ফনেটিক ইউনিজয়
বিশ্বের দ্বিতীয় শীর্ষ যানজটের শহর ঢাকা, চাই সমন্বিত উদ্যোগ

বহুজাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান নামবিওর প্রকাশিত ‘ওয়ার্ল্ড ট্রাফিক ইনডেক্স-২০১৮’-এর তথ্যমতে, বিশ্বের সবচেয়ে যানজটপূর্ণ শহরের তালিকায় দ্বিতীয় অবস্থানে ঢাকা। এর আগে ২০১৭ সালেও একই অবস্থান ছিল। তবে ২০১৬ সালে তৃতীয় ও ২০১৫ সালে এ অবস্থান ছিল অষ্টম। যানজটের কারণে এখানে ঘণ্টার পর ঘণ্টা মানুষের মূল্যবান সময় নষ্ট হচ্ছে, নষ্ট হচ্ছে কার্যক্ষমতা ও মনোযোগ; যার ক্ষতির পরিমাণ বছরে মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ৩ শতাংশ। অর্থাৎ আর্থিক হিসাবে প্রায় ৫২ হাজার কোটি টাকা।
দেশের বিপুলসংখ্যক জনগণ কর্মসংস্থানের জন্য রাজধানীমুখী হচ্ছে। প্রতিদিনই অস্বাভাবিক হারে ঢাকায় মানুষ বাড়ছে। কিন্তু সে তুলনায় বাড়েনি সড়কের সংখ্যা ও পরিধি। একটি শহরের আয়তনের কমপক্ষে ২৫ শতাংশ সড়ক থাকতে হয়। কিন্তু ঢাকায় সড়ক আছে মাত্র ৭-৮ শতাংশ। গাড়ি চলাচলের পথ আরও কম, ৩-৪ শতাংশ সড়ক। ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের সাম্প্রতিক এক জরিপ বলছে, এশিয়ার মধ্যে সড়ক ব্যবস্থায় সবচেয়ে খারাপ দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দ্বিতীয়। কিন্তু বিশ্বব্যাংকের তথ্যমতে, বিগত বছরগুলোয় দক্ষিণ এশিয়ায় সড়ক নির্মাণে সবচেয়ে বেশি খরচ হয়েছে বাংলাদেশে। অর্থাৎ সর্বগ্রাসী দুর্নীতির কারণে প্রচুর অর্থ ব্যয় করা হলেও সড়ক ব্যবস্থার কোনো উন্নতি হয়নি।
তার ওপর আছে ব্যক্তিগত গাড়ির আধিক্য। গড়ে দেড়জন (১ দশমিক ৫) ব্যক্তি যাতায়াত করলেও ব্যক্তিগত গাড়িগুলো প্রায় ৩৩ শতাংশ সড়ক ব্যবহার করে। নরওয়ের অসলো, স্পেনের মাদ্রিদ, জার্মানির হামবুর্গ ও বার্লিন, ডেনমার্কের কোপেনহেগেন, বেলজিয়ামের ব্রাসেলসসহ বিশ্বের ১৩টি আধুনিক শহরে ২০১৯ সাল থেকে পরবর্তী ছয় বছরে পর্যায়ক্রমে ব্যক্তিগত গাড়ি বন্ধ করে দেয়া হচ্ছে। এসব শহরে হাঁটা ও বাইসাইকেল চলাচলকে প্রাধান্য দেয়া হচ্ছে। অথচ এর উল্টো চিত্র ঢাকায়। এ শহরে প্রতিদিন গড়ে নামছে ২০০টি করে ব্যক্তিগত গাড়ি ও ছোট যান। রাজধানীতে এখন ঘণ্টায় গড়ে প্রায় সাত কিলোমিটার গতিতে চলছে যানবাহন। এভাবে চলতে থাকলে আর কিছুদিন পর হেঁটেই গাড়ির আগে যেতে পারবে মানুষ।
পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে কৌশলগত পরিবহন পরিকল্পনা (এসটিপি) গ্রহণ করা হয়েছে অনেকবার, কিন্তু কোনো নির্দেশনাই বাস্তবায়ন হয়নি। দূরদৃষ্টি নিয়ে নগর পরিকল্পনাকারীদের কাজে লাগালে যানজট পরিস্থিতি আজ এতটা জটিল আকার ধারণ করত না। সুষ্ঠু পরিকল্পনা না থাকায় নগরীতে গাড়ির সংখ্যা বাড়লেও গণপরিবহন সংকট তীব্র। পরিবহন খাতে বিদ্যমান ভয়াবহ বিশৃঙ্খলা ও অরাজকতাও যানজটের একটি বড় কারণ। সরকার এদিকে নজর দিলে যানজটের তীব্রতা কিছুটা কমিয়ে আনা সম্ভব হতো।
আসলে ঢাকাকে বাসযোগ্য করে তোলার জন্য সরকারের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যম, সব রাজনৈতিক দল, সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনকে এগিয়ে আসতে হবে। বিচ্ছিন্নভাবে একক পদক্ষেপ নিয়ে এ সর্বগ্রাসী সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়। রাজধানীর রাস্তাগুলো প্রশস্তকরণ, ব্যাপক হারে ফ্লাইওভার নির্মাণ, হকার উচ্ছেদ ও অবৈধ পার্কিংয়ের অবসান ঘটাতে হবে। ট্রাফিক আইন মেনে চলার ক্ষেত্রেও আরোপ করতে হবে কঠোর ব্যবস্থা। পাশাপাশি প্রশাসন বিকেন্দ্রীকরণের ওপর জোর দিতে হবে। ঢাকা ও এর আশপাশে অবস্থিত কল-কারখানাগুলোও দূরবর্তী সুবিধাজনক স্থানে সরিয়ে নেয়া দরকার। ঢাকার আশপাশের নদ-নদীগুলো সচল করতে পারলেও যানজট কিছুটা কমবে।

আরো খবর

Disconnect