ফনেটিক ইউনিজয়
মহাপণ্ডিত রাহুল সাংকৃত্যায়ন স্মরণে
আমজাদ হোসেন

বাংলাদেশের শিক্ষিত পরিমণ্ডলে রাহুল সাংকৃতায়নের নাম খুব অল্প লোকই জানেন। এই বিশ্বখ্যাত মণীষীর পাণ্ডিত্য সম্পর্কে আমরা খুবই কম অবগত আছি। বাংলাদেশে তাকে নিয়ে লেখালেখি হয়েছে তুলনামূলকভাবে খুবই কম।
এই মহান মণীষীর জন্মবৃত্তান্ত অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত পরিসরে তুলে ধরছি।
১৮৯৩ সনের ৯ এপ্রিল ভারতের উত্তর প্রদেশের আজমগড় জেলার পন্দহা গ্রামে কেদারনাথ পাণ্ডে (রাহুল সাংকৃতায়নের) জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পৈত্রিক গ্রাম পন্দহা থেকে মাইল দশেক দূরে। তিনি নানাবাড়িতে জন্ম নেন। পিতার নাম গোবর্ধন পাণ্ডে। ১৯০৫ সনে তাঁকে স্কুলে পাঠানো হয়। ১৯০৮ সালে তিনি দু’বার পালিয়ে কলিকাতায় আসেন। ১৯১০ সালে তিনি গঙ্গোত্রী, যমুনেত্রী, হরিদ্বার, অযোধ্যা ভ্রমণ করেন। দেশ ভ্রমণের নেশা ও বৈরাগ্যের ভূত তাঁকে পেয়ে বসে। তিনি ৮ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করে পড়ালেখার সমাপ্তি ঘটান। ১৯১২-১৩ সনে তিনি ছাপরা জেলার পরসা মঠের মোহন্তের উত্তরাধিকারী হন। তিনি হন বৈরাগী সাধু, তাঁর নাম হয় রামউদার দাস। তিনি দেশ ভ্রমণে বের হন। ভারতে বহু দর্শনীয় স্থান তিনি দেখেন। ১৯১৫ সনের দিকে তিনি উর্দু পত্রিকায় ভ্রমণ কাহিনী লিখতে শুরু করেন।
উল্লেখ্য যে, তার মাতৃভাষা ভোজপুরী। ইতোমধ্যে তিনি অন্যান্য ভাষাসহ বাংলাভাষাও শিখে নেন। সর্বমোট তিনি ৩৬টি ভাষা জানতেন। তিনি অসহযোগ আন্দোলনে যোগ দেন। শ্রীলংকা বিদ্যালঙ্কার পরিবেণে (বিশ্ববিদ্যালয়) তিনি অধ্যপনা করতে যান। এখানে তিনি সংস্কৃত, পালি ও বৌদ্ধ সাহিত্য অধ্যয়ন করেন। এখানে তিনি ত্রিপিটকার্য উপাধী প্রাপ্ত হন। তিনি বৌদ্ধ ধর্ম গ্রহণ করেন। তাঁর নাম হয় রাহুল সাংকৃতায়ন। ১৯২৯-৩০ সনে তিনি প্রথম নেপাল ও তিব্বতে যান। তার উদ্দেশ্য ছিল, যে সব ধর্ম ও দর্শন শাস্ত্র ভারত থেকে লুপ্ত হয়ে গেছে তা খুঁজে ভারতে নিয়ে আসা। ১৯৩৬ সনে তিনি তৃতীয় বার তিব্বতে যান এবং বহু লুপ্ত গ্রন্থ পুনরুদ্ধার করে ভারতে নিয়ে আসেন। ১৯৩৮ সনে তিনি চতুর্থবার তিব্বতে যান। বহু পুস্তক তিনি সংগ্রহ করে আনেন। উদ্ধার করা গ্রন্থের সংগ্রহ দেখে ভারত ও বিশ্বের ভারততত্ত¡িবদেরা অবাক হয়ে যান। তাকে কাশী থেকে মহাপ-িত উপাধি দেওয়া হয়। তিনি এক সময়ে কৃষক আন্দোলনে যোগ দেন এবং কংগ্রেসেও যোগদান করেন। পরে ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হিসাবে ছিলেন জীবনের শেষ পর্যন্ত। ১৯৬৩ সনের ১৪ এপ্রিল এই মহান মণীষীর মহাপ্রয়াণ ঘটে।
রাহুলজী ৬ টি ভাষাতে প্রবন্ধ ও গ্রন্থ রচনা করেছেন। তা হল: উর্দু, হিন্দি, সংস্কৃত, ভোজপুরী, তিব্বতী ও সিংহলী। তাঁর লিখিত, অনুদৃত, সম্পাদিত ও সংকলিত গ্রন্থের সংখ্যা প্রায় ২০০ বলে উল্লেখ করা হয়। তিনি হিন্দি সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছেন। তাঁর ভাষাশৈলী একান্তই নিজস্ব পদ্ধতির। তিনি হিন্দি ভাষার প্রথম ভ্রমণ সাহিত্য রচয়িতা। তিনি সংস্কৃত, পালি, রুশ, মারাঠী, গুজরাঠী, বাংলা, উর্দু, সিংহলী, তিব্বতী, জার্মান, চীনা ভাষাসহ ৩৬টি ভাষা জানতেন।
৯ এপ্রিল তাঁর জন্মদিন। আর ১৪ এপ্রিল তাঁর মৃত্যু দিবস।
প্রত্যেক শিক্ষিত বাঙালির উচিত তাঁকে স্মরণ করা।
লেখক : রাজনীতিবিদ

Disconnect