ফনেটিক ইউনিজয়
মুনাফা শিকারী বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়
আদম মালেক

বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে রাষ্ট্রের কোনো পৃষ্ঠপোষকতা নেই। আবার এসব বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে শিক্ষা অধিকার নয়, সুযোগ। কখনো নিখাদ পণ্য। এ পণ্যে বিনিয়োগ করে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলো ইচ্ছামতো মুনাফা শিকার করছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।
১৯৯২ সাল থেকে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের অনুমোদন দেয়া শুরু হয়। কিন্তু শিক্ষার্থীদের ভর্তি-টিউশন ফি সংক্রান্ত কোনো নীতিমালা তৈরি করা সম্ভব হয়নি। বিশ্ববিদ্যালয় মঞ্জুরি কমিশনের (ইউজিসি) তথ্যানুযায়ী, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি ফি, টিউশন ফি এবং শিক্ষকদের বেতন-ভাতাসহ অন্যান্য বিষয়ে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে ব্যাপক পার্থক্য রয়েছে। তাছাড়া ট্রান্সক্রিপ্ট, সার্টিফিকেট ও প্রশংসাপত্র ইত্যাদি সরবরাহ করতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উচ্চহারে ফি নেয়ার হাজারো অভিযোগ আসে কমিশনে। কোনো যৌক্তিক কারণ ছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলো প্রতিবছরই সব ফি বৃদ্ধি করে বলে অভিযোগ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকদের।
এসব অভিযোগের পর বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফি সংক্রান্ত একটি নীতিমালা করা জরুরি উল্লেখ করে ২০১৩ সালের অক্টোবরে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ পাঠায় ইউজিসি। কিন্তু ছয় বছরেও  ইউজিসি’র প্রস্তাবিত নীতিমালা আলোর মুখ দেখেনি।
ইউজিসি’র তথ্যানুযায়ী, কয়েকটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পছন্দের শীর্ষে থাকা বিষয়গুলোয় পড়াশোনার খরচ মধ্যবিত্তের নাগালের বাইরে। বিশ্ববিদ্যালয়ভেদে ব্যাচেলর অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (বিবিএ) পড়তে খরচ প্রায় ৩ লাখ টাকা, মাস্টার্স অব বিজনেস এডমিনিস্ট্রেশন (এমবিএ) ১ লাখ থেকে ৫ লাখ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) ৩ লাখ থেকে ৬ লাখ ৫০ হাজার, ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে স্নাতক পড়তে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার, ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিংয়ে ২ লাখ ৫০ হাজার থেকে ৫ লাখ, ইলেকট্রনিকস অ্যান্ড কমিউনিকেশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে (ইসিই) ৩ লাখ থেকে ৭ লাখ ও সাংবাদিকতায় স্নাতক পড়তে ২ লাখ থেকে ৫ লাখ ৫০ হাজার টাকা দিতে হয়।
বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বত্বাধিকারীদের সংগঠন প্রাইভেট ইউনিভার্সিটি ওনার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি শেখ কবির হোসেন বলেন, ‘সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে যখন খরচ নির্ধারণ করা হয়, তখন পাশের আরেকটি সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের খরচের কাছাকাছি নির্ধারণ করা হয়। কত ভর্তি ফি, বেতন, হোস্টেল ভাড়া ইত্যাদি। কিন্তু বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় সব একই মানের নয়। কারো অবকাঠামো সুযোগ-সুবিধা বেশি, কারো কম। কোথাও মানসম্পন্ন শিক্ষক বেশি, তাদের বেতনও বেশি। এসব বিভিন্ন কারণে শিক্ষার্থীদের ভর্তি ও টিউশন ফিতে কমবেশি তারতম্য হবেই। কিন্তু সবার একই করা যাবে না। সরকার চাইলে সেটা আলাপ-আলোচনার মাধ্যমে করা যেতে পারে।’
