ফনেটিক ইউনিজয়
রোহিঙ্গা সংকট
প্রত্যাবাসন আগে নাকি বসবাসের পরিবেশ?
মাসুদুর রহমান

রোহিঙ্গা সংকট নিরসনের লক্ষ্যে রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন কাজ শুরু করার তৎপরতা শুরু হয়েছে। মিয়ানমারের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের স্থায়ী সচিব (পররাষ্ট্র সচিব) সম্প্রতি বাংলাদেশ সফর করেছেন। সফরকালে ঢাকায় দুই দেশের মধ্যে একটি বৈঠক হয়েছে। এতে আগামী ১৫ নভেম্বরের মধ্যে রোহিঙ্গাদের প্রথম দলটি মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। তবে এ উদ্যোগের শুরুতেই জাতিসংঘের তরফে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। জাতিসংঘ বলছে, মিয়ানমারে রোহিঙ্গাদের বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ নেই। সেখানে আগে উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। তারপর প্রত্যাবাসন করা যেতে পারে। তবে বাংলাদেশ বলেছে, প্রত্যাবাসন না হলে রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠানোর পরিবেশ আছে কিনা, তা কী করে জানা যাবে? ফলে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন অবিলম্বে শুরু করতে হবে। এ লক্ষ্যে উভয় দেশ কাজ করছে।
জাতিসংঘ মহাসচিব অ্যান্তোনিও গুতেরেস বলেছেন, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়ায় জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআরকে যুক্ত করা হয়নি। এ নিয়ে তিনি দৃশ্যত হতাশা ব্যক্ত করেছেন। জাতিসংঘের ফ্যাক্ট ফাইন্ডিং মিশন বলছে, মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে এখনও গণহত্যা চলছে। এটা স্পষ্ট যে, এ সময়ে রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন শুরুর কার্যক্রমে জাতিসংঘ খুশি নয়। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় বলেছে, রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন কার্যক্রম থেকে ইউএনএইচসিআরকে বাইরে রাখা হয়নি। তাদেরকে জানিয়েই সব কাজ করা হচ্ছে। পররাষ্ট্র সচিব মো. শহীদুল হক বলেছেন, মিয়ানমারের সঙ্গে আলোচনার সময়ে ৪৮৫ পরিবারের ২২৬০ জন রোহিঙ্গার তালিকা হস্তান্তর করা হয়েছে। বাংলাদেশ তাদের যাচাই সম্পন্ন করেছে। ১৫ নভেম্বরের মধ্যে তাদের ফিরিয়ে নেয়ার জন্যে মিয়ানমারের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছে। এই অনুরোধ জানানোর এক ঘণ্টার মধ্যে ইউএনএইচসিআর, আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা আইওএম এবং আন্তর্জাতিক রেডক্রস আইসিআরসিকে এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে। তবু কেন জাতিসংঘ এসব কথা বলছে, তা জানতে ইউএনএইচসিআর’র বাংলাদেশের প্রধানকে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ডাকা হয়েছিল। তাদের কাছে এ সম্পর্কে ব্যাখ্যা চাইলে তারা বলেছেন, তারা কেউ এখান থেকে কিছু বলেনি। নিউ ইয়র্ক থেকে কেন বলেছে তা তারা জানেন না। এতে করে স্পষ্ট যে, জাতিসংঘ এবং তার অধীন সংস্থাগুলোর ঢাকা অফিসের সঙ্গে নিউ ইয়র্কে তাদের দফতরের কোনও একটা যোগাযোগের মধ্যে ঘাটতি সৃষ্টি হয়েছে। কক্সবাজারে মাঠ পর্যায়ে ইউএনএইচসিআর’র কর্মকর্তারা স্বীকার করেছেন যে, প্রত্যাবাসনসহ সব বিষয়ে তারা কাজ করছেন। তাদের কোনও সমস্যা হচ্ছে না। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সঙ্গে বৈঠকে জাতিসংঘ কর্মকর্তারা বলেছেন, রোহিঙ্গাদের এখনই রাখাইন রাজ্যে ফেরত পাঠানো ঠিক না। তাদের জন্যে সেখানে বসবাসের উপযুক্ত পরিবেশ সৃষ্টি করা জরুরি।
মিয়ানমার গত বছরের আগস্টে রোহিঙ্গাদের ওপর দমন-পীড়ন চালালে দেশটিতে সংখ্যালঘু এ মুসলিম সম্প্রদায়ের লোকেরা বাংলাদেশে প্রবেশ করতে থাকে। এক পর্যায়ে বাংলাদেশ মানবিক কারণে সীমান্ত খুলে দিলে লাখ লাখ রোহিঙ্গা এদেশে আশ্রয় নেন। বর্তমানে বাংলাদেশে মিয়ানমার থেকে আসা রোহিঙ্গার সংখ্যা প্রায় ১১ লাখ। রাখাইন রাজ্যে নির্যাতন-নিপীড়নের প্রবণতা দেখে জাতিসংঘ এটাকে ‘জাতিগত নিধনযজ্ঞ’ বলে অভিহিত করেছে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের কেউ কেউ একে ‘গণহত্যা’ বলেও মনে করেন। মিয়ানমারের লক্ষ্য হলো, রাখাইন রাজ্য থেকে রোহিঙ্গাদের পরিকল্পিত উপায়ে বিতাড়ন করা। ফলে রোহিঙ্গাদের আবার ফিরিয়ে নেয়ার ব্যাপারে মিয়ানমারের অনীহা থাকা স্বাভাবিক। তবে আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে (আইসিসি) মিয়ানমারের জেনারেলদের গণহত্যা ও মানবতাবিরোধী অপরাধে বিচারের দাবি ওঠায় দেশটি বেশ চাপে পড়েছে। তার ওপর মিয়ানমারের সেনাবাহিনীর সবচেয়ে ঘনিষ্ঠ বন্ধু চীন মনে করেছে যে, এই অঞ্চলে অস্থিরতা থাকলে তাদের নিরাপত্তার জন্যে তা ক্ষতির কারণ হবে। তাই চীনও রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নেওয়ার জন্যে মিয়ানমারের ওপর চাপ দিয়েছে। এসব কারণে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে নিতে মিয়ানমার অনেকটা বাধ্য হয়েছে।
বাংলাদেশের জন্যে রোহিঙ্গা সংকট বিরাট এক বোঝা হয়ে এসেছে। বাংলাদেশ এমনিতেই জনবহুল দেশ। তার ওপর এত বিপুল রোহিঙ্গাদের চাপ সহ্য করা কঠিন। কক্সবাজার ও পার্বত্য অঞ্চলে রোহিঙ্গারা পাহাড় কাটায় পরিবেশ ধ্বংস হচ্ছে। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বেড়েছে। প্রথমদিকে মানসিক আতঙ্ক নিয়ে তারা বাংলাদেশে এসেছিল। এখন তাদের সেই ভীতি কেটে গেছে। ফলে রোহিঙ্গারা এখন অনেক অপরাধে জড়িয়ে যাচ্ছে। তাদের নিয়ন্ত্রণ করতে হিমশিম খাচ্ছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী। রোহিঙ্গাদের জন্যে একটি স্বতন্ত্র কারাগার নির্মাণের বিষয় বিবেচনাধীন। কক্সবাজারের ক্রমবিকাশমান পর্যটন শিল্প এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। রোহিঙ্গা সংকটের বহু বিরূপ প্রভাব বাংলাদেশের জন্যে ভয়াবহ হতে পারে।
যত বেশি দিন রোহিঙ্গারা বাংলাদেশে থাকবে, ততই বাংলাদেশের ওপর চাপ আরও বাড়তে থাকবে। তাই রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে ফেরত পাঠানোর বিষয় সরকারের অগ্রাধিকারে রয়েছে। তবে আন্তর্জাতিক রীতি অনুযায়ী, রোহিঙ্গাদের জোর করে মিয়ানমারে ফেরত পাঠানো যাবে না। প্রত্যাবাসন হতে হবে স্বেচ্ছায়। রোহিঙ্গাদের যাচাই সম্পাদনের পর তাদেরকে ট্রানজিট ক্যাম্পে স্থানান্তর করা হবে। এ জন্যে মিয়ানমারের রাখাইন রাজ্যে চীন ও ভারত কিছু বাড়ি নির্মাণ করে দিয়েছে। মিয়ানমার বলেছে, রোহিঙ্গাদের নিরাপত্তা দেয়ার সব আয়োজন করা আছে। এখন কেউ যদি রাখাইন রাজ্যে ফিরে না যায় তাহলে সেখানকার নিরাপত্তা ব্যবস্থাসহ সার্বিক পরিস্থিতি দেখবে কীভাবে। ফলে যত দ্রুত সম্ভব রোহিঙ্গাদের ফেরত পাঠাতে হবে। তবে রাখাইন রাজ্যে ফেরত যাওয়ার মতো পরিবেশ না থাকলে রোহিঙ্গারা স্বেচ্ছায় সেখানে যেতে চাইবে না। তাই রাখাইনে বসবাসের পরিবেশ সৃষ্টি এবং প্রত্যাবাসন একই সঙ্গে হতে হবে। তারপর রোহিঙ্গাদের নাগরিকত্বসহ বিভিন্ন অধিকার আদায় করার লড়াই চালিয়ে যেতে হবে।

Disconnect