ফনেটিক ইউনিজয়
আহমদ ছফা যখন বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস কামনা করেন
জাকির তালুকদার

আহমদ ছফা বুদ্ধিবৃত্তির নতুন বিন্যাস বইটি রচনা করেছিলেন ১৯৭২ সালে। সালটাই বলে দিচ্ছে যে, স্বাধীনতা অর্জনের অব্যবহিত পরের মাসগুলোতে গোটা জাতি যখন উন্মুখ হয়ে আছে নতুন প্রত্যাশায়। আহমদ ছফা মনে-প্রাণে প্রত্যাশা করেছেন যে, এবার দেশে সত্যিকারের রেনেসাঁ আসবে। সেই রেনেসাঁকে ধারণ করার জন্য, বরণ করার জন্য যে উপযুক্ত মানসিক প্রস্তুতি দরকার, তা জাতির অন্য অংশের মতো বুদ্ধিজীবীদের মধ্যেও অনুপস্থিত লক্ষ করে নিদারুণ শঙ্কিত এবং ক্ষুব্ধ হচ্ছেন তিনি। আহমদ ছফা রেনেসাঁ কামনা করছেন এই কারণে যে, কেবলমাত্র রেনেসাঁই পারবে জাতির সার্বিক মুক্তি এনে দিতে। ইউরোপে যে রেনেসাঁ হয়েছিল, তার হুবহু অনুকরণ এখানে হবে না জেনেও ছফা ইউরোপীয় রেনেসাঁকেই আদর্শ বা মডেল হিসেবে ধরে নিয়েছেন। তাঁর ভাষায়Ñ ‘একটি সমাজ যখন উপলব্ধি করতে সক্ষম হয় যে, তার প্রতিষ্ঠিত বিচার-আচার, সংস্কার, বিশ্বাস, রীতিনীতি, আইনকানুন, কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয় এবং সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলো বাস্তব জীবনের চাহিদা মেটাতে মোটেই সক্ষম হচ্ছে না, তখন সেই বিশেষ সমাজের বেঁচে থাকার তাগিদে জীবনকে সমৃদ্ধ এবং গরীয়ান করার প্রেরণায় সম্পূর্ণ নতুনভাবে, নয়া দৃষ্টিকোণ থেকে সবকিছু বিচার করতে হয়। নতুন চিন্তার অস্ত্রে সজ্জিত নতুন মানুষ জন্মগ্রহণ করে। তারা পুরনো সমাজের সামাজিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে ভেঙেচুরে নতুন যুগের প্রয়োজন মতো নতুনভাবে ঢালাই করে। মধ্যযুগের ইউরোপে এমনটি ঘটেছে।’
বাংলাদেশে সকল ধরনের প্রতিষ্ঠান যে সামাজিক দাবি মেটানোর অনুপযোগী তা নিয়ে সন্দেহের কোনো অবকাশ নাই। আহমদ ছফা তাই এগুলোকে নতুনভাবে বিন্যাসের কোনো বিকল্প দেখছেন না। বাংলাদেশের মানুষের স্বাধীনতা যুদ্ধে অংশগ্রহণ, আত্মত্যাগ এবং যুদ্ধজয়ের ক্ষমতা তাঁকে নতুনভাবে আশা জোগাচ্ছে যে একটি রেনেসাঁকে ধারণ করার যোগ্যতা বাংলাদেশের মানুষের রয়েছে। কিন্তু এই রেনেসাঁকে যাদের নেতৃত্ব দিতে হবে, সেই রাজনীতিবিদ এবং বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ছফার সংশয়। এই সংশয় বাস্তবও বটে। রাজনীতির সাথে সংস্কৃতির যোগসূত্র না থাকা যে আমাদের জাতিকে সবসময় পিছিয়ে রাখছে, এ সম্পর্কে ছফা স্বভাবসুলভ স্পষ্টতায় জানিয়ে দেন যেÑ ‘রাজনীতির উত্থান-পতনে, জয়পরাজয়ে সংস্কৃতির যে কোনো ভূমিকা থাকতে পারে রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের আদপেই সে ব্যাপারে কোনো ধারণা ছিল মনে হয় না। রাজনৈতিক দলগুলোর সাধারণ কর্মীদের সাংস্কৃতিক চেতনাহীনতা, ইতিহাস-ভূগোলের জ্ঞানের অভাবের দরুণ তাঁরা নেতৃমোহে তাড়িত হয়েছেন এবং নেতারা ডন কুইকসোটে পরিণত হয়েছিলেন। একটি সমাজে সর্বাঙ্গীন গতির নাম রাজনীতি এবং সংস্কৃতি রাজনীতির রস রক্ত, এই বোধে কোনো রাজনৈতিক দল কিংবা লোকমান্য নেতার মন সিঞ্চিত হয়েছে, তেমন কোনো দল বা ব্যক্তিত্বের নাম আজো জানা হয়নি।’ এর ফলাফল হিসেবে যা ঘটেছে তা হচ্ছে- ‘বাংলাদেশের রাজনৈতিক দল এবং নেতৃবৃন্দের দৃষ্টির সংকীর্ণতা ও দূরদর্শীতার অভাবের দরুণ ধীরে ধীরে সংস্কৃতি এবং রাজনীতি একে অপরের পরিপূরক না হয়ে দুটি আলাদা জলঅচল কুঠুরীতে পরিণত হলো। রাজনীতি হলো মানুষকে ফাঁকি দিয়ে ভোটে জেতা, ক্ষমতা দখলের অস্ত্র আর সংস্কৃতি সম্পূর্ণরূপে কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ের মাস্টারদের, উড়নচ-ী কবি-সাহিত্যিকদের বিলাসের, চিত্তবিনোদনের উপায় হয়ে দেখা দিলো।’
এখানে আহমদ ছফা অবিভক্ত ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির পরিচালিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম, আইপিটিএ, গণনাট্য স্কোয়াড, গণসঙ্গীত স্কোয়াডের কথা সম্ভবত ভুলে গিয়েছিলেন। তবে তারপরেও বলা চলে, কমিউনিস্ট পার্টির এই একক উদ্যোগ গোটা একটা জাতিকে উদ্বুদ্ধ করার মতো যথেষ্ট ছিল না। এই সাংস্কৃতিক মানহীনতার কারণেই ছফা খেদোক্তি করে বলেন- ‘আমাদের দেশের স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ে বিজ্ঞান পড়ানো হয়, কিন্তু বিজ্ঞানের প্রকৃত লক্ষ্য কি সে সম্পর্কে বিজ্ঞানের শিক্ষকরাই শেষ পর্যন্ত অনবহিত থেকে যান।’
বাঙালি বুদ্ধিজীবীদের প্রতি আহমদ ছফার অনাস্থার ঐতিহাসিক কারণ রয়েছে। এই ছোট পরিসরের বইতেই তিনি ইতিহাস ঘেঁটে সেই সব বুদ্ধিজীবীদের চরিত্র উন্মোচন করার চেষ্টা করেছেন। যারা রাষ্ট্রের সংস্কৃতি-সাহিত্যের ক্ষমতাশালী জায়গাগুলো দখল করে বসে থেকেছেন, কিন্তু জাতিকে পথ দেখানোর মতো কোনো সৃষ্টি উপহার দিতে চরমভাবে ব্যর্থ হয়েছেন। তারা ‘পত্রিকার রবিবাসরীয় সংখ্যার যোগানদার, রেডিও টেলিভিশনের অঙ্গসজ্জা এবং বিকৃত রুচিহীন নীরস পাঠ্যপুস্তক প্রণেতার অধিক কিছু নন।’ আজকের দিন হলে ছফা যোগ করতেন যে, এই বুদ্ধিজীবীরা হচ্ছেন টেলিভিশনের চ্যানেলগুলোর অগভীর টক-শো নামক আলোচনার ক্লাউন, পত্রিকার উপ-সম্পাদকীয় নামক চর্বিত চর্বনের জোগানদার, চ্যানেলের নাটক নামক নর-নারীর কিম্ভূত কার্যকলাপ দেখানোর স্ক্রিপ্ট লেখক, তুমি-আমি মার্কা সঙ্গীত নামক একঘেয়ে প্যানপ্যানানির লেখক। আহমদ ছফা সক্ষোভে পাকিস্তান আমলে তাদের কার্যকলাপের বিবরণ দিতে গিয়ে আইয়ুব খান প্রতিষ্ঠিত লেখক সংঘের উদাহরণ টেনে আনেন। ছফার ভাষায়Ñ ‘লেখক সংঘ মানে লেখকেরা কি ভাববেন, কি চিন্তা করবেন, কিভাবে লিখবেন জঙ্গীলাট ঠিক করে দেবেন। তিনি যা বলবেন- এঁরা তা লিখবেন। বিনিময়ে লেখকদের দেওয়া হলো অঢেল সুযোগ-সুবিধা। তাদের জন্য আদমজী পুরস্কার, ঘন ঘন বিদেশ যাওয়া ইত্যাদির ব্যবস্থা করলেন। সেদিন বাংলাদেশে একজন লেখকও লেখকের সুস্থ এবং স্বাধীন মননশীলতার বিরোধী এই প্রতিষ্ঠান স্থাপনের বিরুদ্ধে টু-শব্দটি করেননি। বরং সকলে বগল বাজিয়ে আপনা থেকেই এগিয়ে এসে অংশগ্রহণ করেছেন।’
একই সঙ্গে ঢাকার মার্কিন দূতাবাস থেকে মোটা টাকা সম্মানী দিয়ে প্রগতিবিরোধী রচনাসমূহ অনুবাদের যে মাস্টার প্ল্যান করা হয়েছিল, তাতেও এদেশের প্রথমসারির লেখক-বুদ্ধিজীবীরা হুমড়ি খেয়ে পড়েছিলেন। তাদের অনুবাদকর্ম যে জাতির মননের জন্য ভয়ানক ক্ষতির কারণ হয়ে দাঁড়াবে, সেকথা ভেবে তারা কেউই মোটা অংকের টাকার লোভ সামলাতে পারেননি।
আহমদ ছফার ক্ষোভ তীব্রতর হয়ে ওঠে যখন দেখেন যে সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে সেই একই বুদ্ধিজীবীরা রাষ্ট্রের বড় বড় আসনে অধিষ্ঠিত হচ্ছেন। স্বাধীনতার পরে যে দেশ সমাজতন্ত্র অভিমুখে যাত্রা করবে বলে দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা দিয়েছে, সেই দেশে চরিত্রহীন বুদ্ধিজীবীরা যে জাতিকে সমাজতন্ত্রের পথনির্দেশনা দিতে পারবে না, তা দুগ্ধপোষ্য শিশুও বুঝতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্রের পরিচালকরা বুঝতে পারে না। আসলে বুঝতে চায় না। কারণ তাদের শ্রেণীস্বার্থ এক।
তাহলে কীভাবে রেনেসাঁ আসবে? রেনেসাঁ মানে তো শুধু সাহিত্য নয়, শুধু রাজনীতি নয়, জ্ঞানের এবং চিন্তার সকল শাখায় উত্তুঙ্গ অভিযাত্রা। শিক্ষা ক্ষেত্রে, উচ্চশিক্ষা ক্ষেত্রে, বিজ্ঞানচর্চার ক্ষেত্রে, মননশীলতা চর্চার ক্ষেত্রে যে চিত্র দেখতে পেয়েছেন আহমদ ছফা তা খুবই হতাশাব্যঞ্জক। বিলেত-আমেরিকা ফেরত ডিগ্রিধারীদের সংখ্যা বাড়ছে, কিন্তু সেইসব ডিগ্রিধারীরা সমাজের সম্পদ না হয়ে সমাজের বোঝা হয়ে দাঁড়াচ্ছেন। তারা তিন বা চার বছর উচ্চশিক্ষার্থে বিলেতে অবস্থান করে যে গবেষণাপত্র প্রণয়ন করছেন, শাহবাগের পাবলিক লাইব্রেরিতে বসে তিনমাসের মধ্যে সেই গবেষণাপত্র তৈরি করা সম্ভব। তার মানে, উচ্চতর বিদ্যার্থীরা জ্ঞানচর্চা নয়, বিদেশি ডিগ্রির জন্য এবং বিদেশে অবস্থানের জন্য লালায়িত।
এই রকম হতাশাজনক পরিস্থিতিতে মানুষ কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে পড়ে। কিন্তু এই বিমূঢ় স্তব্ধতার বিরুদ্ধেও আহমদ ছফা সোচ্চার। ‘যাঁরা সত্য স্বাধীনতার পূজারী, যাঁরা মানুষকে ভালোবাসেন, যাঁরা নিজের দেশ, জাতি এবং দেশের মানুষকে ভালোবাসেন, তারাও কিছুটা ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে গেছেন। কারণ কোনটা ন্যায়, কোনটা অন্যায় এ সময়ে চেনা অনেক কঠিন। তাই ভালো কথা বললেও তার প্রতিক্রিয়া খারাপ হবে মনে করে চুপ থাকা শ্রেয় মনে করছেন। এঁরা প্রকারান্তরে এই নৈরাজ্যের শক্তির কাছেই আত্মসমর্পণ করছেন। তাঁদের মনোভাব মারাত্মক। কেননা, রোগ যখন প্রবল, জোরালো ওষুধের প্রয়োজন তখন বেশি। যখন পারিপার্শ্বিকতার কারণে স্থির চিন্তা করা একরকম অসম্ভব, তখনই স্থির চিন্তা করার সময়। নৌকা যখন ঝড়ে পড়ে, তখনই দৃঢ়ভাবে হাল ধরে ঠা-া মাথায় তীর লক্ষ্য করে বাইতে হয়। নচেত যে বিপদের মধ্যে তরী দুলছে, সে বিপদেই গ্রাসিত হবার সম্ভাবনা অত্যাধিক।’
আমরা যখন এই দেশ নষ্টদের অধিকারে চলে গেছে বলে হতাশায় মুহ্যমান, আহমদ ছফা মনে করিয়ে দেনÑ তখনই অর্থাৎ এখনই, নষ্টদের বিরুদ্ধে আমাদের বিদ্রোহ করার সময়।

Disconnect