খেলাপিরা বরেণ্য, সঞ্চয়ীরা অচ্ছুত

ব্যাংকখাতের ক্যান্সার খেলাপি ঋণ। এই অপ্রতিরোধ্য ক্যান্সার পুরো অর্থনীতিকে আক্রমণ করছে। খেলাপি ঋণের কারণে ধুঁকছে সরকারিখাতের ব্যাংকগুলো। বেসরকারি খাতের কয়েকটি ব্যাংক বন্ধের উপক্রম হয়েছে। বিভিন্নভাবে দুর্নীতি ও জালিয়াতির মাধ্যমে বেশিরভাগ ঋণ খেলাপি হয়ে গেছে। খেলাপি ঋণের কারণে ঋণের সুদ বাড়ছে, ব্যাংকগুলোতে টাকার অভাব দেখা দিয়েছে। অথচ ঋণ খেলাপিদের বরণ করা হচ্ছে। নিত্যনতুন কায়দায় তাদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে। অথচ ব্যাংকখাতের রক্ত সঞ্চালন করছেন যে আমানতকারীরা, তাদের স্বার্থের কথা বলা হচ্ছে না কোনো পক্ষ থেকেই। উল্টো তাদের পাওনায় কাঁচি চালানো হচ্ছে। 

জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আ হ ম মুস্তফা কামাল জানান, গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত দেশে খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৭০ হাজার কোটির কিছু বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য মতে, চলতি বছরের জুন পর্যন্ত ব্যাংকিং খাতে খেলাপি ঋণের পরিমাণ ১ লাখ ১২ হাজার ৪২৫ কোটি টাকা। এর বাইরে রয়েছে আরও ৫০ হাজার কোটি টাকা। খেলাপির খাতা থেকে বাদ দিতে ব্যাংকগুলো এই টাকা অবলোপন করেছে। মোট খেলাপি ঋণ ১ লাখ ৬০ হাজার কোটি টাকা। 

এক বছরের বেশি সময় ধরে চেষ্টা করা হচ্ছে ঋণের সুদহার ৯ শতাংশের নিচে নিয়ে আসতে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার নির্দেশও এক্ষেত্রে মানেনি ব্যাংকগুলো। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোর যুক্তি- কস্ট অব ফান্ড না কমানো গেলে চাপ দিয়ে ঋণের সুদহার কমানো যাবে না। কস্ট অব ফান্ড বা তহবিল ব্যয় বাংলাদেশে অনেক বেশি। এর প্রধান কারণ খেলাপি ঋণ। এদিকে ঋণের সুদহার না কমলেও, আমানতের সুদহার কমে ৬ শতাংশে নেমে এসেছে অনেক ব্যাংকে। এ জন্য আমানতকারীরা ব্যাংকে টাকা রাখছেন না। ফলে ব্যাংকগুলোর তহবিল সংকট চরম আকার ধারণ করেছে। তহবিল সংকটের কারণে ঋণ বিতরণ করতে পারছে না ব্যাংকগুলো। গত ৬ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন হারে ঋণ বিতরণ করেছে ব্যাংকগুলো। এই সংকটের মূল কারণও ঋণ খেলাপিরা। 

সংশ্লিষ্টরা জানান, ঋণের সুদহার খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ, তবে প্রধান কারণ নয়। কেননা সরকারি ব্যাংকগুলোতে সবসময় সুদহার অনেক কম ছিল। সেই তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকের সুদহার অনেক বেশি। কিন্তু সরকারি ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ ৩০ থেকে ৭০ শতাংশ পর্যন্ত। সরকারি ব্যাংকগুলোতে অনিয়ম, দুর্নীতি, জালিয়াতির ঘটনা ঘটেছে বেশি। হলমার্ক, বিসমিল্লাহ, অ্যাননটেক্স, ক্রিসেন্ট গ্রুপের জালিয়াতির ঘটনার অকুস্থল সরকারি ব্যাংকগুলো। বেসিক ব্যাংক ঋণ জালিয়াতির ঘটনায় একেবারে খাদে পড়েছে। সেই তুলনায় বেসরকারি ব্যাংকের জালিয়াতি কম ঘটেছে। তাই বেসরকারি খাতের ব্যাংকগুলোতে খেলাপি ঋণ তুলনামূলক কম।

নতুন সরকার গঠনের প্রথম দিন থেকেই খেলাপি ঋণ কমানোর ঘোষণা দেওয়া হয়। কিন্তু খেলাপি ঋণ আদায় করার চেয়ে খেলাপি গ্রাহকদের সুবিধা দেওয়া হচ্ছে একের পর এক। প্রথমেই খেলাপি হওয়ার সময়সীমা ৩ মাস থেকে বাড়িয়ে ৬ মাস ও ৯ মাস করা হয়। ঋণ খেলাপিদের সুবিধা দিতে ২ শতাংশ ডাউনপেমেন্ট, ৯ শতাংশ সুদে ১০ বছর মেয়াদে ঋণ পরিশোধের সুযোগ দিতে বিশেষ পুনঃতফসিল নীতিমালা করা হয়েছে। এই প্রক্রিয়া সম্পন্ন করতে খেলাপিদের কাছ থেকে আবেদন সংগ্রহ করা হচ্ছে। এখন পর্যন্ত ১৩০০ আবেদন পড়েছে বিভিন্ন ব্যাংকে। অন্যদিকে, ৫০০ কোটি টাকা বা তারচেয়ে বড় খেলাপিদের সুবিধা দিতে আবার পুনঃতফসিল নীতিমালা করা হচ্ছে। ২০১৫ সালে তাদেরকে সর্বোচ্চ একবারের জন্য পুনর্গঠন সুবিধা দেওয়া হয়। সেটি সংশোধন প্রস্তাব ইতিমধ্যে অনুমোদন করেছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। 

সরকার ও ব্যবসায়ীদের তরফ থেকে বলা হচ্ছে, খেলাপি ঋণ বৃদ্ধির অন্যতম কারণ ঋণের উচ্চ সুদহার। তাই সুদহার যেন সবসময় ৯ শতাংশের নিচে থাকে, এই ইস্যুতে তৎপর সবাই। কিন্তু সুদহার কমানোর অন্যতম উপায় খেলাপি ঋণ কমানো এবং ঋণের টাকা নিয়মিত আদায়ের ব্যবস্থা করা। সেদিকে নজর নেই কারও। সুদহার কমাতে গিয়ে আমানতের সুদহার সর্বনিম্ন পর্যায়ে নামিয়ে আনা হয়েছে। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এক প্রতিবেদনে দেখা যায়, আমানতে গড় প্রকৃত সুদহার নেগেটিভ ০.০৯ শতাংশ। অর্থাৎ ক্রয়ক্ষমতার বিপরীতের আমানতকারীরা যে পরিমাণ অর্থ জমা রাখছেন, তার চেয়েও কম অর্থ ফেরত পাচ্ছেন। জমা রেখে লাভ দূরের কথা, আসল টাকাই ক্ষয়ে যাচ্ছে আমানতকারীদের। আমানতের বিপরীতের টাকা ক্ষয়ে যাওয়া শুরু হয়েছে ২০১৭ সাল থেকে। এরপর থেকেই নেতিবাচক ধারার কারণে বঞ্চিত হচ্ছেন জমাকারীরা। 

ঋণ খেলাপিদের নিয়ে সবাই তোড়জোর করলেও নজর নেই আমানতকারীদের দিকে। উল্টো সঞ্চয়-বিনিয়োগের বৈধ জায়গাগুলোতে কখনো সুদের হার কমিয়ে, কখনো কর বসিয়ে বা করহার বৃদ্ধি করে সঞ্চয়ের পথ রুদ্ধ করা হচ্ছে। সাম্প্রতিক সময়ে মানুষের নিরাপদ বিনিয়োগের উৎস সঞ্চয়পত্র কেনার নিয়মে কড়াকড়িসহ উৎস কর বৃদ্ধি করা হয়েছে। এতে সঞ্চয়ের সবচেয়ে বড় এই খাতে বিক্রিও কমে গেছে আশঙ্কাজনকভাবে।

তথ্য পর্যালোচনায় দেখা যায়, চলতি অর্থবছরের প্রথম মাসে সঞ্চয়পত্রের নিট বিক্রি হয়েছে মাত্র ২ হাজার ১৬০ কোটি টাকা। এটি গত অর্থবছরের একই সময়ের চেয়ে প্রায় ১৩৩ শতাংশ কম। ২০১৮ সালের জুলাই মাসে ৫ হাজার ৩৬ কোটি টাকার সঞ্চয়পত্র বিক্রি হয়।

কর বৃদ্ধি ও সুদ কমানোসহ নানা কারণে সঞ্চয়ে উৎসাহ হারাচ্ছে মানুষ। কেউ বা বেশি সুদ পাওয়ার প্রলোভনে সঞ্চয়ের একটা অংশ অবৈধ উৎসে টাকা খাটাচ্ছে, অথবা বিদেশে পাচার করছে। এছাড়া মূল্যস্ফীতির কারণেও মানুষের সঞ্চয় প্রবণতা কমছে। এর প্রভাব পড়েছে জাতীয় সঞ্চয়ে। আর জাতীয় সঞ্চয় কাঙ্খিত হারে বৃদ্ধি না পাওয়ায় জিডিপিতে বেসরকারি বিনিয়োগের হারও অনেকটা স্থবির হয়ে আছে। এতে নতুন শিল্প-কারখানা যেমন গড়ে উঠছে না, তেমনি কর্মসংস্থানও বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। 

বর্তমানে বিনিয়োগের যেসব বৈধ উৎস রয়েছে তার মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাংক, নন-ব্যাংক আর্থিক প্রতিষ্ঠান, বীমা, পুঁজিবাজার ও সঞ্চয়পত্র খাত। যদিও পুঁজিবাজারের বিনিয়োগকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কিন্তু সঞ্চয় পরিপন্থী বিভিন্ন নীতি-সিদ্ধান্তের কারণে এসব বৈধ উৎসও ধীরে ধীরে সংকুচিত হয়ে পড়ছে।

পলিসি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের (পিআরআই) নির্বাহী পরিচালক ড. আহসান এইচ মনসুর বলেন, ‘আমানতের সুদহার বেঁধে দেওয়ার যে চেষ্টা চলছে, এটা একেবারেই সঠিক হবে না। এটা করলে আমানতকারীদের যেমন অসুবিধা হবে, তেমনি ব্যাংকিং খাতও ভেঙে পড়বে। কারণ আমানতকারী তখন ব্যাংকে টাকা রাখতে চাইবে না। তারা টাকা তুলে বিকল্প উৎসে খাটাবে।’

বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. সালেহউদ্দিন আহমেদ বলেন, আমানতের বিপরীতে সুদহার অনেক কমিয়ে আনা হয়েছে। বর্তমানে তা মূল্যস্ফীতির নিচে রয়েছে। এর ফলে মানুষ যে টাকা জমা রাখছে, প্রকৃতপক্ষে তার চেয়ে কম অর্থ ফেরত পাচ্ছে। ঋণের সুদহার কমাতে আমানতের সুদহার কমানোর প্রয়োজন নেই। এ জন্য খেলাপি ঋণ কমাতে হবে। ঋণের টাকা আদায় নিশ্চিত করতে হবে। অন্যদিকে, ব্যাংকগুলোতে সাজসজ্জার নামে অতিরিক্ত ব্যয় ও মালিকদের অতিমুনাফালোভী হওয়ার প্রবণতা বন্ধ করতে হবে।

মন্তব্য করুন

সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার

© 2019 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh