিকভাবে ব্যবসা বাণিজ্যের সহজীকরণ আর প্রসারের লক্ষ্য নিয়ে শুরু হয় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল বা ইকোনমিক জোন প্রতিষ্ঠার কাজ। লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয় হয় ২০৩০ সালের মধ্যে ১০০ টি বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা করার।
এ উদ্যোগের অংশ হিসেবে কাজ এগিয়েছে খানিকটা। তবে বাকি রয়ে গেছে মোটাদাগের কাজই। যে উদ্যোগে বড় বাধা জমি অধিগ্রহণ। সংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলো প্রতিষ্ঠা করতে ৭৫ হাজার একর জমির প্রয়োজন। যার মধ্যে ৫০ হাজার একর জমি বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষের (বেজা) মালিকানায় এসেছে। তবে চলতি বছরের মধ্যেই বাকি ২৫ হাজার একর জমিও বেজার মালিকানায় নেয়ার লক্ষ্যে কাজ চলছে। জমি অধিগ্রহণ প্রক্রিয়া শেষ হলে অঞ্চল প্রতিষ্ঠায় আর বড় ধরনের কোনো বাধা থাকবে না।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নেয়ার লক্ষ্যে সারাদেশে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ঘোষণা দেন প্রধানমন্ত্রী। এরপর শুরু হয় কাজ। কিন্তু কাজে ধীরগতি দূর হচ্ছে না গত আট বছর ধরেই। মূলত অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন প্রক্রিয়ার সঙ্গে জড়িতদের অস্বচ্ছ মানসিকতা, দায়িত্বে অবহেলা আর অসৎ উপায়ে অর্থ উপার্জনের মানসিকতাই গতিশীল এ উদ্যোগ প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বড় ধরনের বাধা তৈরি করছে। তাদের মতে, রয়েছে আমলতান্ত্রিক জটিলতাও। অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য ব্যক্তিগতভাবে যাদের জমি নেয়া হচ্ছে, তাদের ক্ষতিপূরণের টাকা দিতে রীতিমতো হিমশিম খেতে হচ্ছে বেজাকে। ২০১০ সালে প্রতিষ্ঠার পর আট বছর পেরিয়ে গেলেও সংস্থাটির নিজস্ব কোনো তহবিল গড়ে উঠেনি- যেখান থেকে ক্ষতিপূরণের টাকা দেয়া যেতে পারে। জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নের জন্য সরকারের উন্নয়ন বাজেট (এডিপি) থেকে টাকা চাইলেও লম্বা প্রক্রিয়ার কারণে টাকা ছাড় হতে দেরি হচ্ছে। জমি অধিগ্রহণের জন্য বিভিন্ন সংস্থার কাছ থেকে চড়া সুদে ঋণ নিতে হচ্ছে বেজাকে। এমন বাস্তবতায় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি অধিগ্রহণের পাশাপাশি সে জমি উন্নয়নের জন্য আলাদা একটি তহবিল চায় বেজা। তবে তা কবে হবে, এ নিয়ে রয়ে গেছে অনিশ্চয়তা। আগামী পাঁচ বছরের জন্য প্রস্তাবিত তহবিলের নাম দেয়া হয়েছে ‘ভূমি অধিগ্রহণ ও অবকাঠামো উন্নয়ন তহবিল’। এ তহবিলের আকার ১৫ হাজার কোটি টাকার প্রস্তাব করেছে বেজা। যা নিয়ে চলছে যাচাই-বাছাইয়ের কাজ।
বেজার কর্মকর্তারা জানান, সরকারের বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচি বা এডিপি’র মাধ্যমে জমি অধিগ্রহণ ও জমি উন্নয়নের জন্য যেসব প্রকল্প নেয়া হয়েছে- এতে প্রকল্প নেয়ার পর থেকে একনেক সভায় অনুমোদন পর্যন্ত যে সময় অপচয় হয়, ওই সময়ের মধ্যে জমির দাম বেড়ে দ্বিগুণ হয়ে গেছে। বেড়েছে নির্মাণসামগ্রীর খরচও। নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে জাপানের জন্য অর্থনৈতিক অঞ্চল ও মিরসরাই অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য জমি অধিগ্রহণে চলতি অর্থবছরের বাজেটে এডিপিতে মাত্র ৮০ কোটি টাকা রাখা হয়েছে। সংশোধিত এডিপিতে ৭৬০ কোটি টাকা চাওয়া হলেও দেয়া হয়েছে ৪৯০ কোটি টাকা। সম্পদের সীমাবদ্ধতার কারণে চাহিদার আলোকে টাকা দেয়া সম্ভব হয় না বলে জানিয়েছেন পরিকল্পনা কমিশনের কর্মকর্তারা। ফলে চাহিদার যোগান দিতে বাংলাদেশ ইনফ্রাস্ট্রাকচার ফাইন্যান্স ফান্ড লিমিটেড (বিআইএফএফএল) থেকে চড়া সুদে ঋণ নেয়া হয়েছে। জমি অধিগ্রহণ ও উন্নয়নে সাধারণত বিশ্বব্যাংক, এডিবি, জাইকাসহ উন্নয়ন সহযোগীরা টাকা দেয় না।
বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, ‘অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ এগিয়ে চলেছে। ভূমি অধিগ্রহণ বড় কাজ, যার প্রায় অর্ধেকটা সম্পন্ন হয়েছে। সার্বিক প্রক্রিয়া দ্রুত শেষ করার লক্ষ্যে আমরা আলাদা একটি তহবিল গঠনের কথা বলেছি। যে তহবিল থেকে টাকা নিয়ে জমি অধিগ্রহণ ও ভূমি উন্নয়নে খরচ হবে। অর্থনৈতিক অঞ্চলে বিনিয়োগ করতে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীরা যেভাবে আগ্রহ দেখাচ্ছেন, তাতে আলাদা একটি তহবিল গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।’
তবে বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের (পিআরআই) পরিচালক খোরশেদ আলম বলছেন, ‘বেশ কয়েকবছর আগে গঠন করা অর্থ মন্ত্রণালয়ের আওতায় একটি অবকাঠামো তহবিলের টাকাই ঠিকমতো খরচ হচ্ছে না। বেজা চাইলে ভূমি উন্নয়ন ও অধিগ্রহণে সেখান থেকে টাকা নিতে পারে। তাছাড়া সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) মাধ্যমেও টাকা সংগ্রহ করা যায়। সরকারিভাবে বেজার জন্য আলাদা তহবিল গঠন হলে তার খরচ প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।’
বিশ্লেষকরা বলছেন, রপ্তানি বাণিজ্যে প্রতিযোগী দেশগুলোর তুলনায় বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণে (এফডিআই) দুর্বল অবস্থানে বাংলাদেশ। ব্যবসা পরিচালনা ব্যয় বেশি হওয়া, প্রক্রিয়ায় দীর্ঘসূত্রিতা, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের নেতিবাচক মানসিকতা ও অবকাঠামো খাতে দুর্বলতা থাকায় এ পরিস্থিতি দাঁড়িয়েছে। এসব কারণে স্থানীয় উদ্যোক্তাদের কাছ থেকেও ভালো সাড়া পাওয়া যাচ্ছে না। গত এক দশক ধরে স্থানীয় বিনিয়োগে ধীর গতি চলছে। স্থানীয় বিনিয়োগ তেজি না হলে বিদেশি বিনিয়োগে তার প্রভাব পড়ে। যদিও সংকট নিরসনে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠাসহ কিছু খাতা-কলমের উদ্যোগ রয়েছে, যা বাস্তবায়নের ধীরগতি পরিস্থিতির উত্তরণে খুব একটা ভূমিকা রাখতে পারছে না।
বিশ্বব্যাংকের ঢাকা কার্যালয়ের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, ‘দেশের ২২ শতাংশ মানুষ এখনো দারিদ্র্যপীড়িত। যেখানে কর্মসংস্থান নেই প্রায় কোটি লোকের। প্রাতিষ্ঠানিক কর্মসংস্থানও তৈরি হচ্ছে না সেভাবে। সেখানে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ ইতিবাচক। তবে বাংলাদেশে কেবল উদ্যোগ গ্রহণের প্রবণতাই দেখা যায়, বাস্তবায়নে মনোযোগ কম থাকে। প্রতিযোগিতার বিশ্বে এখন ভিয়েতনাম, ফিলিপাইন, ইন্দোনেশিয়া, সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশেই বিদেশি বিনিয়োগ আকৃষ্ট হচ্ছে দ্রুততর গতিতে। অবকাঠামোগত দিক থেকে পিছিয়ে থাকলে তা বাংলাদেশকে দীর্ঘমেয়াদে অর্থনৈতিক ক্লান্তিতে ভোগাবে।’

Disconnect