চলতি বছরের গোড়ার দিকে দেশের বাস্তবতা ও শিক্ষার্থীদের অবস্থা বিবেচনায় নিয়ে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সব ফি নির্ধারণের আহ্বান জানিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। তিনি বলেন, সবাইকে ব্যবসা ও মুনাফার মানসিকতা ছেড়ে জনকল্যাণে সেবার মনোভাব নিয়ে এগিয়ে আসতে হবে। যেসব বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার পরিবেশ নিশ্চিত করতে ব্যর্থ হয়েছে, তারা শুধু মুনাফা অর্জনের লক্ষ্য নিয়ে চলতে চান। তাদের সঠিক ধারায় আনা কঠিন হয়ে পড়েছে। এজন্য তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ ছাড়া আর কোনো পথ তারা খোলা রাখছেন না বলে তিনি জানান।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বিবিএ পড়তে সিটি ইউনিভার্সিটিতে খরচ হয় ২ লাখ ৮২ হাজার টাকা। এই কোর্স এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে করার জন্য গুনতে হয় ৫ লাখ ৮২ হাজার টাকা। একই বিষয়ের জন্য ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে লাগে ৩ লাখ ৫৪ হাজার টাকা আর ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পরিশোধ করতে হয় ৩ লাখ ৮০ হাজার টাকা। কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য সিটি ইউনিভার্সিটিতে খরচ ২ লাখ ১০ হাজার টাকা। এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে পড়তে এই বিষয়ের জন্য দিতে হয় ৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা। কম্পিউটার সায়েন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে পড়ার জন্য ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে পরিশোধ করতে হয় ৩ লাখ ৫০ হাজার টাকা আর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে শিক্ষার্থীদের লাগে ৩ লাখ ৮৬ হাজার ১০০ টাকা। ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অনার্সের জন্য সিটি ইউনিভার্সিটির খরচ যেখানে ১ লাখ ৪২ হাজার টাকা, সেখানে এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে হয় ৩ লাখ ২৪ হাজার টাকা। ঢাকা ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটিতে নেয় ২ লাখ টাকা আর ভিক্টোরিয়া ইউনিভার্সিটিতে লাগে ২ লাখ ১৮ হাজার ৪০০ টাকা। ইলেকট্রিক্যাল অ্যান্ড ইলেকট্রনিক্স ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের জন্য সিটি ইউনিভার্সিটিতে খরচ ২ লাখ ৬৮ হাজার ৯০০ টাকা আর এশিয়া প্যাসিফিক ইউনিভার্সিটিতে পরিশোধ করতে হয় ৫ লাখ ৯৪ হাজার টাকা।
উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানে ভর্তিচ্ছু অনেক শিক্ষার্থী জানান, বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর মধ্যে কয়েকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সুনামের কারণে ভর্তি ও টিউশন ফি মধ্যবিত্ত পরিবারের নাগালের বাইরে।
ড্যাফোডিল ইন্টারন্যাশনাল ইউনিভার্সিটির শিক্ষার্থী শরিফুল ইসলাম জানান, ‘অপ্রত্যাশিতভাবে বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে টিউশন ফি বেড়েই চলছে। সঙ্গে নানা রকমের চার্জ। শিক্ষা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে বাণিজ্যক প্রকল্প। ট্রাস্টি বোর্ড এই প্রকল্পে বিনিয়োগ করে সর্বোচ্চ মুনাফা আদায় করে কিন্তু সে হারে শিক্ষার মান বাড়ায় না।’
আমিনুল ইসলাম নামে এক অভিভাবক জানান, তার ছেলের বিবিএ সম্পন্ন করতেই কয়েক লাখ টাকা ব্যয় হচ্ছে। তিনি বলেন, ‘যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়নি, তারা বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হবে। এমন খরচ হলে তো মধ্যবিত্ত মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য উচ্চশিক্ষা গ্রহণ সম্ভব হবে না।’

Disconnect