ফনেটিক ইউনিজয়
১২ মাসে ৪০ খুন
পাহাড় যেন মৃত্যু উপত্যকা!
সমির মল্লিক, খাগড়াছড়ি

অরণ্য ঘেরা পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন মুত্যু উপত্যকায় পরিণত হয়েছে। অবিরত হত্যাকাণ্ডে রক্ত ঝরছে পাহাড়ে। গত এক বছরের পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে চলতি বছরে খুন হন প্রায় ৪০ জন। পাহাড়ে থামছে না মৃত্যুর মিছিল। এবার খাগড়াছড়ির দীঘিনালায় নিহত হয়েছেন সুভেন্টু চাকমা (৩৮)। তিনি নবগঠিত ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) সক্রিয় সদস্য। ধারণা করা হচ্ছে- তিনি প্রতিপক্ষের গুলিতে নিহত হয়েছেন। দীঘিনালা উপজেলার মেরুং ইউনিয়নে বৃহস্পতিবার রাতে এ ঘটনা ঘটে। নিহত সুভেন্টু চাকমা ওই এলাকার শান্তি কুমার চাকমার ছেলে।
ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ-গণতান্ত্রিক) কেন্দ্রীয় অর্থ সম্পাদক ও মুখপাত্র তজিম চাকমা বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, ‘বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ২টা ২০ মিনিটের দিকে এই ঘটনা ঘটে। এ সময় সুভেন্টু চাকমা নিজ বাড়িতে ঘুমিয়ে ছিলেন। সন্ত্রাসীরা সুভেন্টু চাকমাকে গুলি করে পালিয়ে যায়। এই ঘটনায় প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টকে (ইউপিডিএফ) দায়ী করেছেন তিনি।’
নিহত সুভেন্টু দুই সন্তানের জনক। স্বামীকে হারিয়ে শোকে বিহ্বল স্ত্রী চৈতালী চাকমা। তিনি জানান, ‘রাতে খাওয়া শেষ করে ঘুমিয়েছিলাম। দরজা ঠিকমতো লাগানো হয়নি। রাতে সন্ত্রাসীরা মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে চলে যায়। আমার পাশেই স্বামীর নিথর দেহ পড়েছিল।’
তবে ঘটনার সাথে নিজেদের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করেছেন ইউনাইটেড পিপল্স ডেমোক্রেটিক ফ্রন্টের (ইউপিডিএফ) কেন্দ্রীয় সংগঠক মাইকেল চাকমা। তিনি বলেন, ‘ওই এলাকায় আমাদের কোনো সাংগঠনিক কার্যক্রম নেই। এ ঘটনার সঙ্গে আমরা কোনোভাবেই জড়িত না। এটি তাদের অভ্যন্তরীণ কারণে হতে পারে। এটি সুষ্ঠু তদন্ত করে বের করতে হবে।’
দীঘিনালা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) উত্তম কুমার দেব জানান, ‘ঘটনাস্থল অত্যন্ত দুর্গম হওয়ায় নিরাপত্তা বাহিনীসহ পুলিশের একটি দল লাশ উদ্ধারে রওনা হয়েছে। তবে যতটুকু শুনেছি, নিহত ব্যক্তি ইউপিডিএফ’র (গণতান্ত্রিক) সদস্য। ঘটনাস্থল পৌঁছালে আরো বিস্তারিত জানা যাবে।’
পরিসংখ্যানে দেখা যায়, ২০১৭ সালের নভেম্বর থেকে এখন পর্যন্ত রক্তক্ষয়ী সংর্ঘষে আঞ্চলিক রাজনৈতিক দল ইউপিডিএফ, জেএসএস (লারমা) ও ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক)-এর দলীয় প্রধানসহ অন্তত ৪০ জন নিহত হন। এছাড়া অপহরণ, গুম এবং নিখোঁজের ঘটনাও ঘটেছে। নিহতদের প্রায় সবাই আঞ্চলিক রাজনৈতিক সংগঠনের সক্রিয় নেতা-কর্মী। এর মধ্যে ২১ সেপ্টেম্বর খাগড়াছড়ির সীমান্তবর্তী নানিয়াচরের  রামসুপারিপাড়া এলাকায় জোড়া খুনের ঘটনা ঘটে। ওই ঘটনায় ইউপিডিএফ কর্মী আর্কষণ চাকমা (৪২) ও শ্যামল কান্তি চাকমা ওরফে সুমন্ত (৩৮) নিহত হন। এছাড়া ৭ অক্টোবর খাগড়াছড়িতে প্রতিপক্ষের গুলিতে জেএসএস (লারমা)-এর নেতা মনজু চাকমা (৪৫) নিহত হন। এই হত্যাকা-ের জন্য প্রসীত খীসার নেতৃত্বাধীন ইউপিডিএফকে দায়ী করেছে জেএসএস (এমএন লারমা)। এ ঘটনার দশদিন পর ১৭ অক্টোবর নানিয়াচরের বিহারপুর এলাকায় শান্তি চাকমা (৩৫) নামে এক জেএসএস (লারমা) কর্মী নিহত হয়।
১৯৯৭ সালের শান্তিচুক্তি পরবর্তী সময়ে পাহাড়ে দুই দশক ধরে চলমান রাজনৈতিক দলগুলোর সংঘাতে ব্যাপক প্রাণহানির ঘটনা ঘটেছে। তবে ২০১৫ সালে আঞ্চলিক সংগঠনগুলোর দ্বন্দ্ব-সংঘাত অনেকটায় কমে আসছিল। কিন্তু ২০১৭ সালের ১৫ নভেম্বর ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) সৃষ্টির পর থেকেই বেড়ে যায় সংঘাত। পাহাড়ে আবারো শুরু হয় অস্ত্রের ঝনঝনানি।  আতঙ্ক বিরাজ করছে পাহাড়জুড়ে।
ইউপিডিএফ নেতা মিঠুন চাকমাকে বাড়ি থেকে তুলে নিয়ে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। এরপর সন্ত্রাসীদের গুলিতে নিহত উপজেলা চেয়ারম্যান শক্তিমান চাকমার শেষকৃত্য অনুষ্ঠানের যাওয়ার পথে খাগড়াছড়ি-রাঙ্গামাটির সীমান্তবর্তী এলাকায় ব্রাশফায়ারে নিহত হন ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক) প্রধান তপন জ্যোতি চাকমাসহ (বর্মা) পাঁচজন। এখানেই শেষ নয়! এ হত্যাকাণ্ডের রেশ না কাটতে খাগড়াছড়ির জেলা সদরের স্বনির্ভর এলাকায় ঘটে আরও বড় হত্যাকাণ্ড। ১৮ আগস্ট সংঘটিত ওই হত্যাকাণ্ডে পথচারী, সাধারণ মানুষসহ প্রাণ হারান ছয় জন। বিক্ষোভ চলাকালে আরও একজন নিহত হন। সাম্প্রতিককালে একদিনে সাতজন নিহতের নজির নেই। শান্তিচুক্তির পরবর্তী সময়ে আঞ্চলিক দলসমূহের এত বড় হত্যাকাণ্ড খুব একটা ঘটেনি। এসব বড় হত্যাকাণ্ডের রহস্য উন্মোচনে পুলিশ প্রশাসন এখনো কোনো কূল-কিনারা করে উঠতে পারেনি। এছাড়া ২৮ মে রাঙ্গামাটির বাঘাইছড়ির করইল্ল্যাছড়ি এলাকায় ঘুমন্ত অবস্থায় গুলি করে ইউপিডিএফ’র তিন কর্মী খুন হন।
খাগড়াছড়ির অতিরিক্ত পুলিশ সুপার এমএম সালাউদ্দিন জানান, আইনশৃঙ্খলা নিয়ন্ত্রণে পুলিশ প্রশাসন কাজ করছে। তবে আঞ্চলিক দলগুলো নিজেদের মধ্যে বিরোধ না কমালে হত্যাকাণ্ড বন্ধ করা দুরূহ ব্যাপার। এসময় তিনি আঞ্চলিক দলগুলোর নেতাদের সহনশীল হওয়ার আহ্বান জানান।

Disconnect