ফনেটিক ইউনিজয়
র‌্যাঁবো: কবিতার ফিনিক্স পাখি
ড. সফিউদ্দিন আহমদ

র‌্যাঁবো ও র‌্যাঁবোর কাব্য-দর্শন আমি ভালো করে বুঝেছি, এমন বলার সাহস আমার নেই- তবে এতোটুকু বলতে পারি যে, মননে ও দর্শনে এবং কাব্য চর্চায় র‌্যাঁবো পঞ্চ ইন্দ্রিয়ের বাঁদনের সীমাবদ্ধতা হতে মুক্ত হবার জন্য দুরন্ত ব্যাকুলতা প্রকাশ করেছে। এমনকি তার নিজের কবিতার অধিনায়কত্বেও সে বশ মানেনি। শেষ জীবনে সার্ত্রে যেমন মার্কসিজমে আস্থা হারিয়ে বলেছিলেন- ‘এখানে স্বাধীনতা নেই- আমি চাই স্বেচ্ছা, একবারে স্বেচ্ছা ও স্বতঃস্ফূর্ততা’।
র‌্যাঁবো বারবারই বলেছে যে, পঞ্চ-ইন্দ্রিয়ের বাঁধনে বন্দি মানুষের জানাটা অতীব সীমিত এবং অজ্ঞ ও অন্ধের জানা। এই বৃত্ত থেকে একবার মুক্ত হতে পারলে তবেই মানুষ পঞ্চ-ইন্দ্রিয় বহির্ভূত অজানা, অচেনা, অসীম, অনন্ত আরো একটি জগৎকে জানতে পারবে এবং তখন সে নিজেই উপলব্ধি করবে যে, সে অসীম, অনন্ত ও প্রচণ্ড অলৌকিক সত্ত্বায় শক্তিমান আর তখনই সে ছুতে পারবে, অসীম-অনন্ত, বিশাল ও ব্যাপক অন্য আরো একটি জগৎ ও সত্ত্বাকে।
আমার ধারণা র‌্যাঁবো শুধু ফরাসি সাহিত্যে নয়- কাব্যে প্রতীকীয় নান্দনিকতায় র‌্যাঁবো সমগ্র বিশ্বেই কবিতার ফিনিক্স পাখি। সমকালে র‌্যাঁবো ছিল আলোড়িত, ধিকৃত, নিন্দিত ও সমাজচ্যুত কবি। শুধু তাই নয়, সেদিনকার নিন্দা ও কুৎসার পঙ্কে নিমজ্জিত র‌্যাঁবো আজ সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে নন্দিত, বন্দিত, প্রশংসার উজ্জ্বল আলোকে উদ্ভাসিত এবং নব মূল্যায়নের মুখর আলোচনায় উচ্ছ্বসিত। সমগ্র বিশ্বসাহিত্যে র্যাঁবোর তুলনা নেই- এবং র‌্যাঁবোই একমাত্র র‌্যাঁবোর তুলনা। র‌্যাঁবো আজ কবিতার দেবতার আসনে অধিষ্ঠিত এবং কবিতার ফিনিক্স। আরো বলা যায়, সে আজ কবিতার এক আলোক দূত। র‌্যাঁবোর কাব্য সাধনা মাত্র চার বছর (১৬ থেকে ১৯ বছর)। সে সময়ের বিখ্যাত ও আলোচিত কবি হলেন প্রতীকীবাদের উদ্গাতা জাঁ মারিয়া এবং এছাড়াও বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন ও লাফর্গ। মালার্মে র‌্যাঁবোর চেয়ে বারো বছরের এবং ভর্লেন দশ বছরের বড়ো আর লাফর্গ ছোট দু’বছরের।
সেদিনকার প্যারির বিখ্যাত কবি, সাহিত্যিক, শিল্পী ও বিদ্বৎজন অবাক বিস্ময়ে চকিত হয়ে ভাবতো যে, এই প্রাপ্ত বয়স্কও কিশোর-ছোকরা মাত্র চার বছরে এমন কী লিখেছে যে, একে ও তার লেখা নিয়ে এতো তোলপাড় হতে পারে! বিস্ময়ের বিষয় এই অপ্রাপ্ত বয়সের কিশোর শুধু প্যারিতেই নয়- সমগ্র বিশ্বসাহিত্যেই আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। আজ শুধু বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন ও লাফর্গ নয়- যে কোনো বড়ো কবির চেয়েও শতগুণ বেশি আলোচনা হচ্ছে র‌্যাঁবোকে নিয়ে এবং আমার তো ধারণা, কিশোর র‌্যাঁবোর জীবন জিজ্ঞাসা ও জীবন পিপাসা এবং আকাশস্পর্শী কাব্য চৈতন্য ছায়ালোকের ভেতর প্রচ্ছাদিত প্রতীকী প্রহেলিকার পর্দা কোনো দিনই কেউ উন্মোচন করতে পারবে না। যেমন পারে না মোনালিসার হাসির রহস্য উন্মোচন করতে।
র‌্যাঁবো যেমন তার আঙ্গুল দিয়ে প্রতীকীর সেঁতু বেয়ে Absolute কে (অসীম ও অনন্ত) ছুতে চেয়েছে, তেমনি তাবৎ বিশ্বেও নন্দনতত্ত্ববিদ ও গবেষক এবং আলোচকেরাও র‌্যাঁবোর প্রতীকীয়তার প্রহেলিকার সমাধান করতে চেয়েছেন কিন্তু বুঝতে পারছেন না, কী ছুতে চেয়েছে, কী ধরতে চেয়েছে র‌্যাঁবো। তীক্ষ্ণ টানা দু’টি জিজ্ঞাসু চোখ দিয়ে এবং তার হৃদয় ও মন দিয়ে ইন্দ্রিয়ের প্রাকার ভেঙে সমগ্র বিশ্বকে, মহাকাশকে, নক্ষত্রলোককে, অনন্ত অসীমকে ছেকে নিতে চেয়েছে র‌্যাঁবো। এ বিষয়ে র‌্যাঁবো আজ পর্যন্তও অজেয়, অনতিক্রম্য ও অধরা। আর এ নিয়ে ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণ করে কেউ কুল কিনারাও পাচ্ছে না। এ জন্যই র‌্যাঁবো ব্যাখ্যা ও বিশ্লেষণের উর্ধ্বে। র্যাঁবো সমস্ত দুনিয়াটাকে ছেঁকে এনে নান্দনিক বিভার ঐশ্বর্যে কালোত্তীর্ণ, মনোত্তীর্ণ ও শিল্পোত্তীর্ণ আবেদনে কবিতাকে প্রতীকীয়তায় বাণীরূপ দিয়েছে। এজন্যই র্যাঁবো শুধু অনুভবে ও উপলব্ধিতে। অনেকেই হয়তো আঙ্গুল দিয়ে আকাশ ছোঁয়ার কল্পনা করতে পারে কিন্তু র্যাঁবোর প্রতীকীয়তা ও কবিতার বাণীকে ছোঁয়া কল্পনাও করতে পারে না।
অনেকেই হয়তো বলবে র্যাঁবো কী চায়? তবে র‌্যাঁবো নিজেই বলেছে- ‘আমি ভালোবাসি মরুভূমি, শুকিয়ে যাওয়া ফলের বাগিচা, বিবর্ণ ম্লান দোকান, ঠাণ্ডা হয়ে আসা পানীয়। নিজেকে টেনে নিয়ে যাবো পচা দুর্গন্ধের অলিগলি দিয়ে বন্ধ আঁখির কাছে, উৎসর্গ করবো সূর্যের চরণে, আগুনের যিনি দেবতা’। র‌্যাঁবোর কারো কাছে কোনো চাওয়া পাওয়ার আকাঙ্খা ছিল না। সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় মর্যাদা-এমনও কিছু সে চায় নি। বলতে গেলে বাবা-মা, বন্ধু-বান্ধব, প্রেম-ভালোবাসা কোনো কিছুই তার প্রত্যাশা ছিল না। থাকা-খাওয়া পোশাক সব কিছুতেই ছিল নিস্পৃহ ও নির্লিপ্ত মানসিকতা। আভিজাত্য ও সামাজিক মর্যাদা বা প্রতিষ্ঠার কোনো মোহও তার ছিল না।
কুলি, জেলে, মেথর-মুচি, চাষা-ভূষা বা পতিতজন কোনো কিছুতেই তার আপত্তি নেই। কিন্তু সে শুধু চেয়েছে তার লম্বা লক লকে আঙুল দিয়ে অসীম- অনন্তকে ছুঁতে। ধরতে চেয়েছে অধরাকে। তার যাত্রা ছিল অশ্রান্ত ও অনন্ত যাত্রা। হাজার বছর ধরে হেঁটেছে, বিরামহীন এ যাত্রা- এ পথ না ফুরোলেও তার আপত্তি নেই। বংশ গৌরব বা রক্তের অভিজাত্য নিয়েও তার কোনো গর্ব বা অহংকার ছিল না।
‘দূষিত রক্তে’ র্যাঁবো নিজেই বলেছে, পূর্বপুরুষ ছিল গল...। আমার পোশাক পরিচ্ছদেও একই বর্বরতা। ...তাদের কাছে থেকেই পেয়েছি পৌত্তলিকা, মহানকে অসম্মান করার মতো প্রবৃত্তির মত্ততা- শাসকই হোক, শ্রমিকই হোক, সবাই চাষা, সবাই নীচ, হীনকুলোদ্ভব। লাঙ্গল ধরে যে হাত তার থেকে কম নয় যে হাত লেখনী ছোঁয়। সকল কৌলিন্য বর্জিত কুল আমার, স্পষ্ট সে-কথা। পৌত্তালিক সেই রক্ত আবার সেই ফিরে এলো- আত্মা হাতের কাছে: কেন খ্রিস্ট আমায় টেনে তুলবেন না। দেবেন না আমার মনকে সেই নম্রতা, স্বাধীনতা, ধর্মশাস্ত্রেও যুগ চলে গেছে- হায় ধর্ম, হায়রে ধর্মশাস্ত্র! ভগবানের জন্য ক্ষুধিত আমার প্রতীক্ষা, সকল অনন্তকাল ধরে নীচকুলোদ্ভব আমি।
দাঁড়িয়ে আছি আমরিকার সমুদ্র তীরে। ....ফুটন্ত ধাতুর মতো তীব্র তিক্ত সুরাপান করবো। যেমন করতাম প্রিয় প্রপিতামহরা আগুনের ধারে বসে।
যখন আসাটা ফিরে আসবো লোহার মতো শরীর নিয়ে কৃষ্ণ চর্ম নিয়ে, চোখ জ্বলবে উন্মত্তের মতো। চোখ দেখেই লোকে বলবে বলিষ্ঠ হাত। ভয়ানক তৃষ্ণা পাবে আমার, হবো পাশবিক। আমি আজ অভিশপ্ত, স্বদেশকে ভয় করি বাঘের মতো। সবচেয়ে সুন্দর হলো যা, তা হচ্ছে মাতাল ঘুমে আচ্ছন্ন হওয়া বিস্তীর্ণ বালুকা তটে। ধরি পথ নতুন করে, যে পথ আমার পাপের বঞ্চনায় ভারাতুর। বোঝবার বয়স হতেই সেই পাপের পীড়ন মুখর শিকড়গুলো বুক পর্যন্ত ঠেলে উঠেছে, উঠেই চলেছে আকাশের দিকে আমাকে ধাক্কা মেরে, উল্টে ফেলে, কখনো বা হিঁচড়ে হিঁচড়ে টেনে।
যখন খুব ছোটো, ভালো লাগতো এক দুর্ধর্ষ কয়েদীর কল্পনা- কারাগারের দ্বার যাকে উন্মুক্ত করে দিলো না কোনোদিন। ঘুরে বেড়িয়েছি সেই সব নাম না জানা সরাই আর পান্থশালায় তার ক্ষণ্ন অবস্থিতিতে একদিন যা ধন্য হয়েছে- তার দৃষ্টি দেখেছি আকাশের নীল প্রান্তরে, মুকুলিত শ্রমের বিস্তার, তার নিয়তির গন্ধ পেয়েছি শহরে-শহরে। তার যতো শক্তি ছিল, তা কোনো তপস্বীরও নেই, তার মতো সুবুদ্ধি কোনো ভ্রাম্যমাণের- সে, শুধু সে-ই একমাত্র তুলনা তার মহিমার, তার অবৈকল্যের। শীতের রাত্রির পথ, তার উপর দিয়ে গৃহহীন, বস্ত্রহীন, অন্নহীন করে স্বর আমার তুহিন শীতল হৃদয়কে আঁকড়ে ধরে চেচিয়ে ওঠে’।
র্যাঁবোর কবিতা পড়লেই বুঝা যায়- এ বড় সহজ বিষয় নয়। তার কবিতার ভাব বিষয় এবং অর্থ মনে হয় যেন আকাশেরও অনেক উপরে, নক্ষত্রলোক আর মিল্কওয়ে থেকে মিল্কওয়ে, এক কথায় মহাবৈশ্বিক চেতনায় প্রসারিত ও বিস্তারিত। তাই র‌্যাঁবোর কবিতার অর্থ খুঁজে বের করা সহজ বিষয় নয়।
বিস্ময়ের বিষয় মানুষ যদিও জেনেছে এবং দেখেছে মানবাত্মা ও মানবহৃদয় এক ভয়াবহ অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত এবং আরো অবলোকন করছে যে, বিদীর্ণ আত্মার এ জ্বলন্ত অগ্নিকুণ্ডে মৃত্যুও প্রত্যক্ষতা। কিন্তু অস্তিত্ববাদী ও সৃজনশীল মানুষ এই ভয়াবহ অন্ধকার ও নানা যন্ত্রনা এবং হৃদয়ের রক্তক্ষরণ ও অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত আত্মার আর্তনাদ শুনেই থেমে যাবে কেন? তাই নিজের অস্তিত্ব, সৃজনশীলতা, প্রাণ প্রবাহের গতি ও অস্তিত্বকে প্রমাণ করার জন্য এই অগ্নি গহ্বরেই নেমেছেন জাঁ রাসেন, বোদলেয়ার, মালার্মে ও ভর্লেন এবং কবিতার মহান দেবতা জাঁ আর্তুর র‌্যাঁবো।
তারা দেখেছেন আঘাতে আঘাতে জেগে ওঠবে জীবন, অরুনিমার আভা নিয়ে ফুটবে জীবনের ফুল। পাঁক, অন্ধকার ও বীভৎস কদর্যতায়ই ফুটবে সৌন্দর্যেও ঐশ্বর্য।
প্রতীক চর্চায় বোদলেয়ার, মালার্মে, ভর্লেন এদের মধ্যে র্যাঁবো ছিল তীক্ষ্ণ ও প্রখর। পথে পথে ঘুরেছে মুক্ত পথের পথিক হয়ে। যেমনি জীবনে, তেমনি সাহিত্যে, শিল্পে ও সংস্কৃতির ক্ষেত্রেও মাতাল হয়ে ঘুরেছে র‌্যাঁবো। তার ‘মাতাল তরণী’ পড়লেই র‌্যাঁবোর এ মানসিকতার সাথে পরিচিত হওয়া যাবে।
র‌্যাঁবো ছিল সর্বক্ষেত্রেই বিদ্রোহী। বিশেষত প্রতীকের বিদ্রোহী, তীক্ষ্ণ বুদ্ধি ও সূক্ষ্ণ চিন্তার প্রয়াসী। র্যাঁবো খোলা রাস্তায় মহাঝড়ের ন্যায় ছুটাছুটি করে দেখেছে এ জগতকে।
র‌্যাঁবো সিম্বলিস্ট বা প্রতীকবাদী কবি। এই সিম্বল বা প্রতীকের কথা ভাবতে গেলেই আমাদের স্মরণে আসবে জাঁ রাসেন, বোদলেয়ার, মালার্মে ও ভর্লেন। এর আগে অবশ্যি আরো দু’জনের ক্ষীণ আভাস আসবে তারা হলেন সুলিপ্রুধোম ও মিস্ত্রাল। তবে আমাদের এর প্রথম পথিকৃৎ জাঁ মারিয়াকেও কৃতজ্ঞতার সাথে স্মরণ করতে হবে।
র‌্যাবোর জন্ম ফ্রান্সের এক প্রান্তিক শহরে। এই ছোট্ট শহরটির নাম শার্লভিল। জন্ম তারিখ ২০ অক্টোবর, ১৮৫৪ খ্রিস্টাব্দ। তাঁর পুরো নাম জাঁ নিকোলাস আর্তু র‌্যাঁবো। বাবা ফ্রেডেরিক র‌্যাঁবো ছিলেন ফরাসি সেনাদলের ক্যাপ্টেন। বাবার সাথে মা’র সম্পর্ক ছিল খুবই অস্বস্তিকর। র‌্যাঁবোর বয়স তখন দু’বছর- মা ও বাবার মধ্যে চিরতরে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়- এবং মা’র কাছেই র‌্যাঁবো বড়ো হয়েছে। এক বিচিত্র জীবন র‌্যাঁবোর। ছোট্ট শহর শার্লভিলে তাদের বাড়ির নিচেই বিরাট এক লাইব্রেরি। দুনিয়ার যতোসব বই এখানে। দিনরাত এখানেই বসে বসে হরেক রকমের বই পড়তো র‌্যাঁবো। তার দুটি মহাদূরবীক্ষণের ন্যায় চোখ দিয়ে যা দেখতো তাই হৃদয়ে এবং মস্তিষ্কে ধারণ করতো। ধারণ করার ক্ষমতা ছিল আলৌকিক। বইয়ের পাতায় চোখ ফেললেই তার পড়া হয়ে যেতো- গেঁথে যেতো হৃদয় ও মস্তিষ্কে- ভুলতো না কখনো, দ্বিতীয়বার পড়ার প্রয়োজনও হতো না। র্যাঁবো ছিল এক আগ্রাসী পড়–য়া- যা পেতো গোগ্রাসে পড়তো আর এই পড়াকে আত্মীকরণ করে ফেলতো সহজে। বিস্ময়ের বিষয় স্কুলজীবনেই র্যাঁবো পড়েছে ফেনিমোর কুপার, গুস্তাব আইমোর, জুলেভার্নে, পড়েছেন অসংখ্য ভ্রমণ কাহিনী এবং পড়েছেন হেগেল ও সোয়েডনবর্গের দর্শন। সুলি প্রুধোম আর মিন্ত্রাল পড়েছে ফ্রান্সের লোককাহিনী এবং ইতিহাস ও সাহিত্য গভীর জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মজিজ্ঞাসা নিয়ে। প্রাচ্য বিশ্লেষণ করে ভারতীয় ধর্ম ও ধর্মগ্রন্থ, দর্শন, ধর্ম প্রচারক এবং দেব-দেবী ও দেবালয় সম্বন্ধে র্যাঁবো অনবহিত ছিল এমন বলা যায় না কারণ তার লেখাতেই এ সবের উল্লেখ আছে এবং পড়াশুনার ছাপও আছে। পড়াশুনায় এই গভীর আগ্রহ ও অনুসন্ধিৎসা এবং জীবন জিজ্ঞাসা ও আত্মা জিজ্ঞাসার তাড়ানায়ই র‌্যাঁবো হয়ে ওঠেছে বিদ্রোহী, তার চোখে ধরা পড়েছে সমাজের ভণ্ডামি, অসংগতি ও ক্লোদ ক্লিন্নতা এবং মেকিত্ব। তাই র‌্যাঁবোর তীক্ষ্ম উচ্চারণ- ‘আমি যে দেখেছি সমুদ্র বহ্নিমান, ধোঁয়া ছুটেছে আকাশে, ডাইনে-বাঁয়ে রত্মাভান্ডারে জ্বলজ্বল করে কোটি কোটি বজ্রাগ্নিতে। সুরাপান নিষিদ্ধ আমার- মেয়েদের সঙ্গে বন্ধুত্বও চলবে না। এমন কি স্ঙ্গীও হতে পারবে না কেউ।
পুরুত মশাই, শুরু মশাই, প্রভু মশাই, কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়ে আমায় কী ভুলই করলে তোমরা। এ দলের আমি নইগো, নইগো নই- কোনোদিন খ্রিস্টানও ছিলাম না আমি, থাকবোও না কোনোদিন- যে কুলে জন্ম আমার সে গান গেয়ে ওঠে যখনই দুঃখ পায়। আইন বুঝি না, নীতিজ্ঞান শূন্য আমি এক পশু। ভুল করেছো তোমরা।
প্রচলিত সমাজ ও দর্শন আইন ও শাসন ধর্মবোধ ও নীতিশান্ত্র এবং যৌনাচার- যাজকের ভণ্ডামি, প্রথাবদ্ধতার গোড়ামি এবং অন্ধবিশ্বাস ও উপদেশ এ সবের প্রতি ছিল তার বিবমিষা ও বিদ্রোহ। তাই র‌্যাঁবো নিজেই বলেছে। ‘নিজকে সইয়ে নিয়েছি সরল মতিভ্রমে- সত্যি দেখেছি আমি কারখানার জায়গায় মসজিদ, দেবদূতের পরিচালনায় যন্ত্র-সংগীতের বিদ্যালয়, আকাশপথে শকটের মিছিল, হৃদয়ের গভীরে বৈঠকখানা, কত যে দৈত্য, কতো রহস্য! কী এক প্রহসনের নাম চোখে বিভীষিকা ঘনিয়ে তুলেছে। এছাড়া শব্দের ছায়াবাজিতে বুঝিয়েছি যতো কূটতর্ক। অবশেষে আমার চেতনায় এই বিশৃঙ্খলার মধ্যে খুঁজে পেলাম পবিত্রকে। তৃষ্ণায় ছটফট করেছি, আক্রান্ত হয়েছি প্রবল জ্বরে- ঈর্ষা করেছি পশুর সুখ, শুয়োপোকার নিরাপরাধ বিস্মৃতিলোক, গন্ধমূষিকের কৌমার্যময় তন্দ্রা। তিক্ততায় ছেয়ে গেলো আমার চরিত্র কয়েকটা গাঁথার মতো কবিতায় পৃথিবীকে বিদায় জানালাম’। এই বিদ্রোহের প্রতিম্বিকতায়ই সে হতে চেয়েছে প্রচলিত বৃত্ত ভাঙার দার্শনিক, তাকে হতে হবে দৈহিক যন্ত্রনার এক নরককুণ্ড, জীবনে থাকবে অভিশপ্ত আত্মার অগ্নিদহন আর এ সবকে প্রকাশ করার জন্য তাকে হতে হবে নান্দনিক ঐশ্বর্যের বিভায় উজ্জ্বল আলোকিত এক কবি। প্রারম্ভিক কৈশোরেই গুরুমশায়ের সাথে ক্লাসে লেগে যেত ঠুকাঠুকি। দুনিয়ার তাবৎ বই পড়ে তখনেই র্যাঁবো হয়ে ওঠেছিল এক চলন্ত অভিধান, গুরুমশায়ের ছাঁচে গড়া কথায় তার মন পুরতো না- তাই রক্ত চক্ষুর অগ্নিবাণ নিক্ষেপ হতো তার ওপর। পড়াশুনায় এই তীক্ষ্ণতার জন্যই শুধু গুরুমশায় নয় বড়ো বড়ো পণ্ডিতদের চেয়েও এগিয়ে গিয়েছিল র‌্যাