ফনেটিক ইউনিজয়
বায়ুদূষণ : সঠিক পরিকল্পনায় নিয়ন্ত্রণ সম্ভব

রাজধানী ঢাকা বিশ্বের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ দূষিত বায়ুর শহর। শীত এলে এখানে বায়ুদূষণের মাত্রা আরও বেড়ে যায়। যে কারণে সম্প্রতি মাঝে মাঝেই ঢাকার বায়ুদূষণ বিশ্বের সর্বোচ্চ দূষিত শহর দিল্লিকেও ছাড়িয়ে যাচ্ছে। যেমন ২২ নভেম্বর ঢাকার বায়ুমান ছিল ২৬৯, যেখানে ভারতের দিল্লি ও চীনের বেইজিং শহরের বায়ুমান সূচক ছিল যথাক্রমে ২২৮ ও ৩০। দূষণের মাত্রা এখানে এতটাই ভয়াবহ যে নদী-খালে মাছ বা প্রাণীও টিকতে পারছে না। ঢাকার মতো অবস্থা চট্টগ্রামসহ বড় শহরগুলোতেও। বায়ুদূষণের কারণে যে বিষাক্ত গ্যাস ছড়িয়ে পড়েছে, তা আমাদের স্বাস্থ্য ও মস্তিষ্কের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। এই দূষণের মাত্রাও বাড়ছে লাফিয়ে লাফিয়ে। ১৭ ফেব্রুয়ারি, ২০১৪ বাতাসের মান নির্ণয়ে যেখানে ১৭২ একিউআই (এয়ার কোয়ালিটি ইনডেক্স) পাওয়া যায়, সেখানে ২৫ জানুয়ারি ২০১৭, একিউআইয়ের পরিমাণ ছিল ৩৬১। বায়ুদূষণের কারণে বাংলাদেশে বছরে ১ লাখ ২২ হাজার ৪০০ মানুষের মৃত্যু হচ্ছে বলে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
ত্রুটিপূর্ণ বাস, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি, বেবিট্যাক্সি এবং বিভিন্ন কারখানা থেকে কালো ধোঁয়া ও বিষাক্ত রাসায়নিক বাতাসে ছড়িয়ে পড়ছে। এখান থেকে মিথেন, ইথেলিন বাতাসে মিশ্রিত হয়ে প্রাণিদেহে প্রবেশ করছে। তা ছাড়া চামড়াশিল্প, রং কারখানা, রাসায়নিক গবেষণাগার, পয়োশোধনাগার থেকে উৎপন্ন হাইড্রোজেন সালফাইডের সবই জীবজগতের জন্য মারাত্মক ক্ষতিকর। কঠিন বর্জ্য-আবর্জনা পোড়ানোর ফলে বাতাসে মিশে যাওয়া কার্বন ডাই-অক্সাইডের পরিমাণ অস্বাভাবিকভাবে বেড়ে যাচ্ছে। সেই সঙ্গে এসবেস্টস আঁশ, ঘরবাড়ি, রাস্তাঘাট নির্মাণ থেকে ধুলাবালু, সিগারেটের ধোঁয়া ও কীটনাশক স্পের কণা প্রতিনিয়ত বাতাসকে দূষিত করে মানবদেহে ক্যানসারসহ অ্যালার্জিজনিত নানা জটিল রোগের সংক্রমণ ঘটাচ্ছে। বাড়ছে রোগ-ব্যাধি। রাজধানীর এক-চতুর্থাংশ শিশুর ফুসফুসের সক্ষমতা দ্রুত কমছে। দীর্ঘ মেয়াদে ধুলার মধ্যে থাকার কারণে অ্যাজমা, সিওপিডি, ব্রঙ্কাইটিস, শ্বাসনালি সংক্রান্ত রোগে আক্রান্ত হচ্ছে মানুষ। ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে পরিবার, এমনকি রাষ্ট্রও।
তাই এই সমস্যা সমাধানে পরিবেশ সংরক্ষণ আইনের যথাযথ প্রয়োগ ও বাস্তবায়ন নিশ্চিত করতে পরিবেশ অধিদপ্তরের কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা দরকার। শুধু সরকারি উদ্যোগই নয়, প্রয়োজন এর সঙ্গে বেসরকারি সংস্থাগুলোকে যুক্ত করে দেশের মানুষকে আরও বেশি সচেতন করে তোলা। বৃক্ষনিধন বন্ধ করে দেশব্যাপী বনায়ন কর্মসূচিকে উৎসাহিত করতে হবে। সেই সঙ্গে দূষণমুক্ত জ্বালানি ব্যবহারে সরকারি ও বেসরকারি উদ্যোগ অব্যাহত রাখতে হবে। ইটভাটাগুলো দ্রুত আধুনিকায়ন করতে হবে। নির্মাণকাজে যাতে ধুলা কম হয়, সে বিষয়ে তদারকি বাড়াতে হবে। রাজশাহী শহর দেড় বছরের মধ্যে বায়ুদূষণের মাত্রা ৬৭ শতাংশ কমিয়ে সারা বিশ্বে এক নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছে। বিশ্ব স্বাস্থ্যসংস্থার হিসাবে সবচেয়ে বেশি বায়ুদূষণ কমেছে এই শহরে। রাজশাহী প্রমাণ করেছে কীভাবে বায়ুদূষণ কমানো যায়। যেহেতু আমাদের নিজ দেশেই স্বল্পতম সময়ের মধ্যে বায়ুদূষণ রোধ করার দৃষ্টান্ত আছে, তাই ঢাকার বায়ুদূষণ রোধ করা অসম্ভব কিছু নয়। এর জন্য প্রয়োজন সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার বাস্তবায়ন।

আরো খবর

Disconnect