ফনেটিক ইউনিজয়
নারী মুক্তিযোদ্ধা ডা. সৈয়দা বদরুন্নাহার চৌধুরী
দশ-পনেরো বছর আগের থেকে নারীরা এখন অনেক বেশি সচেতন

বাংলাদেশে যে কজন নারী মুক্তিযোদ্ধা রয়েছেন, ডা. সৈয়দা বদরুন্নাহার চৌধুরী তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তিনি পেশায় একজন চিকিৎসক। স্বাধীনতাযুদ্ধে সরাসরি অংশ নিয়েছেন। চাঁদপুরে সেনাক্যাম্প থেকে উদ্ধার হওয়া নারীদের সেবা দিয়ে সুস্থ করেছেন। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সাবেক এ অতিরিক্ত মহাপরিচালক বর্তমানেও গরিব-অসহায় রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে যাচ্ছেন। স্বীকৃতি হিসেবে পেয়েছেন স্বাধীনতা পদক। সাম্প্রতিক দেশকাল-এর মুখোমুখি হয়ে বলেছেন যুদ্ধকালীন কিছু স্মৃতিকথা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন চাঁদপুর প্রতিনিধি আশিক বিন রহিম

একাত্তরে আপনি কী করতেন? আর স্বাধীনতাযুদ্ধে কীভাবে জড়িয়ে পড়লেন?
স্বাধীনতাযুদ্ধের সময় আমি ঢাকা মেডিকেল কলেজের পঞ্চম বর্ষের ছাত্রী ছিলাম। আমি ও আমার স্বামী অ্যাডভোকেট তাফাজ্জল হায়দার নসু চৌধুরী বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ শুনেছিলাম। তখনই নিজের মধ্যে দেশের জন্য কিছু করার তাড়না জাগে। অনুভব করে ‘স্বাধীনতা’ আমাদের চাই-ই চাই। ২৫ মার্চ যুদ্ধ শুরু হলে নিজের এলাকা চাঁদপুর হাজীগঞ্জে চলে আসি। এখান থেকেই আমি মুক্তিবাহিনীতে যোগ দেই।

যুদ্ধের সময় মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে আপনি কী করতেন?
আমি যুদ্ধে সরাসরি অংশগ্রহণ করেছি। যেহেতু আমি ডাক্তারি পড়ছিলাম, সেহেতু স্বাভাবিকভাবেই রণাঙ্গনে চিকিৎসাসেবার ভার ছিল আমার ওপর।

যুদ্ধকালীন কোনো উল্লেখযোগ্য স্মৃতি সম্পর্কে বলুন।
১৯৭১-এর একটি দিনের কথা এখনো স্পষ্ট মনে আছে। দিনটি ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর, বিকেলবেলা। গুঁড়ি গুঁড়ি বৃষ্টিতে আমরা সবাই নৌকায় ছিলাম। আমাদের ক্যাপ্টেন ছিল জহিরুল হক খান। সেদিন শাহরাস্তির অফিস চিতোষীতে পাকিস্তানি বাহিনীর ক্যাম্পে আমাদের যোদ্ধারা আক্রমণ চালায়। এ আক্রমণে আমরা বিজয়ী হই। ক্যাম্প দখলের পর খবর দেওয়া হলে ক্যাম্পের ভেতরে যাই। আগেই আমাদের কাছে খবর ছিল এ ক্যাম্পে পাক সেনারা কয়েকজন মেয়েকে ধরে এনেছে। ভেতরে গিয়ে আমার গা শিউরে উঠল। দেখি, ক্যাম্পের একটা অংশে কতগুলো মেয়ে, তাঁদের গায়ে কোনো বস্ত্র ছিল না, সারা শরীরে পাশবিক নির্যাতনের চিহ্ন। পরবর্তী সময়ে সঙ্গী মুক্তিযোদ্ধাদের কাছ থেকে তাদের জামা নিয়ে মেয়েদের পরতে দিলাম। ওই সময় আমার সঙ্গে কোনো ওষুধপথ্য ছিল না। আমরা মেয়েদের পানিয়ারার ক্যাম্পে নিয়ে যাই। সেখানে তাদের সেবা-শুশ্রুষা করি। জানা গেল, মেয়েদের বাড়ি চাঁদপুরের পার্শ্ববর্তী জেলা শরীয়তপুরে। এরপর কিছুটা সুস্থ হলে আমরা তাঁদের বাড়িতে পাঠিয়ে দিই। এই ঘটনাটা আমার প্রায়ই মনে পড়ে।

আপনি তো ২০১২ সালে স্বাধীনতা পদক পেয়েছেন। এ পদক প্রাপ্তির অনুভূতি সম্পর্কে কিছু বলুন।
স্বাধীনতার এত বছর পর স্বাধীনতার সপক্ষের সরকার মুক্তিযোদ্ধাদের মূল্যায়ন করেছে, এটা ভাবতেই ভালো লাগে। স্বাধীনতা পদক প্রাপ্তি আমাকে আনন্দিত করেছে। আমাকে এই স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য সরকারকে ধন্যবাদ জানাচ্ছি।

যে স্বপ্ন নিয়ে যুদ্ধ করেছেন, বর্তমান বাংলাদেশে সে প্রাপ্তি কতটুকু দৃশ্যমান বলে মনে করেন?
মুক্তিযুদ্ধের মাধ্যমের আমরা পরাধীনতা থেকে মুক্ত হয়েছি। একটি স্বাধীন ভূখ- ও পতাকা পেয়েছি। এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কী হতে পারে। সারা বিশ্ব বাংলাদেশকে সম্মানের চোখে দেখছে, এতেই আমাদের প্রাপ্তি।

বর্তমানে আপনি কী করছেন? আপনার সময় কীভাবে কাটছে?
আগেই বলেছি, যুদ্ধকালীন আমি মেডিকেলের ছাত্রী ছিলাম। যুদ্ধ শেষ হলে আমি ডাক্তারি পাস করি। চিকিৎসক হিসেবে কর্মজীবন শুরু করি। এখনো এ পেশাতেই আছি। এ ছাড়া বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক কর্মকা-ের সঙ্গে যুক্ত আছি। এভাবেই সময় বেশ কেটে যাচ্ছে।

এই সময়ে নারীদের আপনি কীভাবে মূল্যায়ন করবেন?
একটা সময় ছিল নারীদের পদচারণ বাসনকোসন মাজা আর রান্নাবান্নার ভেতর সীমাবদ্ধ ছিল। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে নারীদের কর্ম অনেকভাবে পাল্টেছে। তাঁরা শিক্ষা-দীক্ষায়, জ্ঞান-বিজ্ঞানে, চাকরি ক্ষেত্রে অনেক এগিয়েছেন। আমি বলব, দশ-পনেরো বছর আগের চেয়ে নারীরা এখন অনেক বেশি সচেতন।

নারীদের এগিয়ে চলার পথে কোনো প্রতিবন্ধকতা আপনার চোখে পড়ে?
নারীবৈষম্য বাংলাদেশে আইনগতভাবে দূর হয়েছে। কিন্তু মনের বৈষম্য এখনো দূর হয়নি। নারীর কোনো কীর্তিকে স্বতঃস্ফূর্তভাবে অভিবাদন জানানোর পরিবেশ এখনো ভালোভাবে সৃষ্টি হয়নি। তবে আমার মনে হয়, আগামী ক’ বছরের মধ্যেই এ অবস্থার উত্তরণ ঘটতে পারে।

তরুণদের উদ্দেশে কিছু বলুন?
এক সাগর রক্তের বিনিময়ে আমাদের বাংলাদেশ। আর তরুণ-তরুণীরাই এ দেশের প্রাণশক্তি। তারা স্বাধীনতার ধারক ও বাহক। তারা স্বাধীনতার চেতনা যেমন সঞ্চার করবে, তেমনি অন্যদের মাঝে সঞ্চারিতও করবে। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী হলেই সোনার বাংলা গড়া সম্ভব হবে।

আপনার সবচেয়ে ভালো ও খারাপ দিক কোনটি?
(কিছুটা হেসে) ভালো দিক বলতে, সমাজের যা কিছু ভালো তার সঙ্গে থাকতে চাই। খারাপ দিক বলতে, প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো গরিব-অসহায় রোগীকে বিনা মূল্যে চিকিৎসা দিয়ে থাকি। কিন্তু (এবার চোখের পানি ফেলে) যখন কোনো গরিব রোগীর চিকিৎসা আমার সাধ্যের বাইরে চলে যায়, আমি তার জন্য কিছু করতে পারি না, তখন খারাপ লাগে।

বিজয়ের মাসে সাম্প্রতিক দেশকাল-এর পক্ষ থেকে আপনাকে অশেষ শ্রদ্ধা ও ধন্যবাদ।
সাম্প্রতিক দেশকাল-এর মাধ্যমে সবাইকে বিজয়ের শুভেচ্ছা। আমি আশা করব পত্রিকাটি প্রতি সপ্তাহে দেশের নানা সমস্যার পাশাপাশি সম্ভাবনার নতুন-নতুন খবর নিয়ে পাঠক মহলে হাজির হবে। সাম্প্রতিক দেশকালকেও ধন্যবাদ।

Disconnect