ফনেটিক ইউনিজয়
অর্থনৈতিক অঞ্চলেও স্বস্তি নেই উদ্যোক্তাদের
ইমদাদ হক

২০৪১ সালের মধ্যে উন্নত দেশে রূপান্তর বর্তমান সরকারের লক্ষ্য। লক্ষ্য অর্জনে নেয়া হচ্ছে বহুমুখী অর্থনৈতিক পদক্ষেপ। যার একটি সারা দেশে ১০০টি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠা। কয়েক বছর আগে বেশ ঢাকঢোল পিটিয়েই নেয়া হয় এ উদ্যোগ। কিন্তু বাস্তবে কতদূর এগোলো অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ- এ নিয়ে তিন পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদনের আজ শেষ পর্ব।

হবিগঞ্জের ফখরুল ইসলাম চৌধুরী। চার দশকেরও বেশি সময় ধরে বাস করছেন যুক্তরাজ্যে। যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা, অস্ট্রেলিয়া, সিঙ্গাপুরসহ পৃথিবীর ১৬টিরও বেশি দেশে রয়েছে তাঁর ব্যবসায়িক কার্যক্রম। তুলনামূলক কম মুনাফা হলেও শেকড়ের টানেই বাংলাদেশে ব্যবসা শুরু করেন। হবিগঞ্জের প্রত্যন্ত অঞ্চলে স্থাপন করেন একটি গার্মেন্টস কারখানা। যেখানে গ্রামের নারী-পুরুষ বাড়িতে থেকেই কারখানায় কাজ করতে পারেন। এতে তাদের আবাসন ব্যয়ের খরচ কমে যায়। বাড়ে গ্রামের অর্থনৈতিক প্রবাহও।
২০১৩ সালে তিনি হবিগঞ্জে ব্যক্তিগত উদ্যোগে একটি বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেন। সে সময় অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য জমি লাগতো মাত্র ৫০ একর। তাঁর জমির পরিমাণ ছিল ৫৪ একর। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় গেল ৬ বছরেও তিনি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন পাননি। এ সময়ে অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার জন্য নিয়ম  করা হয়েছে ১০০ একর জমিসহ নতুন নতুন শর্ত।
ফখরুল ইসলাম চৌধুরী বলেন, পৃথিবীর শীর্ষস্থানীয় দেশগুলোতে আমার ব্যবসা রয়েছে। সেখানে বাংলাদেশে বিনিয়োগের ক্ষেত্রে মূলধন কোনো সমস্যা নয়। কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতায় ক্লান্ত হয়ে যাচ্ছি। এখানে অনুমোদন পাওয়ার জন্য যে ধরনের তদবির আর ঝক্কি-ঝামেলা পোহাতে হয়, তার তুলনায় অন্য দেশে ব্যবসা শুরু ও বিনিয়োগের প্রক্রিয়া অনেক সহজ।
এমন অবস্থা দেশের বেশিরভাগ ব্যক্তি উদ্যোক্তাদের ক্ষেত্রেই। রাজনৈতিক অভিলাষ প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তাও অন্তত দৃশ্যমান কিছু উদ্যোগ রয়েছে সরকারি উদ্যোগে প্রতিষ্ঠিত অর্থনৈতিক অঞ্চলগুলোর ক্ষেত্রে। কিন্তু কাজের ধীরগতি নয়, অনুমোদন পাওয়ার ক্ষেত্রেই বেশি জটিলতা বেসরকারি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদোক্তাদের ক্ষেত্রে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) বলছে, এখন পর্যন্ত ৯৪টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের জন্য স্থান নির্ধারণ করা হয়েছে। আর সরকারি-বেসরকারি মিলিয়ে প্রাথমিকভাবে অনুমোদন দেয়া হয়েছে ৮৯টি অর্থনৈতিক অঞ্চলের। এর মধ্যে ১২টিতে উন্নয়ন কার্যক্রম চলছে। ২৫টি অঞ্চলের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা বাস্তবায়ন পর্যায়ে রয়েছে।
