কৃষি বাজেটে করোনাকালীন সংকটের প্রতিফলন নেই

করোনাভাইরাসের সর্বগ্রাসী প্রভাবে বিপর্যস্ত দেশের কৃষি খাত। সবচেয়ে বেশি সংকট সৃষ্টি হবে খাদ্য নিয়ে। দেশের ফসল উৎপাদনসহ কৃষক, কৃষি শ্রমিক ও সংশ্লিষ্টদের জীবন-জীবিকা নিশ্চিত করতে চ্যালেঞ্জের মুখে পড়বে এ খাত। করোনাভাইরাসের মধ্যেই দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলে আম্ফানের তাণ্ডবে কৃষক ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। অথচ সংকটে ঘেরা কৃষি খাতের যে প্রতিফলন বাজেটে থাকা উচিত ছিল, তা দেখা যায়নি। উপরন্তু করোনা-পরবর্তী বিশ্ব দুর্ভিক্ষের মুখে পড়তে পারে- এমন পূর্বাভাসও দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো।

বেসরকারি প্রতিষ্ঠান ব্র্যাকের এক গবেষণায় দেখা গেছে, করোনাভাইরাসের কারণে মাত্র দেড় মাসে কৃষির ক্ষতি হয়েছে ৫৬ হাজার ৫৩৬ কোটি ৬৮ লাখ টাকা। ভেঙে পড়েছে সরবরাহ চেইন ও কৃষিপণ্যের বাজার ব্যবস্থা। উৎপাদন মূল্যের চেয়ে কম দামে শাকসবজি, মাছ, মুরগি, ডিম ও দুধ বিক্রি করে ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন- এ খাত সংশ্লিষ্ট কৃষক ও খামারিরা। লকডাউনের কারণে এ খাতের ক্ষুদ্র, পাইকারি ব্যবসায়ী, ফড়িয়ারাও ক্ষতির শিকার হয়েছেন। এ ছাড়া ঘূর্ণিঝড় আম্ফানেও ভীষণ ক্ষতির কবলে পড়েন দেশের দক্ষিণ, পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলের কৃষক, মৌসুমি ফলবাগান ও চিংড়ি ঘের মালিকরা।

কৃষিবিদরা বলছেন, কৃষি খাতের বরাদ্দ প্রায় ১৯ শতাংশ বেড়েছে; কিন্তু সেটি কীভাবে খরচ হবে, তার নির্দেশনা খুব বেশি নেই। বাজেটে নদীভাঙন এলাকার কৃষি রক্ষার জন্যও কোনো পরিকল্পনা নেই। আগামীতে কৃষির ওপর মানুষের নির্ভরতা বাড়বে। এ জন্য কৃষকের উৎপাদিত পণ্যের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত করতে হবে। কৃষি বাঁচিয়ে রাখতে হলে কৃষককে সরাসরি প্রণোদনার অর্থ দিতে হবে। কৃষি খাতের কারণে মানুষ অর্থনৈতিকভাবে এখনো টিকে আছে। করোনাভাইরাস সংকটে কৃষির ওপর মানুষের নির্ভরতা আরও স্পষ্ট হয়েছে। অন্যদিকে, প্রযুক্তিনির্ভর কৃষি খাতে তরুণ প্রজন্মকে নিয়ে আসতে হলে নতুন ভাবনা থাকা উচিত। প্রথাগত কৃষি থেকে সারাবিশ্বই এখন নতুন ও উদ্ভাবনী কৃষির দিকে ঝুঁকছে। মাইক্রোগ্রিন নামে পরিচিত শহুরে ছাদকৃষির ব্যাপক প্রচলন শুরু হয়েছে। অথচ এ নিয়ে কৃষি বিভাগের বিশেষ কোনো উদ্যোগ নেই। দেশের খাদ্য চাহিদা নিশ্চিত করতে কৃষির ওপর সর্বোচ্চ জোর দিতে হবে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. আতিউর রহমান বলেন, ‘করোনাভাইরাস পরিস্থিতিতে কৃষি খাতে জোর দিতে হবে। এ ক্ষেত্রে কৃষিপণ্য বাজারজাত করতে আধুনিক ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। তরুণদের দিয়ে গ্রুপ তৈরি করে কৃষকের পণ্য কিনে বিক্রির ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া উৎসাহ জোগাতে ১০ টাকার ব্যাংক হিসাবে প্রত্যেক কৃষককে ১ হাজার টাকা উপহার দেয়া যেতে পারে। এতে কৃষক আরো বেশি উৎসাহিত হবেন। কারণ কৃষি খাতই এখন আমাদের অগ্রাধিকার হিসেবে বিবেচিত হবে। সময় এসেছে কৃষি ডাটাবেজ তৈরির। ডাটাবেজ থাকলে কোন কৃষক কী উৎপাদন করেন, তা সহজে জানা যাবে। কৃষি যন্ত্রপাতি আমদানির ক্ষেত্রে কর মওকুফ করা যেতে পারে।’

এ বিষয়ে কৃষিমন্ত্রী ড. মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, ‘বাজেটে সরকার স্বাস্থ্য খাতের পর দ্বিতীয় সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছে কৃষিকে। এ ছাড়া আগামী তিন বছরের জন্য কৃষি খাত নিয়ে একটি মধ্যমেয়াদি পরিকল্পনা করা হচ্ছে। মধ্যমেয়াদি কৃষি খাতে বেশ কয়েকটি উদ্যোগ গ্রহণ করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে পরিবেশবান্ধব ও ব্যয়সাশ্রয়ী প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ানোর কর্মসূচি। এর মাধ্যমে কৃষির উৎপাদন আরো বাড়ানো হবে। পরিকল্পনায় আছে কৃষিকে যান্ত্রিকীকরণের বিষয়টিও। এতে সুবিধা হবে- কমসংখ্যক কৃষক অধিক পরিমাণ ফসল উৎপাদন করতে পারবেন। এ ছাড়া নবায়নযোগ্য জ্বালানি এবং কৃষিজমির ব্যবহার বৃদ্ধি করা হবে। বর্তমানে অনেক কৃষিজমি পড়ে আছে, ব্যবহার হচ্ছে না। এসব জমি চাষাবাদের আওতায় আনা হবে।’

গত ১১ জুন অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জাতীয় সংসদে ২০২০-২১ অর্থবছরের বাজেট উপস্থাপন করেন। বাজেটে কৃষি, মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ এবং খাদ্য নিরাপত্তা মিলিয়ে ২২ হাজার ৪৮৯ কোটি টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে, যা গত অর্থবছরের তুলনায় এক হাজার পাঁচ কোটি টাকা বেশি এবং মোট বাজেটের শতকরা ৩.৯৬ ভাগ। শুধু কৃষি মন্ত্রণালয়ের জন্য এবারের বাজেটে বরাদ্দ রাখা হয়েছে ১৫ হাজার ৪৪২ কোটি টাকা, যা গত বছরের তুলনায় দুই হাজার ৪৮৫ কোটি টাকা বেশি। বাজেটে কৃষি যন্ত্রপাতি ক্রয়ে শতকরা ৬০ ভাগ ভর্তুকি প্রদানের জন্য তিন হাজার ১৯৮ কোটি টাকার একটি প্রকল্প গ্রহণ করা হয়েছে- এটা বাণিজ্যিক কৃষির জন্য একটি ইতিবাচক দিক। 

বিশেষজ্ঞদের মতে, দু’একটি বিষয় ছাড়া এবারের বাজেট গতবারের মতোই গতানুগতিক। করোনাভাইরাসের প্রভাবে ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের বাঁচানোর জন্য তেমন কোনো দিক-নির্দেশনা নেই বাজেট প্রস্তাবে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে কৃষকদের বাঁচানোর জন্য শস্য বীমার প্রচলনের প্রত্যাশা করেছিলেন অনেকে; কিন্তু প্রস্তাবিত বাজেটে তার প্রতিফলন দেখা যায়নি। আমদানিনির্ভর কৃষিপণ্য গম, ভুট্টা, পেঁয়াজ, আদা, রসুন, তেল বীজ ও ডাল জাতীয় ফসল দেশে উৎপাদনের জন্য কোনো দিক-নির্দেশনা নেই প্রস্তাবিত বাজেটে। কৃষিপণ্যের জাতীয় মূল্য কমিশন, সবজি ও ফল পরিবহনে বিশেষ ধরনের হিমায়িত পণ্য পরিবহন, নগরীয় কৃষি, উন্নত কৃষিচর্চা, নিরাপদ খাদ্য, জৈব সার ও জৈব বালাইনাশকের ওপর ভর্তুকি প্রদান, কৃষি শ্রমিকদের সারাবছর কর্মসৃজন এবং প্রবীণ কৃষকদের পেনশন প্রদানের মতো কথাও উল্লেখ নেই প্রস্তাবিত বাজেটে। কৃষিপণ্য সংরক্ষণের জন্য পণ্যভিত্তিক উৎপাদন এলাকায় ওয়্যার হাউস ও হিমাগার তৈরির সুনির্দিষ্ট প্রস্তাব নেই বাজেটে। সামনের সময়ই বলে দেবে এই বাজেট খাদ্য-পুষ্টি নিরাপত্তা, কর্মসংস্থান, দারিদ্র্য বিমোচন, শিল্পের কাঁচামাল জোগান এবং রফতানি বাণিজ্যে কতটা সহায়ক, কতটা কৃষকবান্ধব হবে। 

অর্থনীতিবিদ অধ্যাপক এম এম আকাশ বলেন, ‘কৃষককে ক্যাশ সাপোর্ট দিতে হবে। তা না হলে বীজ, সার, অন্যান্য জিনিস কৃষক সময়মতো কিনতে পারবেন না। বাজার ব্যবস্থাপনা ঠিক করতে হবে। ভোক্তা ও উৎপাদকের মধ্যে সরাসরি সংযোগ ব্যবস্থা তৈরি করতে হবে। তার মাধ্যমে দু’জনেই সঠিক মূল্য অর্জন করতে পারবে।’

তিনি আরো বলেন, ‘করোনাকালীন সময়ে কৃষিপণ্য বাজারজাতকরণে যে ইনোভেশনগুলো এসেছে, সেগুলোকে সম্প্রসারণ করতে হবে। সেইসঙ্গে প্রণোদনা দিয়ে অনলাইন কৃষি বাজার সম্প্রসারণ করতে হবে। সরকারকে কৃষি মার্কেটিংয়ে সবচেয়ে বেশি মনোযোগ দিতে হবে।’

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh