ফনেটিক ইউনিজয়
জহির রায়হান
বাংলা চলচ্চিত্রের হারিয়ে যাওয়া তারকা
আবু রায়হান

বাংলা চলচ্চিত্র জগতের এক কিংবদন্তীর নাম জহির রায়হান। গত ১৯ আগস্ট ছিলো তার জন্মদিন। তিনি শুধু একজন চলচ্চিত্র নির্মাতাই নন, একাধারে ছিলেন ঔপন্যাসিক, গল্পকার, সাংবাদিক এবং তাঁর চেয়েও বড় পরিচয় তিনি ছিলেন ১৯৫২ সালের মহান ভাষা আন্দোলনের একজন সৈনিক। বহুমুখী প্রতিভার এই মানুষটি বিশ্বাস করতেন সমাজ, জীবন, সভ্যতা, ইতিহাস, সময় প্রতিটি স্তরকেই স্পর্শ করে চলচ্চিত্র। চলচ্চিত্র এমন একটি মাধ্যম যা শুধু পর্দায় মানুষের মনের কথাই তুলে ধরে না, তুলে ধরে মানুষের দুঃখ-কষ্ট, আনন্দ-বেদনার প্রতিটি মুহূর্তসহ, দেশ-জাতি-বিশ্ব সর্বোপরি সময়কে। আর সেজন্যই শিল্প-সংস্কৃতির নানা ক্ষেত্রে তাঁর বিচরণ থাকলেও একসময় তিনি বেছে নিয়েছিলেন চলচ্চিত্রকে। চলচ্চিত্রকে তিনি তাঁর হাতিয়ার হিসেবে নিয়েছিলেন, বিপ্লব আর প্রতিবাদের ভাষা হিসেবে ব্যবহার করেছেন ক্রমাগত। তিনি একের পর এক নির্মাণ করে গেছেন অসামান্য সব শৈল্পিক চলচ্চিত্র। তাঁর কাজ, তাঁর একাগ্রতা, সৃষ্টি সবকিছু বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে গভীর প্রভাব রেখে গেছে। তাই আজও এই গুণী নির্মাতাকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্র জগতে গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করা হয়। আজও তিনি হয়ে উঠেন দেশ-বিদেশের বহু নির্মাতার আদর্শ।
জহির রায়হানের জন্ম ১৯৩৫ সালের ১৯ আগস্ট ফেনী জেলার অন্তর্গত মজুপুর গ্রামে। তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ জহিরুল্লাহ। ১৯৪৭ সালে দেশ বিভাগের পর তিনি তাঁর পরিবারের সঙ্গে কলকাতা হতে বাংলাদেশে (তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তান) স্থানান্তরিত হন। তাঁর প্রাথমিক লেখাপড়া শুরু হয় কলকাতার মিত্র ইন্সটিটিউট ও আলিয়া মাদ্রাসায়। ছেলেবেলা থেকেই লেখালেখিতে হাতেখড়ি। ১৯৪৯ সালে কলকাতার নতুন সাহিত্য পত্রিকায় তাঁর লেখা ‘ওদের জানিয়ে দাও’ শিরোনামের কবিতা প্রকাশিত হয়। ১৯৫০ ফেনীর আমিরাবাদ হাইস্কুল থেকে তিনি মেট্রিক পরীক্ষা দেন। ১৯৫৩ সালে তিনি আইএসসি পাস করেন। ঢাকা মেডিক্যাল কলেজে কিছুদিন চিকিৎসাশাস্ত্রে লেখাপড়া করেন। কিন্তু সেখানে কোর্স শেষ না করে তিনি পরবর্তীতে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বাংলায় স্নাতক ডিগ্রি লাভ করেন। ১৯৫২ সালে তিনি ছিলেন একজন সক্রিয় ভাষা আন্দোলনকারী। ১৯৫২ সালের ২১ শে ফেব্রুয়ারীতে ভাষা আন্দোলনের সময় ১৪৪ ধারা ভেঙে ছিলেন প্রথম যে দশজন, জহির রায়হান ছিলেন তাঁদের মধ্যে একজন। তাঁর সাংবাদিক জীবন শুরু হয় ছাত্র অবস্থায় ১৯৫০ সালে, ‘যুগের আলো’ পত্রিকায় কাজ করার মাধ্যমে। তিনি পরবর্তীতে ‘খাপছাড়া’, ‘যান্ত্রিক’, ‘সিনেমা’ ইত্যাদি পত্রিকায় কাজ করেন। ১৯৫৬ সালে তিনি ‘প্রবাহ’ নামে একটা বাংলা মাসিক পত্রিকায় সম্পাদক হিসেবে যোগ দেন। সাপ্তাহিক ইংরেজি পত্রিকা ‘এক্সপ্রেস’-এও তিনি সম্পাদনার কাজ করেন। বাংলা সাহিত্যজগতে তিনি রেখে গেছেন অসামান্য অবদান। অসাধারণ সব গল্প আর উপন্যাস তিনি রচনা করে গেছেন। পঞ্চাশের দশকে ছাত্র অবস্থায় তাঁর প্রথম গল্পগ্রন্থ ‘সূর্যগ্রহণ’ প্রকাশিত হয়। তাঁর প্রকাশিত উপন্যাসগুলোর মধ্যে উল্লেখযোগ্যÑ হাজার বছর ধরে, শেষ বিকেলের মেয়ে, বরফ গলা নদী,আর কত দিন এবং আরেক ফালগুন।
চলচ্চিত্র জগতে জহির রায়হানের আবির্ভাব ঘটে ১৯৫৭ সালে পাকিস্তানি চলচ্চিত্র পরিচালক জারদারির ‘জাগো হুয়া সাবেরা’ ছবিতে সহকারী হিসেবে কাজ করার মাধ্যমে। তিনি সালাউদ্দীনের ছবি ‘যে নদী মরুপথে’-তেও সহকারী হিসেবে কাজ করেন। প্রখ্যাত চলচ্চিত্র পরিচালক এহতেশাম তাকে ‘এ দেশ তোমার আমার’ ছবিতে কাজ করার আমন্ত্রণ জানান। জহির রায়হান এ ছবির নামসঙ্গীত রচনা করেছিলেন। ১৯৬০ সালে ‘কখনও আসেনি’ চলচ্চিত্রের মাধ্যমে তিনি পরিচালক হিসেবে আতœপ্রকাশ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি তিনি উর্দু ভাষায় পাকিস্তানের প্রথম রঙিন ছবি ‘সঙ্গম’ নির্মাণ করেন। ১৯৬৫ সালে তাঁর প্রথম সিনেমাস্কোপ চলচ্চিত্র ‘বাহানা’ মুক্তি পায়। ১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলন নির্মাতা জহির রায়হানের মনে দারুণ প্রভাব ফেলেছিল, আর তাই তিনি নির্মাণ করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত চলচ্চিত্র ‘জীবন থেকে নেওয়া’ (১৯৭০)। ছবিটিতে তিনি প্রতীকিরূপে বাংলার মানুষের স্বাধীনতার কথা বলেছেন। দেশের তৎকালীন পরিস্থিতি বিবেচনায় যা ছিল অত্যন্ত সাহসী পদক্ষেপ। মুক্তযুদ্ধ চলাকালীন কলকাতায় জীবন থেকে নেওয়া’র বেশ কয়েকটি প্রদর্শনী হয় এবং চলচ্চিত্রটি দেখে সত্যজিৎ রায়, ঋত্বিক ঘটক, মৃণাল সেন, তপন সিনহার মত ডাকসাইটে নির্মাতারা ভূয়সী প্রশংসা করেন। তাঁর উল্লেখযোগ্য চলচ্চিত্রগুলো- সোনার কাজল (১৯৬২) (কলিম শরাফীর সঙ্গে যৌথভাবে), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), আনোয়ারা (১৯৬৭), বেহুলা (১৯৬৬), এ স্টেট ইজ বর্ন (প্রামাণ্যচিত্র) (১৯৭১)। ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে তিনি কলকাতায় চলে যান,আর যুদ্ধের ভয়াবহতা নিয়ে নির্মাণ করেন ‘স্টপ জেনোসাইড’। তাঁর শেষ চলচ্চিত্র ছিল ‘লেট দেয়ার বি লাইট, যার নির্মাণ কাজ তিনি শেষ করে যেতে পারেননি।
সৃষ্টির লক্ষ্যে যে মানুষটির জন্ম হয়েছিল, সে মানুষটিই দেশ স্বাধীন হওয়ার পর স্বাধীন দেশে শহীদ হন। নিখোঁজ বড় ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারের খোঁজ নিতে গিয়ে নিজেই চিরতরে নিখোঁজ হয়ে যান। ১৯৭২ সালের ৩০ জানুয়ারি সকালে তৎকালীন বাংলাদেশ সেনাবাহিনীর দ্বিতীয় বেঙ্গল রেজিমেন্টের সঙ্গে তিনি উদ্ধার অভিযানে অংশ নেন কিন্তু অবাঙালি বিহারিদের প্রতিরোধের মুখে পড়ে বাংলাদেশ সেনাবাহিনী ও পুলিশের সমন্বয়ে গঠিত যৌথ বাহিনী। ওই প্রতিরোধযুদ্ধে প্রায় ১০০ বাঙালি সেনা শহীদ হন, আর আমরা হারাই আমাদের চলচ্চিত্রের সবচেয়ে মেধাবী মানুষটিকে, যাকে কেন্দ্র করে স্বাধীন বাংলাদেশের চলচ্চিত্র অনেক দূর এগিয়ে যাবে বলে স্বপ্ন দেখছিল সবাই।
জহির রায়হান সাহিত্য ও চলচ্চিত্রের জন্য প্রচুর পুরষ্কার ও সম্মাননা লাভ করেন। ১৯৬৪ সালে তিনি ‘হাজার বছর ধরে’ উপন্যাসের জন্য আদমজী পুরস্কার পান। এছাড়া ১৯৭১ সালে সাহিত্যে বাংলা একাডেমী পুরস্কার (মরণোত্তর) এবং ১৯৯২ সালে স্বাধীনতা পুরষ্কার (মরণোত্তর)। জহির রায়হান ‘কাঁচের দেয়াল’ চলচ্চিত্রের জন্য শ্রেষ্ঠ বাংলা ছবি হিসেবে নিগার পুরস্কার পান। চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য ১৯৭৭ সালে তাঁকে মরণোত্তর একুশে পদক প্রদান করা হয়।
বাংলা চলচ্চিত্রে এমন এক ক্ষুরধার স্পর্শ তিনি রেখে গেছেন, যার পরতে পরতে এখনও মানুষ জহির রায়হানের কথা স্মরণ করে। অকালে হারিয়ে যাওয়ার বেদনা আমাদের পোড়ালেও বাংলা চলচ্চিত্রে আকাশে তিনি সব সময়ই নক্ষত্রের মত জ্বলজ্বল করবেন। তিনি বেঁচে থাকবেন তাঁর সকল সৃষ্টিকর্মে, বাংলাদেশি চলচ্চিত্রপ্রেমীদের হৃদয়ে।

Disconnect