লোকসানের অজুহাতে বন্ধ হচ্ছে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল

সারাবিশ্ব যখন পরিবেশ বিপর্যয়ের অন্যতম শত্রু প্লাস্টিক এবং কৃত্রিম তন্তু নিষিদ্ধ করে পাট ব্যবহার বাধ্যতামূলক করতে চাইছে, তখন পাটের সবচেয়ে বড় উৎপাদক বাংলাদেশ তার রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকল বন্ধ করে দিতে যাচ্ছে। অজুহাত- এসব লোকসানি কারখানা; তাই বন্ধ করে দিতে হবে। গত ২৮ জুন এক ভার্চুয়াল সংবাদ সম্মেলনে বস্ত্র ও পাটমন্ত্রী গোলাম দস্তগীর গাজী জানান, পরবর্তী সময়ে এসব পাটকল সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) আওতায় চলবে। রাষ্ট্রায়ত্ত ২৫টি পাটকলে এ মুহূর্তে ২৪ হাজার ৮৮৬ জন স্থায়ী শ্রমিক রয়েছেন। তাদের গোল্ডেন হ্যান্ডশেকের মাধ্যমে অবসর দেয়া হবে। উল্লেখ্য, শ্রমিকের পাওনা ১৬১২ কোটি টাকাও সরকার একবারে পরিশোধ করবে না। এটি কিস্তিতে শোধ করা হবে বলে মন্ত্রী জানান।

এবার অজুহাত দেয়া হয়েছে- মৌসুমে প্রয়োজনীয় অর্থ বরাদ্দ না পাওয়ায় খুলনা অঞ্চলের রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলো পর্যাপ্ত কাঁচা পাট ক্রয় ও মজুদ করতে পারেনি। যখন লোকসানের কথা বলে রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করা হচ্ছে, ঠিক সেই সময়ে সোয়া দুইশ’ বেসরকারি পাটকল পূর্ণ উৎপাদনে চলছে। প্রশ্ন হলো- তারা কি কাঁচা পাট ভিনদেশ থকে আমদানি করেছেন? বাংলাদেশ পাটকল করপোরেশনের (বিজেএমসি) খুলনা অঞ্চলের লিয়াজোঁ কর্মকর্তা বনিজ উদ্দিন মিঞা বলছেন, ‘করোনাভাইরাসে বন্ধ থাকার কারণে মিলগুলো যথাযথভাবে পাট কিনতে পারেনি। এ কারণে এখন মিলগুলো চালু হলেও প্রয়োজনীয় উৎপাদন করতে পারছে না। কাঁচা পাট সংকটের কারণে বর্তমানে মিলগুলোতে উৎপাদন এক-তৃতীয়াংশে নেমে এসেছে।’ 

একদিকে বিজেএমসি জানিয়েছে, পাট মৌসুমে মিলগুলো ভালোমানের যে পাট ২১০০ টাকা দরে ক্রয় করত, তা এখন পাওয়া যাচ্ছে না। এখন পাওয়া যাচ্ছে ক্রস পাট। তা মৌসুমে ১৯৫০ টাকা দরে বিক্রি হতো; কিন্তু এখন করোনা পরিস্থিতির কারণে পাট রফতানি বন্ধ। তাই পাটের দর ১৮০০ টাকায় নেমে এসেছে। মিলগুলো এখন এই পাটই ক্রয় করছে, যা দিয়ে উৎপাদন চালিয়ে রাখা যাবে। আবার তারাই বলছে, কাঁচা পাট বেশি দামে কিনতে হওয়ায় উৎপাদনের পর বেসরকারি মিলের রেটের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বিক্রি করা যাচ্ছে না।

অভিযোগ রয়েছে, এই বিজেএমসি ও পাট মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা এবং আমলাদের সিন্ডিকেট খুব পরিকল্পিতভাবে যখন কাঁচা পাটের দাম কম থাকে, তখন পাট কেনে না; কারণ হিসেবে দেখানো হয় সরকারের টাকা আসেনি! কাঁচা পাট পাইকার এবং মজুদদাররা কিনে গুদামজাত করার পর দ্বিগুণ-দেড়গুণ দামে তারা কাঁচা পাট কেনে। সেই অতিরিক্ত দামের কারণে পাটের উৎপাদন খরচ আগেই বেড়ে যাওয়ায় বেসরকারি মিলের সঙ্গে প্রতিযোগিতায় টিকতে পারে না রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল।

গত বছর অক্টোবরে সংবাদমাধ্যমের খবরে বলা হয়, বছরের পর বছর পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা অর্জন করতে ব্যর্থ হচ্ছে খুলনার রাষ্ট্রায়ত্ত ৯টি পাটকল। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে পাটকলগুলোর জন্য সাত লাখ ৪৮ হাজার ৫৯৬ কুইন্টাল পাট ক্রয়ের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়; কিন্তু ক্রয় করা হয় দুই লাখ ২৭ হাজার ১৩৩ কুইন্টাল। এ ছাড়াও ২০১৭-১৮ অর্থবছরে নির্ধারিত লক্ষ্যমাত্রার ৬৩ শতাংশ পাট ক্রয় করা হয়। তখনই পাটকল এজেন্সিগুলোর কাছে ওই নয় পাটকলের দেনা ছিল ১৮৩ কোটি ১৫ লাখ ৫৮ হাজার টাকা। অথচ ব্যালেন্সিং, আধুনিকায়ন, বিস্তার এবং প্রতিস্থাপন করার কথা বলে বছরের পর বছর কোটি কোটি টাকা বরাদ্দ নেয়া হয়। কখনো সেই টাকার বড় অংশ আবার মেশিনারি দেখার নামে বিদেশ ভ্রমণে খরচ হয়!

সরকারি কর্মকর্তারা লোকসানের ‘অজুহাত’ দেখালেও পাট এবং পাটজাত পণ্য রফতানির বিরাট বাজার রয়েছে সারাবিশ্বে। কোনো কোনো বিশেষজ্ঞের মতে, সেই বাজার গার্মেন্টস পণ্যের বাজারের চেয়েও বড় আর ব্যাপক। এখন প্রশ্ন উঠবে তাহলে পাটপণ্য এবং পাটজাত পণ্য রফতানি হয় না কেন? এর সহজ উত্তর হলো- বেসরকারি পাটকলগুলো যেভাবে বাজার সার্চ করে, সেই কাজটি সরকারি পাটকলের কর্মকর্তারা করেন না।

আবার পুরনো আমলের মোটরচালিত মেশিনারি দিয়ে সরকারি পাটকলগুলো যে হারে উৎপাদন করে, বেসরকারি আধুনিক যন্ত্রপাতি সংবলিত পাটকলগুলো তার চেয়ে বেশি উৎপাদন করে। তাই তাদের সঙ্গে এই ক্ষেত্রেও প্রতিযোগিতায় সরকারি পাটকল হেরে যায়। অথবা বলা যায়, ইচ্ছে করে হারতে দেয়া হয়! 

এখন সরকার ঘোষণা দিয়েছে, তারা ২৫টি রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকল বন্ধ করবে। তবে একটু পেছনের ইতিহাস মনে করিয়ে দেন পাটকল শ্রমিক ফেডারেশনের নেতা মো. খলিলুর রহমান। একটি টেলিভিশন চ্যানেলে তিনি বলেন, “আজকের মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যখন বিরোধী দলে ছিলেন, সে সময় বিএনপি-জামায়াত সরকার আদমজী জুট মিল বন্ধ করে দিলে তিনি বলেছিলেন, ‘মাথাব্যথা হলে কি মাথা কেটে ফেলতে হবে?’ সেই বিরোধী দলীয় নেত্রী এখন প্রধানমন্ত্রী।” খলিলুর রহমান সরল মনে এখনো আশা করছেন, হয়তো তার হাত দিয়ে ২৫টি পাটকল বন্ধ হবে না!

এই পাটকল বন্ধের খবর প্রচার হওয়ার পর শ্রমিকদের বেতন-ভাতা পরিশোধ ও চিকিৎসাসহ যাবতীয় নিরাপত্তা নিশ্চিত না করে পাটকল বন্ধ করা থেকে বিরত থাকার আহ্বান জানিয়েছে বাংলাদেশ শ্রমিক কর্মচারী ফেডারেশন। সংগঠনটির সভাপতি জহিরুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক উজ্জ্বল রায় যৌথ বিবৃতিতে বলেন, ‘সম্প্রতি সরকারের পক্ষ থেকে পাটকল বন্ধের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। অথচ করোনাভাইরাস মহামারির এ সময়ে শ্রমিকদের খাদ্য, চিকিৎসাসহ যাবতীয় কোনো নিশ্চয়তা না দিয়েই এ সিদ্ধান্ত শ্রমিকদের জীবনকে মৃত্যুর মুখে ঠেলে দেবে। গত চার বছরে পাটকল শ্রমিকদের বর্ধিত মজুরি বকেয়া পড়েছে প্রায় ১৬১২ কোটি টাকা। দেশের পাট শিল্প, পাটশ্রমিক ও চাষিদের রক্ষায় সরকারের টাকা নেই, অথচ অস্ত্র কিনতে সরকারের টাকার অভাব হয় না। বাংলাদেশ চীন থেকে দুটি সাবমেরিন কিনেছে ১৬৫০ কোটি টাকায়। এখন কক্সবাজারে সাবমেরিন ঘাঁটি তৈরি করা হবে ১০২ কোটি টাকায়। সরকার ভারত থেকে ৪ হাজার কোটি টাকার ও রাশিয়া থেকে ৮ হাজার কোটি টাকার অস্ত্র কিনবে।’ 

দুই পক্ষের অজুহাতই ‘শ্রমিক’

সরকার বলছে, শ্রমিকের স্বার্থে লোকসান দিয়ে পাটকল চালাতে হচ্ছে। অন্যদিকে, বিজেএমসি লোকসানের জন্য শ্রমিকদের বেশি মজুরি ও সংখ্যা বেশি হওয়াকে দায়ী করে আসছে। বিজেএমসির মতে, স্থায়ী শ্রমিকদের উচ্চ মজুরি পাটকলগুলোর লোকসানের প্রধান কারণ। প্রয়োজনের চেয়ে শ্রমিক বেশি। এ জন্য উৎপাদন খরচ বাড়ে। রাষ্ট্রায়ত্ত পাটকলগুলোতে গত জুনে ৩৩ হাজার ১৯১ স্থায়ী শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তা ছিল। এ ছাড়া তালিকাভুক্ত বদলি শ্রমিক ও দৈনিকভিত্তিক শ্রমিক আরও ৩০ হাজার ৯৫২ জন। গত অর্থবছর সংস্থাটির আয় ছিল এক হাজার ১৪৮ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৫৬ শতাংশ বা ৬৫১ কোটি টাকা শ্রমিক, কর্মচারী ও কর্মকর্তার মজুরি ও বেতন বাবদ ব্যয় হয়েছে।

তবে শ্রমিক নেতারা বলেন, মজুরি বেশি হওয়া কখনোই লোকসানের কারণ নয়। বিজেএমসির ব্যবস্থাপনা ঠিক থাকলে পাটকল লোকসানে পড়ত না। জনবল বরং প্রয়োজনের তুলনায় কম আছে। অবসরে যাওয়া স্থায়ী শ্রমিকের শূন্যপদে নিয়োগ হচ্ছে না। 

এদিকে দেশের বেসরকারি পাট খাতে ভালো সময় চলছে। চলতি অর্থবছরের প্রথম ছয় মাসে পাট ও পাটপণ্য রফতানিতে আয় বেড়েছে ২১ শতাংশ। এর মধ্যে পাটকলগুলোর উৎপাদিত মূল পণ্য পাটসুতা ৩৩ শতাংশ এবং চট ও বস্তা রফতানি ছয় শতাংশ বেড়েছে। রফতানির ৮০ শতাংশই বেসরকারি পাটকলের দখলে। এটা বিজেএমসিও স্বীকার করে, বেসরকারি পাটকলগুলোর ব্যবস্থাপনা ভালো, উৎপাদনশীলতা বেশি ও উৎপাদন খরচ কম। পাটকলের ব্যবসানির্ভর করে কাঁচা পাট কেনার ওপর। কোনো পাটকল ১০০ টাকার পাট যদি ১৫০ টাকায় কেনে, তাহলে লাভ করবে কীভাবে? তবে ২৫টি পাটকল বন্ধ বা বিক্রি করে দেয়ার সিদ্ধান্তও হুট করে হয়নি। ব্যবস্থাপনার সংকট খুব স্পষ্ট। ২০০৯ সালে ক্ষমতায় আসার পরই বেসরকারীকরণ প্রক্রিয়া থেকে সরে আসে আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। এরপরই বেসরকারি হাতে ছেড়ে দেয়া বিভিন্ন পাটকল সরকার নিজের হাতে নিয়ে এসে নতুন করে চালাতে চেষ্টা করে; কিন্তু সরকার তাতে সফল হয়নি মূলত অব্যবস্থাপনার কারণে।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh