ফনেটিক ইউনিজয়
আসাম হত্যাকাণ্ড
ধর্মীয় বনাম জাতিগত বিরোধ?
আহমেদ শরীফ

গত ১ নভেম্বর ভারতের উত্তর-পূর্বের রাজ্য আসামে পাঁচ ব্যক্তিকে অজ্ঞাত বন্দুকধারীরা গুলি করে হত্যা করে। প্রত্যক্ষদর্শীদের ভাষ্যমতে, সন্ধ্যা ৭টা ২০ মিনিটের দিকে দু’টো মোটরসাইকেলে চেপে ছয়জন লোক হাজির হয় আসামের তিনসুকিয়া জেলার ধলা এলাকার বিসনিমুখ গ্রামে। বন্দুকধারীরা এক বাড়ি থেকে শ্যামলাল বিশ্বাস (৬০), অনন্ত বিশ্বাস (১৮) এবং অভিনাশ বিশ্বাসকে (২৫) তুলে নেয়। একইসাথে বন্দুকধারীরা রাস্তা এবং দোকান থেকে আরও তিনজন  সাদেব নমশূদ্র (১৭), সুবল দাশ (৬০) এবং ধনঞ্জয় নমশূদ্রকে (২৩) তুলে নেয়। আটককৃত সকলেই ছিলেন বাঙালি এবং সনাতন ধর্মাবলম্বী। তারা আটক করা ছয়জনকে কাছাকাছি একটা ঝর্ণার উপরে একটা সেতুর কাছে নিয়ে যায়। তাদেরকে ঝর্ণামুখী হয়ে দাঁড়াতে বলে, পেছন থেকে অটোমেটিক রাইফেলে ব্রাশফায়ার করে। স্থানীয় পুলিশের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদমাধ্যম ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস জানায়, ঘটনাস্থলে অন্তত ৩৮টি একে-৪৭ রাইফেলের কার্তুজ পাওয়া গেছে। এই ছয়জনের মধ্যে একজন, সাদেব নমশূদ্র বেঁচে যান। ঝর্ণায় পড়ে গেলে বন্দুকধারীরা তাকে মৃত ভেবে চলে যায়। সাদেব ছাড়া আরও অন্তত তিনজন প্রত্যক্ষদর্শী ছিল সেদিন।
আক্রমণকারীরা ক্যামোফ্ল্যাজ জামা পরিহিত ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা প্রাথমিকভাবে তাদেরকে সামরিক বাহিনীর সদস্য বলে মনে করে। আসাম পুলিশের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানান, তাদের কাছে আসামের বাঙালিদের উপর হামলার একটা পূর্বাভাস ছিল। কিন্তু তারা জানতেন না সেটা কোথায় হবে। বিসনিমুখ গ্রাম মূলত বাঙালি অধ্যুষিত এলাকা, সেখানকার বেশির ভাগ মানুষই কৃষিজীবী অথবা দিনমজুর।
ঘটনার পর আসামের মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বিভিন্ন রাজনৈতিক নেতার উস্কানিমূলক বক্তব্য, কিছু মিডিয়ার কর্মকা- এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আলাপচারিতাকে এই ঘটনার পেছনে দায়ী করেন। কেন্দ্রের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রাজনাথ সিংও দায়ী ব্যক্তিদের খুঁজে বের করে উপযুক্ত শাস্তির তাগিদ দিয়েছেন। রাজ্যের পুলিশ প্রাথমিকভাবে আসামের বিদ্রোহী সংগঠন ‘ইউনাইটেড লিবারেশন ফ্রন্ট অব আসাম’ বা উলফাকে সন্দেহ করলেও মুখ্যমন্ত্রী সর্বানন্দ সোনোয়াল বিদ্রোহীদের দায়ী করে বক্তব্য দেননি। অরপদিকে উলফার একাংশ (উলফা-ইন্ডিপেন্ডেন্ট), যারা সরকারের সঙ্গে শান্তি আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে, তারা এক সংবাদ বিবৃতিতে জানিয়েছে, এ ঘটনায় তাদের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বরং তাদের কথা হলো ভারতের কেন্দ্রীয় বিজেপি সরকারের ন্যাশনাল রেজিস্ট্রার অব সিটিজেন্স বা এনআরসি’কে পরিবর্তন করার চেষ্টার কারণে সৃষ্ট ক্রোধ থেকে এই হত্যাকা- সংঘটিত হয়ে থাকতে পারে। তারা বলছে যে, বিজেপি সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট বিল-২০১৬ পাস করিয়ে আসামের জাতিগত ব্যালান্স নষ্ট করতে চাইছে।
উল্লেখ্য, বিজেপি সরকারের সিটিজেনশিপ এমেন্ডমেন্ট বিল-২০১৬ লোকসভায় আনা হয় ২০১৬ সালের জুলাইয়ে। এর মাধ্যমে ভারতের সিটিজেনশিপ অ্যাক্ট-১৯৫৫-এর কিছু অতি সংবেদনশীল পরিবর্তন আনার কথা বলা হয়। এ আইনের আওতায়, ভারতের পার্শ্ববর্তী দেশ আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং বাংলাদেশের যে কোনো সংখ্যালঘু গোষ্ঠীর জনগণ ভারতের নাগরিকত্ব পেতে পারে।
আসামের তিনসুকিয়া জেলার অল আসাম বেঙ্গলি ইউথ স্টুডেন্টস ফেডারেশন এই ঘটনার প্রতিবাদে ১২ ঘণ্টার হরতাল আহ্বান করে। আসামের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গগৈ এবং আসামের কংগ্রেস নেতারা বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী এবং উলফাকে এ ঘটনার জন্য দায়ী করেন। গগৈ উলফার নেতা মৃণাল হাজারিকাকে উস্কানিমূলক বক্তব্যের জন্যে গ্রেপ্তারের দাবি জানান। তিনি বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী সোনোয়ালের সরকারকে ন্যায়বিচার প্রতিষ্ঠায় অক্ষম বলেও দাবি করেন।
এদিকে, পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এ ঘটনায় তার দল তৃণমূল কংগ্রেসকে রাজ্যজুড়ে প্রতিবাদ করার জন্যে নির্দেশ দিয়েছেন। তৃণমূলের পক্ষ থেকেও এনআরসি পরিবর্তনের চেষ্টাকেই এই ঘটনার জন্যে দায়ী করা হয়।
আসামের নর্থইস্ট নাউ পত্রিকায় প্রকাশিত এক লেখায় আসাম পুলিশের সাবেক ডিরেক্টর জেনারেল হরেকৃষ্ণ দেকা বিজেপি সরকারের নীতির সমালোচনা করেন। তিনি বলেন যে, এনআরসি’কে পরিবর্তন করার মাধ্যমে আসামের আদিবাসীদেরকে নিজভূমিতে সংখ্যালঘু বানিয়ে ফেলা হচ্ছে। তিনি আরও বলেন যে, এ পুরো ব্যাপারটাই হচ্ছে বিজেপি’র ‘ভোট ব্যাংক’ রাজনীতির জন্যে। সংখ্যাগরিষ্ঠ হিন্দু জনগোষ্ঠির ভোট পেতেই বিজেপি এনআরসি বাস্তবায়ন করছে। এনআরসি’তে বাঙালি মুসলিমদের আসাম থেকে তাড়ানোর ব্যবস্থা থাকলেও অন্যান্য দেশ থেকে আসা সংখ্যালঘুদের (প্রধানত হিন্দু) নাগরিকত্ব দেবার প্রতিশ্রুতি দেয়া হচ্ছে। এতে হিন্দু জনগোষ্ঠীর মাঝে বিজেপি’র জনপ্রিয়তা হয়তো বাড়তে পারে, কিন্তু সেটা ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলে ভিন্ন হিসাবের জন্ম দিতে পারে, তা এখন পরিষ্কার হতে শুরু করেছে।
উত্তর-পূর্বে শুধুমাত্র ধর্মীয় বিশ্বাসগত দিক থেকে চিন্তা করে এনআরসি করার চেষ্টা আদিবাসীদের অনেকের কাছেই গ্রহণযোগ্য হয়নি। তাদের কাছে জাতিগত দিকটাও যে গুরুত্বপূর্ণ, তা বিজেপি’র ভোটের রাজনীতিতে স্থান পায়নি। যে ধর্মের মানুষই হোক না কেন, তাদেরকে আসামের সম্পদকে ভাগ করেই চলতে হবে; যা কিনা সেখানকার আদিবাসীদের অনেকের কাছেই অগ্রহণযোগ্য। আসামের আদিবাসীরা অন্যদেশ শুধু নয়, ভারতের অন্য রাজ্য থেকে আসা লোকদেরও বাইরের লোক হিসেবেই দেখছে- তার ধর্মবিশ্বাস যা-ই থাকুক না কেন। অর্থাৎ বিজেপি’র হিন্দুত্ববাদের ধর্মীয় রাজনীতির বিপরীতে রয়েছে আসামের আদিবাসীদের জাতিগত চিন্তা।
আসামের তিনসুকিয়া হত্যাকাণ্ড যার দ্বারাই হয়ে থাকুক না কেন, তা ভারতের দুর্বলতম অংশেরই পরিচায়ক। ধর্মীয় এবং জাতিগত- এ দ্বন্দ্বের মাঝে ভারত রাষ্ট্রের সেক্যুলার ভিত্তিই প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছে। এনআরসি’র মাধ্যমে বিজেপি সরকার ধর্মকে ব্যবহার করে আশেপাশের দেশগুলোতে প্রভাব বিস্তার করতে চাইছিল, তবে এখন সামনে আসছে আদিবাসীদের জাতিগত চিন্তার প্রাধান্য।

Disconnect