চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের নিরাপদ রুট সুনামগঞ্জ সীমান্ত

সুনামগঞ্জ জেলা সীমান্তবর্তী হওয়ায় পার্শ্ববর্তী দেশ ভারত থেকে প্রতিনিয়তই আসছে মাদকের ছোট-বড় চালান। সেই সঙ্গে মাদক পরিবহনেও এসেছে নতুন নতুন প্রদ্ধতি। 

চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ীরা মাদকের নিরাপদ রুট হিসেবে ব্যবহার করছে জেলার সীমান্তবর্তী উপজেলার তাহিরপুর, ধর্মপাশা, ছাতক, বিশ্বম্ভরপুর। 

স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা যায়, জেলার সীমান্ত এলাকায় বিজিবির কড়া নিরাপত্তা থাকলেও বেশিরভাগ সময় তাহিরপুর উপজেলার ট্যাকেরঘাট, চারাগাঁও, লাউড়েরগড় সীমান্ত ও বিশ্বম্ভরপুর উপজেলার মাছিমপুর, চিনাকান্দি সীমান্ত ও সিলেটের কোম্পানীগঞ্জ সীমান্ত দিয়ে সুনামগঞ্জের ছাতক, দোয়রাবাজার উপজেলা দিয়ে আসছে বিভিন্ন মাদক। 

প্রাইভেটকার, ঢোল, বালিশ, প্লাস্টিকের পানির বোতল মাধ্যমে আসছে মাদক। এছাড়াও তাহিরপুর উপজেলার তিনটি শুল্ক বন্দর এলসির মাধ্যমে ভারত থেকে আমদানিকৃত কয়লার মধ্য দিয়ে গোপনে ও রাতের আধারে সীমান্তে একাধিক চোরাই পথ দিয়ে সীমান্তের ওপার থেকে স্থানীয় চিহ্নিত চোরাকারবারীরা ভারত থেকে নিয়ে আসছে কয়লা, চুনাপাথর, গরুসহ বিভিন্ন মাদকদ্রব। তার মধ্যে ভারতীয় মদ, ইয়াবা ট্যাবলেট ও গাঁজাই বেশি। 

সীমান্ত দিয়ে ইয়াবা আসে পানির বোতলের করে আর গাঁজা আর মদ আসে কয়লা ও মাটির ঝুড়িঁর ভেতরে করে। সাদা পলিথিন কাগজ দিয়ে ইয়াবা ট্যাবলেট ভালোভাবে মুড়িয়ে পানির বোতলে ঢুকিয়ে ভারত থেকে মাদক ব্যবসায়ীরা বাংলাদেশ সীমান্তে ছুড়ে মারলে এই দেশের চিহ্নিত চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ীরা তা সংগ্রহ করে। তাছাড়া ইয়াবা ও গাঁজা অপেক্ষাকৃত ছোট হওয়ায় বহনে তেমন কোনো ঝামেলা ছাড়াই সহজে ছড়িয়ে যাচ্ছে পুরো জেলায়। এসব উপজেলার চিহ্নিত চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ীরা মাদক আনা-নেয়া ও সেগুলো কৌশলে সারা জেলায় ছড়িয়ে দিচ্ছে। 

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর দেয়া তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের শুরু থেকে ৩১ আগস্ট পর্যন্ত সুনামগঞ্জে মাদকদ্রব্য আইনে চার শতাধিক মামলা হয়েছে। জেলায় মাদকের সংখ্যা হঠাৎ বেড়ে যাওয়ায় সীমান্ত এলাকায় কড়া পাহারা ও মাদকের বিরুদ্ধে জনসচেতনামূলক সভা করছে বিজিবি। পাশাপাশি পুলিশও মাদকের বিরুদ্ধে বিভিন্ন এলাকায় গড়ে তুলেছে বিট পুলিশিং। গোয়েন্দা সংস্থার সদস্যরাও তৎপর থাকার ফলে প্রতিদিনেই জেলায় কোনো না কোনো স্থান থেকে আটক করা হচ্ছে বিভিন্ন মাদকদ্রব্য। কিন্তু ধরাছোয়ার বাইরে থেকে যাচ্ছে চোরাকারবারী ও তাদের মদদদাতা ও সহযোগীরা। 

জেলা পুলিশ সুপার (ভারপ্রাপ্ত) মোহাম্মদ মিজানুর রহমান বলেন, আইন সবার জন্য সমান। সুনামগঞ্জ জেলাকে মাদকমুক্ত জেলা হিসেবে গড়ার লক্ষ্যে আমরা কাজ করে যাচ্ছি। কোনো আপোষ করা হবে না। মাদকের বিরুদ্ধে পুলিশের প্রতিটি সদস্যকে কড়া নির্দেশ দেয়া হয়েছে। 

জেলা মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ কার্যালয়ের তথ্য অনুযায়ী, জানুয়ারিতে বিদেশি মদ আটক হয়েছে ১৫১বোতল, গাঁজা দুই হাজার ৪০০ কেজি, ইয়াবা ১৫৮ পিস; ফেব্রুয়ারিতে গাঁজা দুই কেজি, ইয়াবা ৪৮৭ পিস; এপ্রিলে সাড়ে তিন হাজার কেজি গাঁজা, ১১১ বোতল বিদেশি মদ ও ১০৫ পিস ইয়াবা; মে মাসে ২৯৬ বোতল বিদেশি মদ, ৫৫০পিস ইয়াবা; জুন মাসে ৫০০ গ্রাম গাঁজা, ৪৮ বোতল বিদেশি মদ, ইয়াবা ২১০পিস; জুলাইয়ে দুই হাজার ৮৮০ কেজি গাঁজা ও ২১৯পিস ইয়বা উদ্ধার করা হয়।

অন্য দিকে, ২৮ বর্ডার গার্ড ব্যাটালিয়নের তথ্য অনুযায়ী, সুনামগঞ্জে বিভিন্ন সীমান্ত এলাকায় সাড়ে ৯ মাস অভিযান চালিয়ে ভারতীয় মদ, গাজা, বিয়ার, কয়লা, ইয়াবা ও নাসির বিড়িসহ পাঁচ কোটি ৪১ লাখ ৭৪ হাজার ৬৮৪ টাকা মূল্যের বিভিন্ন অবৈধ মালামাল জব্দ করেছে বিজিবি। চলিত বছরের শুরু থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৯৭টি অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ভারতীয় মালামাল জব্দ করে বিজিবি।

সুনামগঞ্জ-২৮ বিজিবি জানায়, চলিত বছরের ১ জানুয়ারি থেকে ১৩ অক্টোবর পর্যন্ত ৫৯৭টি অভিযান চালিয়ে এসব অবৈধ ভারতীয় মালামাল জব্দ করে এবং ৫৯৭টি মামলা দায়ের করা হয়। এর মধ্যে মাদকদ্রব্য মামলা ১৯৭টি, ৫২টি বনভিটা মামলা, শুল্ক মামলা ৩৪৮টি। এসব মামলায় ৩২ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে ও ৪৩ জন পলাতক রয়েছে।

সুনামগঞ্জ ২৮ বিজিবির অধিনায়ক লে. কর্ণেল মোহাম্মদ মাকসুদুল আলম জানান, সুনামগঞ্জের সীমান্ত এলাকায় চোরাকারবারী ও মাদক ব্যবসায়ীদের রুখতে বিজিবি দিনরাত কাজ করে যাচ্ছে। সীমান্তে মাদকের বিরুদ্ধে জিরো টলারেন্স নীতি অনুসরণ করে, মাদক প্রতিরোধে সীমান্তে কঠোর নজরদারী অব্যাহত রেখেছে বিজিবি প্রতিটি সদস্যরা। 

তিনি আরো জানান, সীমান্ত দিয়ে কোনো ধরনের মাদক আসতে না পারে সেজন্য বিজিবির সদস্যদের কড়া নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh