ফনেটিক ইউনিজয়
পোশাকশিল্পে মালিক-শ্রমিক সম্পর্ক তিক্ত রূপ নিচ্ছে
দ্বীন অয়ন

দেশের রপ্তানি আয়ের অন্যতম প্রধান খাত পোশাকশিল্প। তবে এই শিল্পে যাঁরা কাজ করেন এবং যাঁরা এটির মালিকানায় রয়েছেন, এই দুই শ্রেণির মধ্যকার সম্পর্ক এখনো আগের মতোই আস্থাহীনতার। কর্মক্ষেত্রে মালিক ও শ্রমিকের মধ্যে আস্থা ও বিশ্বাসের ঘাটতি এখনো আশাব্যঞ্জক অবস্থায় পৌঁছাতে পারেনি। বর্তমানে যে সম্পর্ক রয়েছে, তা স্বাস্থ্যকর নয়। পোশাক খাতে নিরাপদ কর্মপরিবেশের স্বার্থে মালিক ও শ্রমিকের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক গুরুত্বপূর্ণ। সুষ্ঠু কর্মপরিবেশ ও উৎপাদনশীলতার স্বার্থে উভয় পক্ষের সহযোগিতামূলক সম্পর্ক প্রয়োজন। এসব বক্তব্য আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থার (আইএলও)। রানা প্লাজা ও তাজরীন দুর্ঘটনার পর বিশ্বব্যাপী বাংলাদেশের গার্মেন্টস খাতের শ্রম নিরাপত্তা মান নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছিল। এর পরিপ্রেক্ষিতে ইউরোপ ও আমেরিকার দুটি জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স তাদের অর্ডার সরবরাহ করেÑএমন প্রায় ২ হাজার ২০০ কারখানার নিরাপত্তাব্যবস্থা পরীক্ষার উদ্যোগ নেয়। এর বাইরে আরও অন্তত দেড় হাজার কারখানার পরীক্ষা ও সংস্কারকাজ তদারক করা হচ্ছে। এতে সরকারকে সহযোগিতা দিচ্ছে আইএলও।
সম্প্রতি বাংলাদেশে এক সফর শেষে গার্মেন্টস খাতসহ সার্বিক শ্রম মানের পর্যবেক্ষণ নিয়ে উল্লিখিত কথা জানান সংস্থাটির মহাপরিচালক গাই রাইডার। তাঁর মতে, বাংলাদেশে শ্রমিক ও মালিকের মধ্যে আস্থার ঘাটতি আছে। ভালো কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করতে এবং কারখানাকে উৎপাদনশীল রাখতে আস্থা দরকার। আইএলও মহাপরিচালকের এমন পর্যবেক্ষণ স্বীকার করেছে সরকারও। আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে উপস্থিত শ্রম ও কর্মসংস্থান প্রতিমন্ত্রী মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, এই আস্থার সংকট দূর করতে উভয় পক্ষের মধ্যে সামাজিক সংলাপ প্রয়োজন। যে পরিবেশ এখন একদম অনুপস্থিত। গাই রাইডার বলছেন, সংস্কার অগ্রগতি সন্তোষজনক। কিন্তু এ কাজ শেষ হয়ে যায়নি। ২০১৩ সালের পর অ্যাকর্ড, অ্যালায়েন্স, সরকার ও আইএলওর উদ্যোগে অনেক অগ্রগতি হয়েছে। এ গতি ধরে রাখতে হবে। প্রতিটি কারখানার মান মূল্যায়ন এবং সংস্কারকাজ শেষ করতে হবে। নিশ্চিত করতে হবে, প্রতিটি কারখানা নিরাপদ। এ কাজে বাংলাদেশ সরকারের সঙ্গে আইএলও প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এ দেশে পোশাক খাতই তাদের প্রধান অগ্রাধিকার। এ জন্য এ খাতের সমস্যা সমাধানে ‘সামাজিক সংলাপ এবং সংগতিপূর্ণ শিল্প সম্পর্ক’ নামে নতুন কর্মসূচি চালু করা হয়েছে।
