ফনেটিক ইউনিজয়
প্রতিবন্ধীবান্ধব হচ্ছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়
নুর হোসেন ইমন

বিশ্বের মোট জনসংখ্যার প্রায় ১৫ শতাংশ বিভিন্নভাবে প্রতিবন্ধিতার শিকার। বাংলাদেশে মোট জনগোষ্ঠীর ১০ শতাংশ, অর্থাৎ প্রায় দেড় কোটি মানুষ প্রতিবন্ধী। অদম্য মেধা আর কোটার সুবাদে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীরা ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার সুযোগ পেলেও অবকাঠোমো ও ভবনগুলো প্রতিবন্ধীদের চলাচলের জন্য উপযুক্ত নয়। তবে বিশ্ববিদ্যালয়টিকে প্রতিবন্ধীবান্ধব করে গড়ে তুলতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ও বিভিন্ন সংগঠনের পক্ষ থেকে নেয়া হচ্ছে বিভিন্ন উদ্যোগ।
এই বিশাল প্রতিবন্ধী জনগোষ্ঠীকে বাদ দিয়ে একটি রাষ্ট্রের উন্নতি, অগ্রগতি ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা করা সম্ভব নয়। বাংলাদেশ সরকার ২০১৩ সালে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার নিশ্চিত করার জন্য প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইন-২০১৩ প্রণয়ন করেন। এর দুই বছর পর প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা বিধিমালা-২০১৫ গেজেট আকারে প্রকাশ করা হয়। যা প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও স্বাধীনতার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার ও সুরক্ষা নীতিমালা-২০১৩-এর সংজ্ঞানুযায়ী, ‘প্রতিবন্ধিতা’ অর্থ যে কোনো কারণে ঘটিত দীর্ঘমেয়াদি বা স্থায়ীভাবে কোনো ব্যক্তির শারীরিক, মানসিক, বুদ্ধিগত, বিকাশগত বা ইন্দ্রিয়গত ক্ষতিগ্রস্ততা বা প্রতিকূলতা এবং উক্ত ব্যক্তির প্রতি দৃষ্টিভঙ্গিগত ও পরিবেশগত বাধার পারস্পরিক প্রভাব, যার কারণে উক্ত ব্যক্তি সমতার ভিত্তিতে সমাজে পূর্ণ ও কার্যকর অংশগ্রহণে বাধাপ্রাপ্ত হন।
আইনে বলা হয়েছে, ভৌত অবকাঠামো, যানবাহন, যোগাযোগ, তথ্য, এবং তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তিসহ জনসাধারণের জন্য প্রাপ্য সকল সুবিধা ও সেবাসমূহে অন্যান্যদের মতো প্রত্যেক প্রতিবন্ধী ব্যক্তির সমসুযোগ ও সমআচরণ প্রাপ্তির অধিকার রয়েছে। এবং প্রাপ্য কোনো সুযোগ বা সুবিধা প্রদানে অস্বীকৃতি বা কম সুযোগ-সুবিধা প্রদান করাকে বৈষম্য হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
তবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা এসব অধিকার ভোগ করতে বিভিন্ন ধরনের ‘অবকাঠামোগত’ প্রতিবন্ধকতার শিকার হন। আইনে প্রতিবন্ধীদের জন্য বিশেষ শিক্ষার কথা বলা থাকলেও ‘সমাজভিত্তিক পুনর্বাসন’-এর লক্ষ্যে সকল কর্মকাণ্ডে প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে কোনো বিচ্ছিন্ন প্রতিষ্ঠানে না রেখে সমাজের মধ্যেই তার উন্নয়ন প্রয়াসের চেষ্টার কথা বলা হয়।
বাংলাদেশের প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা প্রতিটি ক্ষেত্রেই তাদের মেধা ও মননশীলতার পরিচয় দিচ্ছেন। একজন প্রতিবন্ধী ব্যক্তি তার দৃশ্যমান শারীরিক প্রতিবন্ধকতা জয় করলেও অনেক সময় সমাজ এবং আইনের সীমাবদ্ধতা তার প্রতিভা বিকাশের পথে বড় বাধা হয়ে দাঁড়ায়। তাই খুব কম সংখ্যক প্রতিবন্ধী ব্যক্তিই বড় স্বপ্ন দেখতে ও নিজেকে যোগ্য, দক্ষ হিসেবে গড়ে তোলার মানসিকতা তৈরি করতে পারে।
প্রতিবন্ধীবান্ধব সমাজ ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান গড়ে তুলতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিবন্ধী এবং অপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের মধ্যে সেতুবন্ধন গড়ে তোলার কাজ করছে স্বেচ্ছাসেবী সংগঠন ফিজিক্যালি চ্যালেঞ্জড ডেভেলপমেন্ট ফাউন্ডেশন (পিডিএফ)। সংগঠনটির লক্ষ্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে দেশের প্রথম প্রতিবন্ধীবান্ধব শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান হিসেবে ঘোষণা করা। এ লক্ষ্যকে সামনে রেখে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে তারা।
রাষ্ট্রীয়ভাবে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য বিভিন্ন সেবা ও চিকিৎসার ব্যবস্থা থাকলেও এসবের পাশাপাশি পিডিএফ কাজ করছে জনসচেতনতা তৈরিতে। শুধু আমাদের সমাজে নয়, বিশ্বের প্রায় প্রতিটি মানুষের মধ্যেই প্রতিবন্ধীদের সম্পর্কে বিভিন্ন নেতিবাচক দৃষ্টিভঙ্গি ও কুসংস্কার রয়েছে। এ নেতিবাচক ধারণাগুলো তাদের অধিকার আদায় এবং নিজের যোগ্যতা প্রমাণের পথে অন্তরায় হিসেবে কাজ করে।
বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে পিডিএফ-এর স্বেচ্ছাসেবক শিক্ষার্থীর সংখ্যা তিন হাজারেরও বেশি। বিশ্ববিদ্যালয়ে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী ভর্তি হলে তাদের পড়া রেকর্ড করে দেয়াসহ বিভিন্নভাবে সহায়তা করেন পিডিএফ’র স্বেচ্ছাসেবকেরা। শারীরিক প্রতিবন্ধী হলে যাতায়াতে সহায়তা করা হয়। সংগঠনটিতে প্রতিবন্ধী ও অপ্রতিবন্ধী দু’ধরনের শিক্ষার্থীই রয়েছে। শিক্ষার্থীরা পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমে একটি অংশগ্রহণমূলক পরিবেশ তৈরির লক্ষ্যে কাজ করে।
পিডিএফ-এর প্রতিষ্ঠাতা মিজানুর রহমান কিরণ বলেন, ‘আমরা পরিবর্তন করতে চাচ্ছি আমাদের প্রজন্মকে, যারা ভবিষ্যতে নীতি-নির্ধারণী পর্যায়ে যাবে। একটি প্রজন্মের মন-মানসিকতার পরিবর্তন করতে পারলে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আর বেশি এডভোকেসি করতে হবে না।’ সংগঠনটি প্রতিষ্ঠায় অবদান রাখার জন্য মার্কিন ম্যাগাজিন ফোর্বস-এর এশিয়ার অনূর্ধ্ব-৩০ তরুণ সামাজিক উদ্যোক্তা ২০১৭-এর তালিকায় স্থান পেয়েছিলেন তিনি।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এখন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীর সংখ্যা শতাধিক। এর মধ্যে দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী ৭৮ জন। প্রতিবন্ধীদের চলাচলের সুবিধার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা ভবন, মুহসীন হল, বিজয় ৭১ হলে বানানো হয়েছে র‌্যাম সিঁড়ি। রয়েছে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বৃত্তি প্রদানের ব্যবস্থা। এছাড়া দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য আলাদা লাইব্রেরিও রয়েছে।
কথা হয় পিডিএফ-এর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় সভাপতি নাজমুস সাকিবের সঙ্গে, যিনি একজন দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী। তিনি জানান, ভর্তি হওয়া থেকে শুরু করে সবকাজে একজন প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী বিভিন্ন ধরনের সমস্যার সম্মুখীন হয়। ঢাবিতে দৃষ্টি ও শ্রবণ প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য কোটা ব্যবস্থা রয়েছে, কিন্তু সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় স্বীকৃত অন্যান্য প্রতিবন্ধীরা কোটার সুবিধা পায় না। অনেক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীকে দেয়া হয় আরবি, ফার্সি, উর্দুর মতো এমন বিষয়গুলো, যে ভাষাগুলোর ব্রেইল পদ্ধতি এসব শিক্ষার্থীদের শেখা নেই। যার ফলে তাদের ভোগান্তিতে পড়তে হয়।
সরজমিন দেখা গেছে, বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জন্য প্রর্যাপ্ত ব্রেইল পদ্ধতির রেফারেন্স বই ও অন্যান্য সুযোগ-সুবিধা নেই। ব্রেইল পদ্ধতির বই তৈরি করার জন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র মেশিনটি নষ্ট অবস্থায় লাইব্রেরিতে পড়ে আছে। প্রতিবন্ধীদের জন্য বিভিন্ন শিক্ষাসামগ্রী থাকলেও এগুলোর অধিকাংশই কাজ করে না। এখানকার রেজিস্ট্রার ভবনসহ গুরুত্বপূর্ণ অনেক ভবনে এখনও র‌্যাম বানানো হয়নি। লিফটগুলোতে ব্রেইল পদ্ধতির সুইচ বা সাউন্ড সিস্টেম নেই, যা প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সময় ভোগান্তির কারণ হয় দাঁড়ায়। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের একটি বড় অংশ এখনও প্রতিবন্ধীদের নিয়ে সচেতন নয়। সেই সঙ্গে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন খেলাধুলায় অংশগ্রহণ করার সুযোগও অপর্যাপ্ত।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিবন্ধীবান্ধব প্রতিষ্ঠান হিসেবে গড়ে তোলা প্রসঙ্গে নাজমুস সাকিব বলেন, ‘বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন ইচ্ছে করলে অল্পদিনের মধ্যেই প্রতিবন্ধীবান্ধব বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব। টেকনিক্যাল কিছু সাপোর্ট ও সবার সদিচ্ছা থাকলেই এটা সম্ভব হবে। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের ব্যাপারে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থী সবার সচেতনতা দরকার। প্রতিবন্ধীদের শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে সচেতনতা তৈরিতে শিক্ষকদের একটি ওরিয়েন্টেশন করানোর উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এ উদ্যোগ সারা দেশে অনুসরণীয় হতে পারে। এ বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রতিবন্ধীবান্ধব ঘোষণা করা গেলে দেশের অন্যান্য ক্যাম্পাস গুলোতেও তা করা সম্ভব হবে।’
এ প্রসঙ্গে জানতে চাইলে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড নাসরীন আহমাদ বলেন, ‘একটি ইনক্লুসিভ সোসাইটি গড়ে তোলার জন্য সমাজের বিশেষ চাহিদা সম্পন্নরা যেন অন্যান্য ছাত্র-ছাত্রীদের সঙ্গে মিলেমিশে তাদের সময় অতিবাহিত করতে পারে, সেজন্য আমরা সবার সহযোগিতা চাইব। আমাদেরও সে ব্যাপারে যথেষ্ট সদিচ্ছা আছে। প্রত্যেককে সঙ্গে নিয়ে আমরা লক্ষ্যের দিকে এগিয়ে যাব।’

Disconnect