ফনেটিক ইউনিজয়
রপ্তানি আয়ের সম্ভাবনা রূপালি ইলিশে
ইমদাদ হক

স্বাদ ও গন্ধের কারণে বাঙালির খাদ্য তালিকায় বরাবরই পছন্দের শীর্ষে ইলিশ। রয়েছে কর্মসংস্থানেরও বড় সুযোগ। আবার ইলিশ রপ্তানির মাধ্যমে মিলতে পারে বিদেশি মুদ্রার বড় রিজার্ভও। তবে এ খাতে মধ্যস্বত্বভোগীদের উপদ্রবের কারণে প্রকৃত জেলেদের ভাগ্য পরিবর্তন হচ্ছে না খুব একটা। ইলিশের হালহকিকত নিয়ে চার পর্বের ধারাবাহিক আয়োজনের শেষ পর্ব আজ।

পূর্ব লন্ডনের হোয়াইট চ্যাপেল এলাকায় প্রবাসী বাংলাদেশিদের ভিন্ন ভিন্ন দোকান চোখে পড়ে। সেগুলোর মধ্যে একটি গ্রোাসারি শপের নাম হাট-বাজার। দোকানটিতে সাজানো রয়েছে ফলমূল, শাকসবজি, মাছসহ বিভিন্ন পণ্য। আর বিশাল আকারের রেফ্রিজারেটরে অন্য অনেক মাছের সঙ্গে রয়েছে সুস্বাদু ইলিশ। তাও আবার বাংলাদেশের চাঁদপুরের।
ইলিশের একটি প্যাকেটে বড় হরফে বাংলা ও ইংরেজিতে লেখা ‘চাঁদপুরী’। প্যাকেটের গায়ে রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের নামও রয়েছে। মাছের ওজন ৮০০ থেকে এক হাজার গ্রাম। প্রতি কেজি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে ১৫ পাউন্ডে। লন্ডনে বসবাস করা কয়েকজন প্রবাসী জানান, দেশটির বিভিন্ন জায়গায় কমবেশি বাংলাদেশের ইলিশ নিয়মিত পাওয়া যায়।
এমন ঘটনা পৃথিবীর অনেক দেশেই। বাংলাদেশ থেকে পাচার হওয়া ইলিশ ভারতের পশ্চিমবঙ্গের কলকাতার বাজারে বিক্রি হয়- এমন অভিযোগ দীর্ঘদিনের। ভারতের অন্যান্য শহরেও দেখা মেলে পদ্মা বা মেঘনার ইলিশ। বিশেষ করে সাদা মাছ রপ্তানির আড়ালে ইলিশ পাচার হয়ে যাচ্ছে। এর আগে রপ্তানি হওয়া প্রতি কেজি ইলিশ মাছের রপ্তানিমূল্য ছিল ছয় ডলার আর সাদা মাছ আড়াই ডলার। যে কারণে বাড়তি লাভের আশায় কিছু অসাধু ব্যবসায়ী সাদা মাছের কার্টনে ইলিশ মাছ পাচার করছে। সবশেষ ২০০৮-০৯ অর্থবছরে এ দেশ থেকে তিন হাজার ৬৮০ টন ইলিশ রপ্তানি হয়। এতে আয় হয়েছিল ১৪৯ কোটি টাকা। ২০০৯-১০ অর্থবছরে তিন হাজার ১০০ টন ইলিশ রপ্তানি করে আয় হয় ১২৫ কোটি টাকা। ২০১০-১১ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন তিন লাখ ৪০ হাজার টন, রপ্তানি সাড়ে আট হাজার টন। যার রপ্তানি মূল্য ৩৫২ কোটি টাকা। আর গত ২০১১-১২ অর্থবছরে রপ্তানি হয় সাড়ে ছয় হাজার ১৭৩ টন, যা টাকার অঙ্কে ২৯৪ কোটি টাকা।
কৃষি অর্থনীতিবিদ ড. শামসুল আলম বলেন, সরকারের বহুমুখী কর্মসূচির মাধ্যমে ইলিশ জেলেদেরও নিরাপত্তা নিশ্চিতে পদক্ষেপ নেয়া হয়েছে। ইলিশের উৎপাদনও বেড়েছে আগের তুলনায়। তবে ব্যক্তিগত উদ্যোগ কিংবা পুকুরে ইলিশ চাষের ব্যাপারে যে গবেষণা চলছে, তাতে সাফল্য আনতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে। আর বাংলাদেশসহ পৃথিবীর অনেক দেশেই ইলিশের ব্যাপক চাহিদা রয়েছে। বাড়তি উৎপাদন হলে ইলিশ রপ্তানির উদ্যোগ দোষের কিছু না।
আনুষ্ঠানিকভাবে ইলিশ রপ্তানি বন্ধ কয়েক বছর ধরেই। ২০১০ থেকে ২০১২ সাল পর্যন্ত দুই অর্থবছরে বাংলাদেশ থেকে ইলিশ মাছ রপ্তানি হয়েছে। দেশের মানুষের চাহিদা মেটানোর লক্ষ্যে এমন পদক্ষেপ নেয়া হয় বলে জানান সরকার সংশ্লিষ্টরা। একই সঙ্গে ইলিশের উৎপাদন বৃদ্ধির দিকে বিশেষভাবে নজর দেয়া হয়। তাতে ফলও মেলে হাতেনাতে। উৎপাদন বৃদ্ধির ধারাবাহিকতায় ২০১৭-১৮ অর্থবছরে দেশে ইলিশের উৎপাদন ছাড়িয়ে যায় ৫ লাখ টন। বিশ্বে ইলিশ উৎপাদনে প্রথম বাংলাদেশ। বিশ্ব উৎপাদনের ৭০-৭৫ শতাংশ ইলিশ বাংলাদেশ উৎপাদন করে। সার্বিকভাবে মাছ উৎপাদন ৪২ লাখ ৭৭ হাজার টনে উন্নীত হবার পেছনেও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ইলিশের। বাংলাদেশে উৎপাদিত মাছের প্রায় ১২ শতাংশ আসে শুধু ইলিশ থেকে। মাত্র নয় বছরের ব্যবধানে এ উৎপাদন বৃদ্ধি পেয়েছে প্রায় ৬৬ শতাংশ। ২০০৮-০৯ অর্থবছরে ইলিশের উৎপাদন ছিল ২ লাখ ৯৮ হাজার টন, বিগত নয় বছরে তা বৃদ্ধি পেয়ে পাঁচলাখ টনে উন্নীত হয়েছে। যার বর্তমান বাজারমূল্য প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ মন্ত্রী নারায়ণ চন্দ্র বলেন, পেটেন্ট, ডিজাইন ও ট্রেডমার্ক অধিদপ্তর প্রয়োজনীয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা ও আইনানুগ কার্যক্রম শেষে বাংলাদেশের জাতীয় মাছ ইলিশের ভৌগোলিক নিবন্ধন (জিআই সনদ) প্রদান করেছে। এর ফলে বিশেষ বৈশিষ্ট্য ও গুণগত মানসম্পন্ন ইলিশ বাজারজাতের মাধ্যমে দেশ-বিদেশে বাণিজ্যিকসহ অন্যান্য সুবিধা পাওয়া যাবে। মাছ রপ্তানির বিষয়ে জিজ্ঞাসা করা হলে তিনি জানান, আমরা ইলিশ রপ্তানির দিকে যেতে চাচ্ছি। আমাদের যেহেতু উৎপাদন হচ্ছে, আন্তর্জাতিক বাজারে চাহিদাও আছে। সেজন্য আমরা কিছুটা রপ্তানি করতে চাই। রপ্তানির অনুমতি না দিলেও এ মাছ বিভিন্ন চোরাইপথে চলে যায়। ফলে রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হয় রাষ্ট্র। তাই আমরা যদি রপ্তানি করি, পথটা যদি ওপেন করে দেয়া হয়, তবে গোপনে যাওয়ার পথ সংকুচিত হবে।
মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ২০০২-০৩ অর্থবছরে দেশে উৎপাদিত ইলিশের পরিমাণ ছিল একলাখ ৩৩ হাজার টন। ২০০৮-০৯ অর্থবছর এর পরিমাণ বেড়ে দাঁড়ায় দুই লাখ ৯৮ হাজার টনে। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে যার পরিমাণ ছিল তিন লাখ ৮৫ হাজার টন। ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তা চার লাখ টন ছাড়িয়ে যায়। ২০১৫-১৬ অর্থবছর দেশে ইলিশের উৎপাদন ছিল ৪ লাখ ২৭ হাজার টন। আর ২০১৭-১৮ অর্থবছরে এর পরিমাণ গিয়ে ঠেকে প্রায় সোয়া ৫ লাখ টনের ঘরে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, মা ইলিশ সুরক্ষা ও ডিম ছাড়ার পরিবেশ সৃষ্টি করায় এ সফলতা এসেছে। এ অর্জন ধরে রাখতে হবে।
এদিকে মৎস্য অধিদপ্তরও চায় বৈধপথে ইলিশ মাছ রপ্তানি হোক। কিন্তু সে জন্য নির্দিষ্ট সময় পর্যন্ত তারা ইলিশের উৎপাদন পর্যবেক্ষণ করতে চায়। মৎস্য অধিদপ্তরের জাটকা সংরক্ষণ, জেলেদের বিকল্প কর্মসংস্থান ও গবেষণা প্রকল্পের পরিচালক এবিএম জাহিদ হাবিব জানান, ইলিশের চাহিদা ও উৎপাদন, পুকুরে চাষাবাদের সম্ভাবনাসহ সার্বিক দিক পর্যালোচনা করা হচ্ছে। অধিদপ্তরের সাবেক মহাপরিচালক সৈয়দ আরিফ আজাদ বলেন, চাহিদার তুলনায় উৎপাদন ঠিক থাকলে ইলিশ রপ্তানির উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে।
সরকার ৬০০ গ্রাম থেকে এক কেজি ওজনের ইলিশের রপ্তানিমূল্য নির্ধারণ করেছে কেজিপ্রতি ছয় ডলার। এক থেকে দেড় কেজি ওজনের ইলিশের কেজিপ্রতি মূল্য আট ডলার। যেখানে দেড় কেজির বেশি ওজনের ইলিশের কেজিপ্রতি মূল্য ১২ ডলার।

Disconnect