তবে এসব অঞ্চলের অগ্রগতিতে ধীরগতি এর সুফল নিয়ে শঙ্কা তৈরি করেছে। প্রকল্পের আওতায় ভূমি উন্নয়ন, অবকাঠামো নির্মাণ বিশেষ করে সড়ক, বিদ্যুৎ ও গ্যাস সংযোগের ক্ষেত্রে দেখা দিয়েছে বহুমুখী প্রতিবন্ধকতা। যদিও এসব অঞ্চলের সেবা ও অবকাঠামো সুবিধা নিশ্চিত করার ক্ষেত্রে সরকারের প্রকল্পও রয়েছে একাধিক। তবে তাতেও বাস্তবায়নের গতি বাড়ছে না। এই প্রকল্পের আওতায় প্রথম পর্যায়ে বাগেরহাটের মোংলা, চট্টগ্রামের মিরসরাই ও আনোয়ারা, মৌলভীবাজারের শেরপুরে, কক্সবাজারের জ্বালাইদ্বীপ এবং টেকনাফ, হবিগঞ্জের চুনারুঘাট, নারায়ণগঞ্জের সোনারগাঁ ও বন্দর থানায় এবং ঢাকার কেরানীগঞ্জ এলাকায় বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চল স্থাপনের অবকাঠামো উন্নয়নের জন্য বেছে নেয়া হয়। প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করছে বিশ্বব্যাংক। তবে পরিকল্পনা কমিশনের বাস্তবায়ন পরিবীক্ষণ ও মূল্যায়ন বিভাগের (আইএমইডি) এক প্রতিবেদন বলছে, প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নে অদক্ষতা, বাস্তবায়নে সঠিক কর্মপরিকল্পনার অভাব এবং যথাযথ নিয়ম মেনে তদারক না হওয়ার কারণে অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়নের প্রকল্পে গতি নেই। যা ভোগাচ্ছে অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোক্তাদের। এতে বেশি ভুক্তভোগী বেসরকারি অর্থনৈতিক অঞ্চলের উদ্যোক্তারা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা পলিসি রিসার্চ ইন্সটিটিউটের নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, আমলাতান্ত্রিক জটিলতা বা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সদিচ্ছার অভাবই মূলত কাজের ধীরগতির বড় কারণ। যেখানে অস্বচ্ছ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তাদের বাড়তি আয়েরও প্রবণতা থাকে। তবে, দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারীদের আস্থা অর্জনে কাজের গতি বাড়ানোর বিকল্প নেই। আর প্রবৃদ্ধির ধারা অব্যাহত রাখতে হলে বেসরকারিখাতের উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের প্রাধান্য দিতে হবে। ডেমোগ্রাফিক ডিভিডেন্টের সুবিধা পেতে অঞ্চলভিত্তিক আরো বেসরকারি অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
আইএমইডি বলেছে, অর্থনৈতিক অঞ্চল উন্নয়ন প্রকল্পের অনুমোদন দেয়া হয় ২০১৪ সালের ৩ জুন। ৮২ কোটি টাকা ব্যয়ের প্রকল্পটি ২০১৬ সালের জুনের মধ্যে শেষ করার কথা ছিল। ২০১৬ সালে প্রকল্পে ১২২ কোটি টাকা ব্যয় ধরে প্রথম সংশোধনী অনুমোদন হয়। নির্ধারিত সময়ে প্রকল্পের কাজ শেষ না হওয়ায় মেয়াদ ২০২১ সালের জুন পর্যন্ত বাড়ানো হয়। ওই সময় ব্যয় বাড়িয়ে ৯০৫ কোটি টাকা করা হয়। প্রকল্পটি দুইবার সংশোধন করে পাঁচ বছর মেয়াদ বাড়ানো হয়। এছাড়া ব্যয় বেড়েছে ৪২৩ কোটি টাকা বা ১০০৫ শতাংশ। আইএমইডি’র সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, সাড়ে চার বছর এ প্রকল্পে ব্যয় হয়েছে ১৮৯ কোটি টাকা বা ২০ দশমিক ৯০ শতাংশ। প্রকল্পের চার ভাগের তিন ভাগই কাজ শেষ করতে হবে মেয়াদের বাকি দুইবছর আট মাসের মধ্যে।
জানতে চাইলে বেজার নির্বাহী চেয়ারম্যান পবন চৌধুরী বলেন, অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার উদ্যোগে বিদ্যুৎ, গ্যাস, সড়ক অবকাঠামো সংযোগ বড় সমস্যা। এগুলোর সমাধানে বেশ কিছু উদ্যোগ রয়েছে। নতুন করে বিশ্বব্যাংকের কাছে আরো ৫ হাজার কোটি টাকা অর্থও চাওয়া হয়েছে। এগুলো পেলে আর কোনো জটিলতা থাকবে না। তবে এখন অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার ক্ষেত্রে বেসরকারি উদ্যোক্তাদের আগ্রহ বেড়েছে অনেক। তাদের বিষয়ে নতুন করে ভাবা হচ্ছে। তবে আমলতান্ত্রিক জটিলতা নয়, সব প্রক্রিয়া মেনেই অঞ্চল প্রতিষ্ঠার অনুমোদন দেয়া হয়। এক্ষেত্রে খুব বেশি সময়ক্ষেপণ হচ্ছে বলেও তিনি মনে করেন না।

Disconnect