ফনেটিক ইউনিজয়
দেশে আর একটিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা যেন না ঘটে

কঠোর নিরাপত্তা, শিক্ষামন্ত্রীর কড়া হুঁশিয়ারি ও হুমকি-ধমকির পর এবারও এসএসসি পরীক্ষা শুরুর দিন থেকেই প্রশ্ন ফাঁস হয়েছে। পরীক্ষার প্রশ্নপত্রের সঙ্গে ফেসবুকে আসা প্রশ্নের হুবহু মিল পাওয়া গেছে। এর আগে কঠিনতর ব্যবস্থার পাশাপাশি প্রশ্নফাঁসের অভিযোগ আসামাত্রই পরীক্ষা বাতিল করা হবে বলে জানিয়েছিলেন শিক্ষামন্ত্রী। কিন্তু কার্যত এ রকম কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করা হয়নি। বরং প্রশ্নফাঁসের শাস্তি পাচ্ছে শিক্ষার্থীরা। পরীক্ষা শুরুর ৩০ মিনিট আগে তাদের জন্য কেন্দ্রে প্রবেশের বাধ্যবাধকতা করা হয়েছে। যদিও পরীক্ষা শুরুর ১০ মিনিট পরেও ছাত্রছাত্রীদের পরীক্ষার হলে ঢোকার অধিকার আছে, যানজটসহ অনাকাক্সিক্ষত যেকোনো ঘটনার আশঙ্কায়। অথচ এখন তাদের সেই অধিকার থেকেও বঞ্চিত করা হচ্ছে।
বিসিএস থেকে শুরু করে ছোট-বড় সব ধরনের নিয়োগ পরীক্ষা, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা, এমনকি স্কুল পর্যায়ে দ্বিতীয় শ্রেণির পরীক্ষায় পর্যন্ত প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা ঘটছে। দেশের সব মিডিয়া থেকে শুরু করে দেশের বুদ্ধিজীবী সমাজ এ নিয়ে নানা রকম আশঙ্কার কথা বলেছে। প্রশ্নপত্র ফাঁসকারীকে ধরিয়ে দিতে পারলে ৫ লাখ টাকা পুরস্কৃত করার ঘোষণাও এসেছে। সর্বশেষ শিক্ষামন্ত্রীর পদত্যাগ বা বহিষ্কারের দাবি পর্যন্ত করেছেন কেউ কেউ। কিন্তু কোনো কিছুতেই থেমে নেই প্রশ্ন ফাঁস। তাহলে পরীক্ষা নেওয়া বা না নেওয়ায় কিছুই কি আসে যায়, কেবল একটি সনদপ্রাপ্তি ছাড়া?
সাধারণত ফেসবুকে ফেক আইডি খুলে প্রশ্নফাঁস করা হচ্ছে। এর আগে প্রধানমন্ত্রীকে হুমকির ঘটনায় গ্রেপ্তারকৃত কয়েকজনের ফেক আইডি উদ্ধারের মাধ্যমে প্রমাণিত হয়েছে আমাদের দেশে এদের ধরার মতো প্রযুক্তি রয়েছে। এখন প্রয়োজন কেবল সঠিক দিকনির্দেশনা ও সর্বাত্মক প্রচেষ্টা। এ জন্য উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন একটি কমিটি গঠন করা যেতে পারে। প্রয়োজনে সব সংস্থাকে এখানে অন্তর্ভুক্ত করে দোষীদের খুঁজে বের করতে হবে। কিন্তু এত বছর ধরে প্রশ্নফাঁসের ভয়াবহতা নিয়ে শত কথা ও উদ্বেগের মধ্যেও এ নিয়ে সরকারের উচ্চ মহল থেকে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়াটা রীতিমতো বিস্ময়কর।
বিভিন্ন ক্ষেত্রে আমাদের গোয়েন্দা বাহিনীর সফলতা আছে। যদি অন্য ক্ষেত্রে সরকার সফল হয়, তাহলে এ ক্ষেত্রে কেন ব্যর্থ হবে? আমাদের দেশে ইংরেজি মাধ্যমের পরীক্ষায় প্রশ্ন ফাঁসের কথা শোনা যায় না। সুতরাং ধরে নিতে হবে আমাদের ব্যবস্থাপনার মধ্যেই ভূতটা রয়ে গেছে। আর এই দায় অবশ্যই সরকারের সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের। প্রযুক্তিবিদের সহায়তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কঠোর ও দৃঢ় পদক্ষেপে এটা বন্ধ করতে হবে। জঙ্গিবাদের মতোই এটা বড় একটা অপরাধ। প্রশ্নফাঁস রোধে দীর্ঘমেয়াদি পদক্ষেপ হিসেবে ক্লাসরুমে লেখাপড়া ফিরিয়ে আনা ও আইন করে কোচিং সেন্টার বন্ধ করে দিতে হবে। আগামী প্রজন্মকে যদি আমরা সত্যিকার শিক্ষায় শিক্ষিত করতে না পারি, সামনে একটা অন্ধকার ভবিষ্যৎ ছাড়া আর কিছুই নেই আমাদের। কারণ শিক্ষিত সমাজ ছাড়া কখনোই সমৃদ্ধসমাজ গঠন সম্ভব নয়।
প্রশ্নফাঁসের জন্য এখন শিক্ষক-অভিভাবককে দোষারোপ করা হচ্ছে। অভিভাবককে বলা হচ্ছে আপনারা প্রশ্নের পেছনে ছুটবেন না। অথচ মূল কাজ প্রশ্নফাঁস রোধ, সেটাতেই সরকারের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যাচ্ছে না। বিভিন্ন সময় প্রশ্নফাঁসে জড়িত অনেককে গ্রেপ্তারের কথা শোনা যায়। কিন্তু এদের আদৌ শাস্তি হয়েছে কি না তাও জানা যায় না। পাবলিক পরীক্ষা হোক আর নিয়োগ পরীক্ষারই হোক, যে বা যারাই প্রশ্নফাঁস করুক, তাদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইনের ফাঁক গলে যেন কেউ বেরিয়ে যেতে না পারে। দেশে আর একটিও প্রশ্নপত্র ফাঁসের ঘটনা যেন না ঘটে, সেদিকে সতর্ক থাকতে হবে। এর বিকল্প নেই।

আরো খবর

Disconnect