ফনেটিক ইউনিজয়
পাহাড়ি লোকজশিল্প টিকিয়ে রেখেছে সংখ্যালঘু জাতিসত্তার মানুষ
সমির মল্লিক, দীঘিনালা (খাগড়াছড়ি)

চাকমা, ত্রিপুরা, মারমা, মুরং, খুমিসহ অন্তত ১৩টি জাতিসত্তার বসবাস পার্বত্য চট্টগ্রামে। জীবনাচারে ফারাক থাকলেও পাহাড়ের জীবনকেন্দ্রিক এই ভূমিসন্তানদের জীবন-জীবিকায় ফুটে ওঠে পাহাড়ি লোকজ সংস্কৃতির প্রতিচ্ছবি। তাদের জীবনবোধেও গড়ে উঠেছে এক শৈল্পিকতা। দীর্ঘকাল ধরে পাহাড়ে লোকশিল্প ধারণ ও তার বিকাশে অবদান রাখছে পার্বত্য চট্টগ্রামের জাতিসত্তাগুলো। প্রতিদিনকার যাপিত জীবনের বহুলাংশে বাঁশ, বেত, পাখিদেহের বিভিন্ন অংশ বা প্রাচীন গাছ দিয়ে শিল্পের এক অকৃত্রিম রূপ ফুটে উঠেছে।
কেবল নান্দনিক সৌন্দর্য নয়, জীবনের প্রয়োজনে এসব শিল্প আজও পাহাড়ের মানুষের বেঁচে থাকার অবলম্বন। এদিকে এসব কারুশিল্প যেমন গৃহস্থালির কাজে আসছে, তেমনি এসব পণ্য থেকে আসে বাড়তি আয়। এসব কারুশিল্প স্থান পেয়েছে জাতিসত্তাগুলোর কবিতা, গল্প ও গানে। কাবাং, বাইলে, চরগা, চেমাই, হুক্কা, মেজাংসহ ১৫-২০ ধরনের হস্তশিল্প পাহাড়ি জনগোষ্ঠী নিজেরাই তৈরি করছে।
পার্বত্য অঞ্চলে জুমিয়া বা জুমচাষিদের জন্য কাবাং বা হাল্লোং পরিহার্য। বিকেল হলেই কাবাং বা হাল্লোং বোঝাই করে ফেরেন জুমচাষিরা। জুমের ধান, ফসল, তরিতরকারিসহ নানা কিছুতেই ব্যবহার হয় এই কাবাং বা হাল্লোং। বাঁশের মাঝখানের নরম বেত দিয়ে কাবাং বানান গৃহস্থরা। ওপরে আর নিচে থাকে বাঁশের শক্ত অংশ, যাতে ওজন বইতে পারে। কৃষিপণ্য ছাড়াও বিবাহের আয়োজনে মালামাল বাহনে এটি ব্যবহার করা হয়। বাঁশের নান্দনিক ভাঁজে ভাঁজে শিল্পীর নিপুণ হাতে তৈরি হয় কাবাং। তবে বৈশ্বিক পরিবর্তনের হাওয়ায় কাবাং বা হাল্লোং রূপ পেয়েছে প্ল্যাস্টিকের বেতে। তারপরও পাহাড়িদের তৈরি নিপুণ কারুকাজের কাবাং বা হাল্লোং জুমের ক্ষেতে কিংবা ঘরের কাজে সমান গুরুত্বপূর্ণ। বাজারে সবচেয়ে বেশি পাওয়া যায় তলুই, কাবাং, মেজাং, লুসি, আড়ি লাই, হুরুম, চাঁই ইত্যাদি। ঠাকুরছড়া গ্রামের বাসিন্দা হিরনজয় ত্রিপুরা বলেন, ‘জুমের চাষাবাদ করা আমাদের মূল পেশা। তাই হাতে সময় পেলে লাই, কাবাং, বুমথু, তন ইত্যাদি বানাই। নিজেদের গৃহস্থালিকাজে যেমন এসব ব্যবহার করা যায়, তেমনি বাড়তি বুনন করে সাপ্তাহিক হাটে বিক্রি করে কিছু আয়ও হয়।’
আবার অনেকে এসব লোকজ হস্তশিল্পকেই পেশা হিসেবে বেছে নিয়েছেন। খাগড়াছড়ির দীঘিনালা উপজেলা যৌথ খামার এলাকার অনেক বাসিন্দা বাজারে বিভিন্ন রকম হস্তশিল্প বিক্রি করতে আসেন। তাঁরা জানান, সাধারণত গভীর জঙ্গল থেকে বাঁশ, বেত সংগ্রহ করতে হয়। একসময় পাহাড়ে বেত সহজলভ্য হলেও বর্তমানে বেতের অভাবে কাজ করা কঠিন। তবে বাঁশ, বেত এই দুটোর জোগান থাকলে মৌসুমভিত্তিক চাহিদার কথা বিবেচনায় রেখে তাঁরা নিজেরাই বিভিন্ন রকম জিনিস তৈরি করেন বলে জানান।
একসময় পাহাড়ের প্রতিটি বাড়িতে ছিল এসব লোকজ শিল্প। তবে আর্থ-সামাজিক ও বৈশ্বিক পরিবর্তনের ফলে বাঁশ, বেতের হস্তশিল্পের জায়গা দখল করছে আধুনিক পণ্যসামগ্রী। তবু আজও  এই পাহাড়ি জনগোষ্ঠীর জুম কিংবা গৃহস্থালি কাজের প্রয়োজনে পাহাড়ের এসব লোকজশিল্প টিকে আছে।

Disconnect