এখনো শ্রমিকেরা গার্মেন্টস কারখানায় ত্রুটিপূর্ণ পরিবেশে কাজ করছে বলে ইঙ্গিত দিয়ে আইএলও বলছে, এখনো অনেক গার্মেন্টস রয়েছে, যেখানে সংস্কারের বহু কাজ বাকি রয়েছে। বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে গাই রাইডার বলেন, বাংলাদেশের পোশাকশিল্পে এখনো অনেক কারখানা রয়েছে, যারা শ্রমিক নিরাপত্তায় প্রতিশ্রুত সংস্কারের কাজ শুরুই করেনি। বিশেষ করে সাব-কন্ট্রাক্টে থাকা ছোট কারখানাগুলোকে অনেক সময় খুঁজে পাওয়াই মুশকিল। তিনি বলেন, বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উৎপাদনের চেয়ে বরং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা বন্ধ করে দেওয়া উচিত। ছোট কারখানাগুলো পর্যন্ত অনেক সময় পৌঁছানো যায় না। কারণ, সেগুলো খুঁজেই পাওয়া যায়া না। সংগতি কম থাকায় তারা সংশোধনকাজ নিয়ে সমস্যায় রয়েছে। কিন্তু একই সঙ্গে এটাও বলতে হবে যে বিপজ্জনক পরিস্থিতিতে উৎপাদনের চেয়ে বরং ঝুঁকিপূর্ণ কারখানা বন্ধ করে দেওয়াই উচিত। তিনি বলেন, পরিস্থিতি যাতে আগের মতো না হয়, সে জন্য সংস্কারকাজ শুরু করা কিংবা অব্যাহত রাখতে কারখানাগুলোকে চাপ অব্যাহত রাখতে হবে। উল্লেখ্য, যথাসময়ে সংস্কারকাজ সম্পন্ন করার ব্যর্থতায় ১২০টি কারখানার সঙ্গে ব্যবসা বাতিল করেছে বিদেশি ক্রেতা জোট অ্যাকর্ড ও অ্যালায়েন্স।
এদিকে পোশাক খাতে মালিক-শ্রমিক সম্পর্কোন্নয়নে সহযোগিতায় নতুন উদ্যোগ নিয়েছে আইএলও। এর অংশ হিসেবে উৎপাদনের সঙ্গে সম্পর্কিত সব পক্ষের মধ্যে আলোচনা ও ঐকমত্যের ভিত্তিতে সুসম্পর্ক গড়ে তুলতে ‘সামাজিক সংলাপ ও সংগতিপূর্ণ শিল্প সম্পর্ক’ নামে একটি প্রকল্প হাতে নিয়েছে সংস্থাটি। প্রকল্পটি বাস্তবায়নের জন্য প্রাথমিকভাবে ৫০০ কারখানাকে বাছাই করা হয়েছে। এর মধ্যে ৩৫০ কারখানায় কোনো ধরনের শ্রমিক ইউনিয়ন নেই। কারখানা বাছাইয়ের ক্ষেত্রে শ্রমিকসংখ্যা ও শ্রমিক ইউনিয়নের কার্যক্রমকে বিবেচনায় নেওয়া হয়েছে। পাঁচ বছর মেয়াদি প্রকল্প পর্যায়ক্রমে অন্যান্য কারখানায়ও বাস্তবায়ন করা হবে। মালিক-শ্রমিক সুসম্পর্কের অভাবে শ্রমিকদের মধ্যে সামান্য বিষয় নিয়েই উত্তেজনা দেখা যায় অনেক ক্ষেত্রে। এতে পোশাক খাতে ভাবমূর্তির সংকট তৈরি হয়। উৎপাদন বন্ধ থাকলে ক্রেতার সঙ্গে চুক্তি অনুযায়ী পণ্য সরবরাহ করা যায় না। এ কারণে আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়ে উদ্যোক্তা ও শ্রমিক পক্ষই। বিভিন্ন সময়ে বিষয়টির গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা, তাগিদ সত্ত্বেও বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি নেই। আর এসব বিষয় মাথায় রেখে নতুন এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

Disconnect