ফনেটিক ইউনিজয়
ব্যাংকিং খাতের সুরক্ষা বাড়ান

গত দুই দশকে দেশের ব্যাংক ব্যবস্থায় উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। সাধারণ ব্যাংকিং পরিবর্তিত হয়েছে ডিজিটাল ব্যাংকিংয়ে। কিন্তু সেই সাথে তৈরি হয়েছে এক নতুন ধরনের ঝুঁকি। হ্যাকারদের ডিজিটাল প্রতারণার ফাঁদে পড়েছে ব্যাংকিং খাত। সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কয়েকবার এটিএম বুথে ‘স্কিমিং ডিভাইস’ বসিয়ে ব্যাংকের ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ক্লোনিং করে অর্থ আত্মসাতের ঘটনায় গ্রাহকদের মধ্যে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব ব্যাংক ম্যানেজমেন্টের (বিআইবিএম) এক গবেষণা প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশের ব্যাংকগুলোর ৫২ শতাংশই তথ্যনিরাপত্তা ঝুঁকিতে রয়েছে, যার মধ্যে ১৬ শতাংশ খুবই উচ্চনিরাপত্তা ঝুঁকিতে। ফলে সাইবার নিরাপত্তা নিয়ে এখন প্রশ্নের মুখে ‘ডিজিটাল ব্যাংকিং’ খাত।
২০১৬ সালের ফেব্রুয়ারিতে এটিএম বুথে স্কিমিং ডিভাইস বসিয়ে ক্রেডিট কার্ড ক্লোন করে অর্থ লোপাটের ঘটনা গ্রাহকের মধ্যে জন্ম দেয় উদ্বেগের। কিন্তু এর দুই বছর না পেরোতেই চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে একই ঘটনার পুনরাবৃত্তিতে খোয়া যায় ৪৯ গ্রাহকের ২০ লাখ টাকা। এটিএম বুথে জালিয়াতি প্রতিরোধে কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে এক মাসের মধ্যে চুরি প্রতিরোধক অ্যান্টি-স্কিমিং ও পিন শিল্ড ডিভাইস স্থাপন, স্বয়ংক্রিয় এসএমএসের মাধ্যমে লেনদেনের তথ্য প্রদান করার নির্দেশ দেয়া হয়েছিল। কিন্তু এতদিনেও বেশির ভাগ ব্যাংকই তা কার্যকর করেনি।
ব্যাংকগুলোয় যেসব মেশিন ও কার্ড ব্যবহার করা হচ্ছে, তা খুবই নিম্নমানের। এতে যেকোনো সময় গ্রাহকের টাকা হাতিয়ে নেয়া যায়। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, ডিজিটাল ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন সবচেয়ে বড় ঝুঁকি প্রযুক্তিগত। ফলে ব্যাংকগুলোয় উন্নত প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়াতে হবে। কোনো অবস্থায়ই যেন ক্লোন কার্ড তৈরি করতে না পারে। কার্ড বা পাসওয়ার্ড কারও হাতে না পড়লে কখনও ক্লোন করা সম্ভব নয়। এক্ষেত্রে ব্যাংকগুলোকে কার্ড ব্যবহারের ঝুঁকিগুলো নিয়ে কাজ করতে হবে। সুপারশপে পিওএস (পজ) মেশিনে বেশি ঝুঁকি রয়েছে। তাই পিওএস মেশিন ব্যবহারের অনুমতিতে ব্যাংকের আরও বেশি কঠোর হওয়া উচিত। এজন্য সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোকে পর্যবেক্ষণে রাখতে হবে।
এখন সারা পৃথিবীতে চিপস বেজড কার্ড ব্যবহার হচ্ছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনা আছে চিপস বেজড কার্ড তৈরি করার। বর্তমানে যে কার্ড ব্যবহার হচ্ছে, সেটা ক্লোন করা যায়। কিন্তু চিপস বেজড কার্ড ক্লোন করা যায় না। এটা নতুন প্রযুক্তি। এজন্য ব্যাংকগুলোকে নতুন বিনিয়োগ করতে হবে। অন্যদিকে কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে গ্রাহকদেরও আরও সচেতন হতে হবে।
জালিয়াতির এসব ঘটনার পেছনে ব্যাংকের কর্মকর্তাদের সংশ্লিষ্টতা ও অদক্ষতা রয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। তথ্যপ্রযুক্তি নিরাপত্তা সম্পর্কে ৫০ শতাংশ ব্যাংক কর্মকর্তাই অজ্ঞ। প্রযুক্তির উদ্ভাবন হালনাগাদের পাশাপাশি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাদের আপডেট হওয়াও জরুরি। সেই সাথে সাইবার সিকিউরিটির মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের নির্দেশনার অপেক্ষায় না থেকে নিজস্ব উদ্যোগেই আইটিসহ অন্যান্য সমস্যা সমাধান করতে হবে। ব্যাংকগুলোকে প্রযুক্তিগত উন্নয়নের পাশাপাশি বিভিন্ন বুথে নজরদারি বাড়াতে হবে।
তবে এসব জালিয়াতির ঘটনায় ব্যাংকের যোগসাজশ হচ্ছে সবচেয়ে বেশি উদ্বেগজনক। এজন্য এখনই ব্যাংকগুলোর ওপর কঠোর নজরদারি বাড়াতে হবে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা গড়ে তোলার জন্য সরকারকে নতুন প্রযুক্তি ও আইন তৈরির উদ্যোগ নিতে হবে। উন্নত বিশ্বে ঝুঁকি মোকাবেলায় তিন মাস পরপর তথ্যপ্রযুক্তি বা আইটি ও নিরাপত্তা অডিট করানো হয়। আমাদের দেশেও এটা চালু করতে হবে। ডিজিটাল বাংলাদেশ কর্মসূচি বাস্তবায়নে ব্যাংক ব্যবস্থাপনার পদ্ধতিকে সময়ের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হালনাগাদ করা এবং গ্রাহকদের সচেতনতার বিকল্প নেই।

আরো খবর

Disconnect