ডুবন্ত ব্যাংকে ভাসতে চায় পুঁজিবাজার

প্রতীকী ছবি।

প্রতীকী ছবি।

শিল্পায়ন ও ব্যবসা-বাণিজ্যের জন্য অর্থ সংগ্রহের দুটি উৎস ব্যাংক ও পুঁজিবাজার। কিন্তু দুটি উৎসের অবস্থাই এখন নাজুক। টাকার অভাবে ব্যাংকগুলো ঋণ দিতে পারছে না। অন্যদিকে, প্রতিদিনই দরপতন হচ্ছে পুঁজিবাজারে। এর মধ্যে বাজার চাঙ্গা করতে সংকটে থাকা ব্যাংক খাতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়েছে দেশের পুঁজিবাজার। কয়েক দিন আগে বাজারে বিনিয়োগ করার জন্য ব্যাংকগুলোকে ঋণ দেওয়ার সিদ্ধান্ত জারি করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। এখন বাজার চাঙ্গা করতে আরও হাজার কোটি টাকা ঋণ চেয়েছে রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন একমাত্র বিনিয়োগ প্রতিষ্ঠান ইনভেস্টমেন্ট করপোরেশন অব বাংলাদেশ (আইসিবি)। দ্রুত এই অর্থ চেয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে ইতিমধ্যে চিঠি পাঠিয়েছে প্রতিষ্ঠানটি। তবে সংশ্লিষ্টরা বলছেন, বাজার চাঙ্গা করতে হলে বাজারে মানসম্মত বিনিয়োগ ও বিনিয়োগকারী নিশ্চিত করতে হবে। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, স্বীকৃত অর্থনৈতিক নিয়ম ও বৈশ্বিক পরিপালনীয় নিয়মানুসারে, উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ীদের দীর্ঘমেয়াদে অর্থের জোগানদাতা পুঁজিবাজার এবং স্বল্পমেয়াদে অর্থের জোগানদাতা ব্যাংক। কিন্তু বাংলাদেশে এটি ব্যতিক্রম। এখানে পুঁজিবাজার থেকে অর্থ নিয়ে নতুন কোম্পানি প্রতিষ্ঠার সুযোগ নেই। শুধু প্রতিষ্ঠিত কোম্পানি পুঁজিবাজারে অন্তর্ভুক্ত হতে পারে। এই ব্যতিক্রমী নিয়মের ফলে নতুন নতুন শিল্প গড়ে তোলার ক্ষেত্রে অর্থায়নে অক্ষম দেশের পুঁজিবাজার। তাই নতুন শিল্প করতে গেলে দীর্ঘমেয়াদে যে অর্থের প্রয়োজন হয়, তার জন্য একমাত্র ব্যাংকই ভরসা উদ্যোক্তাদের। এরপরও যেসব কোম্পানি পুঁজিবাজার থেকে অর্থ সংগ্রহ করার যোগ্যতা রাখে তারাও পারছে না। কারণ তীব্র অর্থ সংকটের কারণে ধুঁকছে পুঁজিবাজার। অন্যদিকে, দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দিয়ে তারল্য সংকটে পড়েছে ব্যাংক খাত। 

ব্যাংকে তারল্য সংকট সৃষ্টি হওয়ার অন্যতম কারণ- ব্যাংকগুলো স্বল্পমেয়াদে আমানত সংগ্রহ করে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ দেয়। ৬ মাস থেকে সাধারণত ৫ বছর মেয়াদের আমানত পায় ব্যাংকগুলো। কিন্তু ব্যাংকগুলো শিল্পখাতে ৬ বছর থেকে ২০ বছর মেয়াদ পর্যন্ত ঋণ দিচ্ছে। একদিকে বিভিন্ন কারণে আমানত সংগ্রহ কমে গেছে। অন্যদিকে দীর্ঘমেয়াদে ঋণ বিতরণ করা হয়েছে। এর বাইরে খেলাপি ঋণ তো আছেই। ফলে সংকট ঘণীভূত হয়েছে ব্যাংক খাতে। এখন আবার পুঁজিবাজার অর্থ জোগানের পরিবর্তে ব্যাংকের কাছ থেকে সরবারহ করছে। ফলে উভয়খাতে সংকট আরও ঘণীভূত হচ্ছে। 

সাবেক তত্ত্বাবধায়ক সরকারের উপদেষ্টা ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘ব্যাংক খাতে এমনিতেই তারল্য সংকট চলছে। এখন ব্যাংকের টাকা বাজারে নেওয়ার চেষ্টা হলে সংকট আরও বাড়বে। এতে আমানতকারীদের স্বার্থও বিঘ্নিত হবে।’ তিনি আরও বলেন, ‘কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে আইসিবি টাকা নিয়ে তারা হয়তো শেয়ার কিনবে। এতে বাজার ভালো হতে পারে। ভালো হলে সেই অর্থ ফেরত দিলে কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু তার আগে বাজারকে ভালো করার সব উদ্যোগ নিতে হবে।’ 

গত ২০১০ সাল থেকে পুঁজিবাজারে সংকট চলছে। বিভিন্নভাবে অর্থ বিনিয়োগ করেও বাজার ভালো করতে পারেনি সরকার। বাজার ভালো করতে দফায় দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক ও বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কাছ থেকে টাকা নিয়েছে আইসিবি। সর্বশেষ কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে পাঠানো চিঠিতে আইসিবি বলেছে, পুঁজিবাজারের চাঙ্গা করতে বিনিয়োগ অনেক বাড়ানো প্রয়োজন। এজন্য বিনিয়োগযোগ্য অর্থের প্রয়োজন। শেয়ারবাজারের এই নাজুক পরিস্থিতিতে শেয়ার বিক্রি করে এই অর্থ সংগ্রহ করা সম্ভব নয়। তাই বাজারের স্বার্থে অতিদ্রুত আরও অন্তত ১ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন। 

আইসিবির ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) আবুল হোসেন বলেন, ‘বাজার চাঙ্গা করতে আমরা অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছি। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে হাজার কোটি টাকা পাওয়া গেলে তা বাজারে বিনিয়োগ করা হবে। আমরা চেষ্টা করছি বিনিয়োগ বাড়িয়ে বাজার ভালো করার।’ 

এদিকে, গত ২২ সেপ্টেম্বর পুঁজিবাজারে তারল্য সংকট কাটাতে রেপোর মাধ্যমে অর্থ সরবরাহ করার নির্দেশনা জারি করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। অর্থ সংকটে পড়লে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে রেপোর মাধ্যমে ২৮ দিন মেয়াদে অর্থ নিতে পারে। কিন্তু পুঁজিবাজারে বিনিয়োগের জন্য ৬ মাস মেয়াদের অর্থ দেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই নির্দেশনার আলোকে ব্যাংক থেকে আরও বিপুল পরিমাণ অর্থ বাজারে বিনিয়োগের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে।

রাষ্ট্রীয় মালিকানাধীন বিভিন্ন ব্যাংক সূত্রে জানা গেছে, অধিকাংশ ব্যাংকের আইসিবিতে বিনিয়োগ রয়েছে। বেশিরভাগ অর্থ নির্দিষ্ট মেয়াদে আমানত রাখা আছে। কিন্তু ওইসব আমানতের মেয়াদ শেষ হয়ে গেছে। কিন্তু আইসিবি কোনো অর্থ ফেরত দিচ্ছে না। উল্টো নতুন করে ঋণ চেয়ে আবেদন পাঠিয়েছে আইসিবি। 

