ফনেটিক ইউনিজয়
আত্মহত্যা বাড়ছে : প্রয়োজন মানসিক স্বাস্থ্যসেবা

প্রতিবছরের ১০ সেপ্টেম্বর ‘বিশ্ব আত্মহত্যা প্রতিরোধ দিবস’ পালন করে আসছে ‘ইন্টারন্যাশনাল অ্যাসোসিয়েশন ফর সুইসাইড প্রিভেনশন’। বেঁচে থাকার প্রবণতা মানুষের জন্মগত। তার পরও বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী, বিশ্বে প্রতিবছর প্রায় আট লাখ মানুষ আত্মহত্যা করে। ১৫ থেকে ৪৪ বছর বয়সী জনগোষ্ঠীর মৃত্যুর প্রধান তিনটি কারণের একটি হলো আত্মহত্যা। ডব্লিউএইচওর আশঙ্কা, ২০২০ সাল নাগাদ বিশ্বে প্রতিবছর সাড়ে ১৫ লাখ মানুষ আত্মঘাতী হবে। অন্যদিকে বাংলাদেশ পুলিশের হিসাবে, প্রতিবছর দেশে গড়ে ১০ হাজার মানুষ আত্মহত্যা করছে। আত্মহত্যার চেষ্টা করে ব্যর্থ হওয়ার সংখ্যা এর চেয়েও অনেক বেশি। দেখা যাচ্ছে, বাংলাদেশে আত্মহত্যায় মৃত্যু সড়ক দুর্ঘটনার চেয়ে কম নয়, বরং বেশি। তাছাড়া আমাদের দেশে কম বয়সীদের মধ্যেই এ প্রবণতা বেশি, যা আসলে একেকটা সম্ভাবনারই মৃত্যু। তাই এ বিষয়ে সচেতন হওয়ার সময় এসেছে।
সাধারণত সমস্যা মোকাবিলায় অদক্ষতা, হীনম্মন্যতা, সামাজিকভাবে বিচ্ছিন্ন ব্যক্তিদের মধ্যে আত্মহত্যার প্রবণতা বেশি থাকে। ব্যক্তির জিনগত বৈশিষ্ট্য, জটিল মানসিক অবস্থা, আর্থসামাজিক ও সাংস্কৃতিক পরিবেশ মানুষকে আত্মহত্যাপ্রবণ করে তুলছে। তাছাড়া অন্যের আত্মহত্যার খবর অনেক সময় নাজুক মানসিক অবস্থার ব্যক্তিদের আত্মহত্যায় উৎসাহিত করে। তাই এ ধরনের খবর গণমাধ্যমে কীভাবে, কতটা বিস্তারিতভাবে প্রচারিত হচ্ছে, সেসবের ওপরও আত্মহত্যার হার নির্ভর করে।
তবে আত্মহত্যার মূল চালিকাশক্তি হলো মানসিক রোগ। কিন্তু মানসিক রোগীর জন্য চিকিৎসকদের চেম্বারের পরিবেশ থেকে শুরু করে তাদের প্রতি আচরণ, চিকিৎসকদের সংখ্যা সব দিক থেকেই বাংলাদেশের চিকিৎসা ব্যবস্থায় মারাত্মক ঘাটতি রয়েছে। এ ধরনের মানুষের সহায়তার জন্য আলাদা থেরাপিস্ট বা কাউন্সেলিংয়ের ব্যবস্থাও এ দেশে নেই বললেই চলে। মনোরোগ চিকিৎসকেরাই ওষুধ দেন, তারাই আবার কাউন্সেলিংয়ের চেষ্টা করেন।
তাই সময় এসেছে সবার জন্য মানসিক স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার। মানসিক রোগ সম্পর্কে সচেতনতা বাড়ানো, সমস্যা দ্রুত শনাক্তকরণ ও চিকিৎসা নিশ্চিত করার মাধ্যমে আত্মহত্যার হার অনেক কমানো সম্ভব। সেই সাথে আত্মহত্যায় ব্যবহার করা হয়, এমন জিনিস যাতে সহজলভ্য না হয়, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। গণমাধ্যমকেও দায়িত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করতে হবে। আত্মহত্যার বিস্তারিত বিবরণ ও ধরন বর্ণনা থেকে যথাসম্ভব বিরত থাকা উচিত। সারা দেশে ক্রাইসিস সেন্টার ও টেলিফোন হটলাইন চালুর উদ্যোগ নেয়া দরকার। বিশ্বের অনেক দেশে আত্মহত্যার প্রবণতায় ভোগা মানুষের জন্য সরকারিভাবে জরুরি হেল্পলাইনসহ নানা ধরনের সেবা রয়েছে।
কারও আত্মহত্যা শুধু একজন ব্যক্তির শূন্যতা নয়। প্রতিটি আত্মহত্যায় কোনো না কোনোভাবে আক্রান্ত হয় তার সঙ্গে যুক্ত আরও অনেকে। তাই আত্মহত্যার এ ক্রমবর্ধমান হার কমাতে সারা দেশে যত চিকিৎসক, নার্স বা স্বাস্থ্যকর্মী আছেন, তাদের মানসিক স্বাস্থ্য বিষয়ে প্রশিক্ষণ দিতে হবে। জরুরি হেল্পলাইনে মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য আলাদা বাটন সংযুক্ত করা দরকার। মাদকাসক্তি আত্মহত্যাপ্রবণতার একটি বড় কারণ। আশার কথা, দেশে এখন মাদক ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে শক্ত অবস্থান নেয়া হয়েছে। পাশাপাশি মাদকাসক্তদের চিকিৎসার মাধ্যমে তাদেরও সুস্থ-স্বাভাবিক পথে ফিরে আসার রাস্তা তৈরি করতে হবে। আত্মহত্যার প্রবণতা থেকে মানুষকে জীবনের পথে ফিরিয়ে আনতে এভাবে সম্মিলিতভাবে উদ্যোগ নিতে হবে।

আরো খবর

Disconnect