কারসাজিতেই উত্থান-পতন পুঁজিবাজারে

দীর্ঘমেয়াদে বিনিয়োগকারীদের অর্থের যোগানদাতা দেশের পুঁজিবাজার নিজস্ব শক্তিমত্তা নিয়ে আজো গড়ে উঠতে পারেনি। সবক্ষেত্রে সুশাসন নিশ্চিত করা এবং দুঃশাসন দমন করার মতো প্রাতিষ্ঠানিক শক্তি নিয়ে গড়েই উঠতে পারেনি দেশের এই বাজার। উন্নত থেকে শুরু করে উদীয়মান- সব পুঁজিবাজারেই উত্থান-পতন হয়। এক বছর উত্থান হয় তো পরের বছরই পতন। এক শেয়ারের দাম বাড়ে তো আরেক শেয়ারের দাম কমে।

এটি নির্ভর করে কোম্পানির পরিচালন দক্ষতা ও মুনাফার ওপর। কিন্তু বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এটি কেতাবি নিয়ম। কারসাজিই এই বাজারের শেয়ারের দাম উত্থান-পতনের মূল কারণ। কারসাজির কারণে ভালো কোম্পানির শেয়ারের দাম তলানিতে থাকে আর মন্দ কোম্পানির শেয়ার লাফিয়ে লাফিয়ে বাড়ে। সংশ্লিষ্টদের দাবি, বাজারকে স্বাভাবিক গতিতে চলতে দিতে হবে। আর বিভিন্ন সময়ে যারা কারসাজিতে যুক্ত তাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে হবে। 

বাজার বিশ্লেষণে দেখা যায়, ২০১০ সালে পুঁজিবাজারে ব্যাপক উত্থান ঘটে। আজ পর্যন্ত তার ধারে-কাছেও যেতে পারেনি লেনদেন। ওই জোয়ারের বাজারে আরো পানি ঢালতে ঝাঁপিয়ে পড়ে দেশের ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। ঋণ দেয়ার কার্যক্রম বাদ দিয়ে পরিশ্রম ছাড়াই বিপুল মুনাফার আশায় বেসরকারি ব্যাংকের পরিচালক ও শীর্ষ কর্মকর্তারা পুঁজিবাজারে অর্থ ঢালতে থাকেন। কিছু দিনের জন্য সেই বাজারে লেনদেন অনিয়ন্ত্রিত সীমায় পৌঁছায়। ওই বাজারে শৃঙ্খলা ফেরাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক, পুঁজিবাজার নিয়ন্ত্রক সংস্থা নানা ধরনের উদ্যোগও নেয়। কিন্তু এসব উদ্যোগ কোনো কাজে আসেনি। আবার সর্বোচ্চ লেনদেনের বাজার সর্বনিম্ন অবস্থানে নেমে আসে। এরপর ৯ বছরেও কোনোদিন ওই সময়ের ধারে-কাছেও উত্থান ঘটেনি। এর বড় কারণ- পুঁজিবাজার উত্থান-পতনের জন্য নিজস্ব শক্তিমত্তা আজ পর্যন্ত অর্জন করতে পারেনি। 

তত্ত্বাবধায়ক সরকারে সাবেক উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘পুঁজিবাজারে কিছু সমস্যা রয়েছে। যার ফলে লেনদেন কমছে। সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রীর নির্দেশ অর্থ সরবরাহ বাড়ানোর ফলে লেনদেন বাড়ছে। কিন্তু অর্থ সরবরাহ বৃদ্ধির পাশাপাশি বাজারে আরো কিছু সমস্যা আছে, তাতেও নজর দেয়া লাগবে। কারসাজি বন্ধ করতে হবে। সুশাসন নিশ্চিত করা জরুরি। এ জন্য দোষীদের শাস্তির ব্যবস্থা করতে হবে।’ 