উল্লেখ্য, প্রায় বছর দেড়েক ধরে অর্থ সংকটে ভুগছে দেশের ব্যাংক খাত। বিনিয়োগ করার মতো অর্থ তাদের হাতে নেই, এমনকি প্রয়োজন মেটাতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক বা অন্য ব্যাংকের কাছ থেকে অর্থ ধার নিতে বাধ্য হচ্ছে বেশ কিছু ব্যাংক। অর্থ সংকটের কারণে ঋণ বিতরণ বৃদ্ধির হার গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। এখন বিকল্প উপায়ে ঋণ বিতরণ বাড়াতে ঋণ-আমানত অনুপাত (এডিআর) সীমা শিথিল করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ২০১০ সালের পর থেকে অন্তত ৪ দফায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক পুঁজিবাজারে টাকা দিয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের দেওয়া প্রায় ২ হাজার কোটি টাকা বাজারে রয়েছে। এ ছাড়া প্রায় সব ব্যাংকের মূলধনের ২৫ শতাংশ পুঁজিবাজার সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানকে ঋণ দিয়ে রেখেছে। কোনো কোনো ব্যাংক আরও বেশি ঋণ দিয়েছে। প্রতিনিয়ত ব্যাংকের টাকা পুঁজিবাজারে নিয়ে যেতে আইন সংশোধন করা হচ্ছে। কিন্তু এতেও ভালো হচ্ছে না বাজার। বিনিয়োগকারীদের আস্থাহীনতায় বাজার তলাবিহীন ঝুড়িতে পরিণত হয়েছে। 

আইসিবি সূত্র জানায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে আগে অনেক অর্থ নেওয়া হয়েছে। বাজারকে স্থিতিশীল করতে সেই অর্থ বিনিয়োগও করা হয়েছে। কিন্তু বাজার পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে না। পরিস্থিতি সামাল দিতে আইসিবি প্রতিনিয়ত বিপুল পরিমাণ অর্থ বিনিয়োগ করছে। বিভিন্ন উৎস থেকে অর্থ সংগ্রহ করে তা বাজারে ছাড়া হচ্ছে। বাজারকে চাঙ্গা করতে সরকারের নির্দেশনা রয়েছে। সেই নির্দেশনা কার্যকর করতে আবারও অর্থ সংগ্রহের চেষ্টা করছে আইসিবি। 

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, পুুঁজিবাজারের সংকট শুরু হয় ২০১০ সাল থেকে। বিনিয়োগকারীদের স্বার্থ রক্ষায় ২০১২ সালের ৫ মার্চ প্রণোদনা স্কিমের আওতায় ৯০০ কোটি টাকার ফান্ড গঠন করা হয়, যা ৩ কিস্তিতে ৩০০ কোটি টাকা করে আইসিবির মাধ্যমে ২০১৮ সালের ৪ অক্টোবরের মধ্যে বিতরণ করা হয়। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছ থেকে ওই অর্থ নিয়ে ৮৫৬ কোটি টাকা সরাসরি বাজারে বিনিয়োগ করে আইসিবি। বাংলাদেশ ব্যাংক, বাংলাদেশ সিকিউরিটিজ অ্যান্ড এক্সচেঞ্জ কমিশন (বিএসইসি) ও আইসিবির সমন্বয়ে গঠিত তদারকি কমিটির তত্ত্বাবধানে এই ফান্ড বিতরণ করা হয়। যার মেয়াদ ছিল ২০১৬ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত। পরবর্তীতে কয়েক দফা মেয়াদ বাড়িয়ে ২০১৯ সালের ৩১ ডিসেম্বর পর্যন্ত করা হয়। ওই তহবিল থেকে বিরতণকৃত অর্থ থেকে ৮৫৬ কোটি টাকা ফেরত পায় কেন্দ্রীয় ব্যাংক। ওই টাকা আবার ২০২২ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত বাজারে বিনিয়োগ করার জন্য আইসিবিকে দিয়েছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

দেশের পুঁজিবাজারের মন্দা কাটাতে সম্প্রতি বিশিষ্ট অর্থনীতিবিদদের সঙ্গে বৈঠকে বসে অর্থ মন্ত্রণালয়। ওই বৈঠকে বাজারে দুর্দশার চারটি কারণ চিহ্নিত করা হয়। এগুলো হলো- বাজারে ভালো গণপ্রস্তাব (আইপিও) না আসা, নিরীক্ষা প্রতিবেদন নির্ভরযোগ্য না হওয়া, নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর সমন্বয়হীনতা এবং ব্যাংকিং খাতের নাজুক অবস্থা। ড. এ বি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, ‘বর্তমানে ব্যাংকিং খাতে যে নাজুক অবস্থা বিরাজ করছে, তা থেকে উত্তরণ না হলে পুঁজিবাজারে প্রত্যাশিত গতি আসবে না।’

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh