ফনেটিক ইউনিজয়
রুপালি ইলিশে চকচকে সম্ভাবনা
ইমদাদ হক

স্বাদ ও গন্ধের কারণে বাঙালির খাদ্য তালিকায় বরাবরই পছন্দের শীর্ষে ইলিশ। রয়েছে কর্মসংস্থানেরও বড় সুযোগ। আবার ইলিশ রপ্তানির মাধ্যমে মিলতে পারে বিদেশি মুদ্রার বড় রিজার্ভও। তবে এ খাতে মধ্যসত্ত্বভোগীদের উপদ্রবের কারণে প্রকৃত জেলেদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না খুব একটা। ইলিশের হালহকিকত নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের প্রথম পর্ব আজ।

বাঙালির খাদ্য তালিকায় বরাবরই পছন্দের শীর্ষে ইলিশ। সবসময় সাধ থাকলেও সাধ্যে মেলে না রুপালি ইলিশের স্বাদ ও ঘ্রাণ। তবে পাল্টাতে শুরু করেছে চিত্রটা। গত কয়েক বছর ধরে অনেকটাই নাগালের মধ্যে মিলতে শুরু করেছে জনপ্রিয় এ খাদ্য উপাদানটি। কারণ হিসেবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশ সংরক্ষণে বিভিন্ন পদক্ষেপ আর ব্যক্তি পর্যায়ের সচেতনতাই সাফল্য এনে দিয়েছে ইলিশের সহজলভ্যতায়।
দেশের কেন্দ্র থেকে প্রান্ত পর্যন্ত জনপ্রিয় খাদ্য অনুষঙ্গ যেমন ইলিশ, তেমনি জনপ্রিয় ভারত, মিয়ানমারসহ দক্ষিণ এশিয়াজুড়েও। তাই তো ইলিশের আমদানি-রপ্তানি নিয়ে পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের সাথে বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাস্যরসের মৃদু বিতর্কও নজর কাড়ে রাজনীতি বিশ্লেষকদের! সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ইলিশের সবচেয়ে বড় আধার বাংলাদেশ। আর বৈশ্বিক আহরণের ৭০ শতাংশই হয় পদ্মা মেঘনার স্রোত থেকে। ইলিশ উৎপাদনে বাংলাদেশই এখন তালিকার শীর্ষে। দেশের মোট উৎপাদনের প্রায় ১২ শতাংশের যোগান ইলিশ থেকে। যার বার্ষিক উৎপাদন ছাড়িয়েছে পাঁচ লাখ টন। গত ৮ বছরে মাছের এই বৃদ্ধির হার প্রায় ৩০ শতাংশ। দেশের জিডিপিতেও ইলিশের অবদান এক শতাংশের কাছাকাছি। সম্প্রতি ব্র্যান্ডিংয়ে বাংলাদেশের পণ্য হিসেবে ট্রেডমার্ক পেয়েছে ইলিশ। যা এনে দিয়েছে বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের নতুন পরিচিতি।
কর্মসংস্থান তৈরিতেও বড় ভূমিকা ইলিশের। পদ্মার শাখা নদী মহানন্দা থেকে শুরু করে মৌলভীবাজারের হাকালুকি হাওর এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার মেদির হাওরেও এ বছর ইলিশ পাওয়া গেছে। যা খানিকটা বিস্ময়করই বটে। ১০ বছর আগেও দেশের ২১টি উপজেলার নদ-নদীতে ইলিশ পাওয়া যেত। বর্তমানে ইলিশ ধরে ১২৫ উপজেলার জেলেরা। এর মধ্যে গড়ে ৩২% সার্বক্ষণিক ও বাকি ৬৮% জেলে খ-কালীনভাবে ইলিশ ধরায় জড়িত। এছাড়া বিপণন, পরিবহন, প্রক্রিয়াজাতকরণ, রপ্তানি এবং জাল ও নৌকা তৈরিতে সার্বিকভাবে ৩০ লাখ লোক প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষাভাবে জড়িত।
ইলিশের আয়ুষ্কাল সাধারণত পাঁচ থেকে সাত বছর। আহরিত ইলিশের শতকরা ৯০ ভাগ ৩০-৫০ সেন্টিমিটার আকারের হয়ে থাকে। বাংলাদেশে মোট ৩ প্রজাতির ইলিশ পাওয়া যায়। এর মধ্যে ২টি প্রজাতি (চন্দনা ও গোর্তা ইলিশ) সারাজীবন উপকূল ও সাগরে কাটায়। অপরটি মিঠাপানি ও লোনা পানিতে জীবন অতিবাহিত করে। ইলিশ ¯্রােতের বিপরীতে দৈনিক ৭০ কিলোমিটার অভিপ্রয়াণ করতে পারে। পৃথিবীর ১১টি দেশে বর্তমানে ইলিশ পাওয়া যায়। এগুলো হচ্ছে বাংলাদেশ, ভারত, মিয়ানমার, পাকিস্তান, ইরান, ইরাক, কুয়েত, বাহরাইন, ইন্দোনেশিয়া, মালয়েশিয়া ও থাইল্যান্ড। ইলিশ আহরণের দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে আছে মিয়ানমার (২০-২৫%) এবং ভারত রয়েছে ৩য় অবস্থানে (১০-১৫%)।
শেরে বাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ড. আহসান হাবিব বলেন, ‘অধিক বৃষ্টিপাত ও ঝড়ো হাওয়া এবং পানির প্রবাহ- সব মিলে পরিবেশ ছিল স্বাভাবিক। যার কারণে গত কয়েক বছর ধরেই বাড়তি ইলিশ সমুদ্র থেকে নদীতে উঠে আসতে পারছে, ডিম ছাড়ছে নিরাপদে। যা অতিরিক্ত ইলিশের যোগানে সহায়ক ভূমিকা রাখছে।’
ইলিশের বাজারে বাংলাদেশের এই যে সাফল্য, এর কারণ হিসেবে সরকার সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বর্তমান সরকার ২০১৯ সালের মধ্যে দেশকে মাছ চাষে স্বয়ংসম্পূর্ণ করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে। এর অংশ হিসেবে বর্তমান উৎপাদনের মাত্রা ৩৮ লাখ টন থেকে বাড়িয়ে ৪২ লাখ টন ধরা হয়েছে। লক্ষ্য পূরণে কাজ করছে মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট ও মৎস্য অধিদপ্তর। জেলেদের সহজ শর্তে ঋণ প্রদান, ইলিশের অভয়াশ্রম নির্ধারণ, প্রতিবছর বাংলাদেশে মার্চ-এপ্রিল মাসে আট সপ্তাহ এবং অক্টোবর মাসে তিন সপ্তাহ ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ থাকে। মার্চ-এপ্রিল মাসে ইলিশ মাছ ধরা নিষিদ্ধ রাখার উদ্দেশ্য জাটকা (ছোট ইলিশ) যাতে বড় হতে পারে। অক্টোবরে তিন সপ্তাহ ইলিশ মাছ ধরা বন্ধ রাখার কারণ হচ্ছে প্রজননক্ষম ইলিশ যাতে ডিম পাড়তে পারে। এর ফলে ৪২ হাজার কোটি ইলিশের ডিম সংরক্ষণ হয় বলে জানিয়েছে মৎস্য অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। রপ্তানি বন্ধ থাকায় দেশের বাজারে অতীতের কয়েক বছরের চাইতে অপেক্ষাকৃত কম দামেই ইলিশ মিলছে। ইলিশের জিআই অর্জন করেছে বাংলদেশ। জীবন রহস্যও উন্মোচিত হয়েছে। ফলে বংশ বিস্তারসহ ইলিশ মাছ থেকে সুস্বাদু নতুন খাবারও বাজার জাতের সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এসব কর্মসূচির ফলেই ইলিশের বাড়তি যোগান সম্ভব হয়েছে। রয়েছে পুকুরের বদ্ধ পানিতে ইলিশ চাষের উদ্যোগও।
বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউটের মহাপরিচালক ড. ইয়াহিয়া মাহমুদ জানান, ‘সাগরের ইলিশ মাছ পুকুরে চাষের জল্পনা-কল্পনা অনেক দিন থেকেই। তা এখন বাস্তবে রূপ দিতে যাচ্ছেন মৎস্য বিজ্ঞানীরা। পটুয়াখালীর কলাপাড়া এলাকার খেপুপাড়ায় নদী উপকেন্দ্রের বদ্ধ পানিতে ইলিশ চাষের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ মৎস্য গবেষণা ইনস্টিটিউট। সাগরের মোহনা থেকে জাটকা ইলিশ পোনা সংগ্রহ করে পুকুরে ছাড়া হয়। গবেষণায় সফলতা পাওয়া গেলে জাতীয় মাছ ইলিশ সাধারণ মানুষের ক্রয় ক্ষমতার মধ্যে আসবে। এখন চাষে বিভিন্ন ধরনের রোগ বালাইয়ের সমস্যা চিহ্নিত ও তার সমাধান এবং পরিবেশের উপর খাপ খাওয়ানোর কাজ চলছে। এটা একটি দীর্ঘ মেয়াদি কার্যক্রম হলেও আমরা সফলতার দিকে এগিয়ে যাচ্ছি।’

Disconnect