সংশ্লিষ্টরা জানান, পুঁজিবাজার মূলত দুটি ভিত্তির ওপর চালিত হয়। উদ্যোক্তা শ্রেণি, যারা এখান থেকে অর্থ সংগ্রহ করে কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান চালু করেন। আরেক শ্রেণি হচ্ছে বিনিয়োগকারী। উভয়ের চূড়ান্ত লক্ষ্য মুনাফা। বাংলাদেশের পুঁজিবাজারে মৌলিক একটা তারতম্য হচ্ছে এখানে ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বেশি। উন্নত দেশে প্রাতিষ্ঠানিক বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ৮০ শতাংশ এবং ব্যক্তি বা ক্ষুদ্র বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ ২০ শতাংশ। কিন্তু বাংলাদেশে এটি উল্টো। বাজারে নিবন্ধিত কোম্পানি ও বিনিয়োগকারীরা মুনাফার পেছনে ছুটছেন এটি ঠিক। মুনাফাও হচ্ছে। কিন্তু সঠিক স্বাভাবিক মুনাফা এই বাজার থেকে হচ্ছে না।

গুটিকয়েক মানুষই এ মুনাফার নিয়ন্ত্রক। এই গুটিকয়েক মানুষ শেয়ারের দাম বাড়ানোর জন্য নানাভাবে কারসাজি করে। যেখানে সাধারণ মানুষ মুনাফা করতে পারে না, সেখানে মুনাফা করে এসব কারসাজিকারীরা। এসব শেয়ারেই মূলত সাধারণ বিনিয়োগকারীরা টাকা হারান। মুনাফা থাকলেও তা গুটিকয়েকের জন্য। তাই পুঁজি এ বাজারের দিকে ধাবিত হয় না। দীর্ঘদিন ধরে মুনাফার বঞ্চিত মানুষ বাজারের প্রতি আস্থা হারিয়ে ফেলছেন। ফলে বাজারে সংকট দেখা দিচ্ছে। 

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক ডেপুটি গভর্নর ও পুঁজিবাজারে কারসাজি অনুসন্ধানে গঠিত তৎকালীন কমিটির প্রধান খোন্দকার ইব্রাহীম খালেদ বলেন, ‘বাজারের মূল সমস্যা হচ্ছে বিনিয়োগকারীদের আস্থা নেই। শুধু তারল্য সংকটের কারণেই কি আস্থা নেই? মোটেও তা নয়। অর্থ সরবরাহ শেষ হলে বাজার আগের অবস্থানে ফিরে যাবে। এটি স্থায়ী সমাধান নয়। এজন্য বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে হবে বাজার ও নিয়ন্ত্রক সংস্থার ওপর। সব ধরনের অনিয়ম বন্ধে কঠোর হতে হবে।’ 

বাংলাদেশে প্রতিদিনই কোনো না কোনো শেয়ারে কারসাজির প্রক্রিয়া চলতে থাকে। কয়েকজন মিলে শেয়ার কিনতে থাকে। এরপর তাদের কেনা হয়ে গেলে ছড়ানো হয় গুজব। কখনো কখনো কোম্পানিকে সঙ্গে নিয়েও নানাভাবে বিনিয়োগকারীদের প্রলুব্ধ করা হয়। সাধারণ বিনিয়োগকারীরাও এসব গুজবে কান দিয়ে শেয়ার কিনতে শুরু করেন, এরপর শুরু হয় কারসাজিকারীদের শেয়ার বিক্রির পালা। প্রতিনিয়তই চলছে এ প্রক্রিয়া। কিন্তু এ ব্যাপারে বিএসইসির তেমন কোনো পদক্ষেপ নেই, তেমন কারো বিচারও হয় না। 

পুঁজিবাজারের ইতিহাসে তাদের কারণেই ১৯৯৬ ও ২০১০ সালে পরপর দুই বার মহাধস নামে। এরপর কমিটি গঠন করা হয় ২০১০ সালে। ওই কমিটি কারসাজিতে অংশগ্রহণকারীদের খুঁজে বের করে প্রতিবেদন জমা দেয়। কিন্তু অপরাধীদের কোনো শাস্তি হয়নি। বরং সেই অপরাধীদের অনেকেই সরকারের নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখছেন। 

পুঁজিবাজারে নিষ্পত্তির স্বার্থে ২০১৪ সালে গঠিত হয় শেয়ারবাজার ট্রাইব্যুনাল। এ ট্রাইব্যুনাল এখন নিষ্ক্রিয়। কারণ ট্রাইব্যুনালে মামলা নেই বললেই চলে। এখনো দেশের বিভিন্ন আদালতে শেয়ারবাজার সংশ্লিষ্ট বিচারাধীন মামলা ৫১৫টি। এর মধ্যে ২৮৯টিই নিম্ন আদালতে। মামলাগুলোর অধিকাংশ জরিমানা আদায়ে সার্টিফিকেট মামলা। রয়েছে শেয়ার কারসাজি ও পুঁজিবাজার সংক্রান্ত বেআইনি গুরুতর অপরাধের মামলাও। ঢাকার নিম্ন আদালত থেকে এখনই অন্তত ৩০টি মামলা ট্রাইব্যুনালে আনা সম্ভব। তবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা খুব বেশি তৎপর নয় বলে মামলা আসছে না। অর্থাৎ বাজারের কারসাজিতে যুক্ত ব্যক্তিদের শাস্তির আওতায় আনতে কোনোপক্ষই সক্রিয়ভাবে কাজ করছে না। 

কারসাজি চক্রের দৌরাত্ম্য কমাতে সাম্প্রতিক বছরে বিএসইসি শতাধিক কোম্পানি, উদ্যোক্তা-পরিচালক, প্রতিষ্ঠান ও সাধারণ বিনিয়োগকারীদের বিরুদ্ধে কিছু পদক্ষেপ নিয়েছে। কারণ দর্শানোর নোটিশ, সতর্কতা জারি ও সংবাদমাধ্যমে বিবৃতি দিয়েছে। তবে কার্যকর কোনো শাস্তির বিধান করা হয়নি। এমনকি শেয়ার কারসাজির সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছে কোম্পানির উদ্যোক্তা পরিচালকরাও।

সর্বশেষ পুঁজিবাজারের বিদ্যুৎ খাতের কোম্পানি শাহজিবাজার কোম্পানির শেয়ারে কারসাজি করে কৃত্রিমভাবে দর বৃদ্ধির ঘটনার দায়ে দুই ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা করে বিএসইসি। ব্যক্তি দু’জনকে ৮০ ও ৫০ লাখ টাকা এবং প্রতিষ্ঠানটিকে এক কোটি টাকা জরিমানা করা হয়। 

অপরাধীদের শাস্তি না হওয়ায় কারসাজির জয়ই চূড়ান্ত এই বাজারে। যার ফলে বাজারে দশবছরের মধ্যে লভ্যাংশ দিতে পারে না এমন কোম্পানির শেয়ারের দাম ১০০ টাকা। জেড ক্যাটাগরির কোম্পানির শেয়ারের দাম উঠছে ১২০০ টাকার উপরে। মাত্র ৫ থেকে ১০ শতাংশ হারে মুনাফা দেয় এমন কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হয় ৫০০ থেকে ৬০০ টাকায়। ২৫ থেকে ৪০ শতাংশ হারে প্রতি বছর লভ্যাংশ দেয় এমন কোম্পানির শেয়ার বিক্রি হচ্ছে ৬০ থেকে ২০০ টাকার মধ্যে। এখানে কারসাজির আনাগোনা চারদিকে। 

চলতি মাসে পুঁজিবাজারের লেনদেন তলানীতে নেমে আসে। বাজার তারল্য সংকটে পড়ে। সরকার সিদ্ধান্ত দিয়ে ব্যাংকগুলোকে বাজারে বিনিয়োগ বাড়াতে বাধ্য করেছে। ফলে বাজারের অবস্থা ক্রমেই ভালো হচ্ছে। নতুন করে কিছু পদক্ষেপও নেওয়া হচ্ছে। কিন্তু এসব উদ্যোগ নেয়া হলেও বিএসইসি আসল জায়গাতেই হাত দেয়নি। সেটি হলো বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরানোর জন্য কারসাজিকারীদের শাস্তি দেওয়া- যেন কারসাজি উল্লেখযোগ্য মাত্রায় কমে আসে।

পাশাপাশি বহুজাতিক কোম্পানিগুলোকে পুঁজিবাজারে নিয়ে আসার জন্য কার্যকরী উদ্যোগও নেয়া হয়নি। পুঁজিবাজার গতিপ্রকৃতি প্রসঙ্গে সম্প্রতি বলা হচ্ছে- এটি শৃঙ্খলিত বিশৃঙ্খলার বাজার। তাই বাজারের মধ্যে বিশৃঙ্খলা দূর করতে হবে। বিনিয়োগকারীদের আস্থা ফেরাতে কারসাজি বন্ধে কার্যকর সিদ্ধান্ত নেয়ার দাবি সংশ্লিষ্টদের।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh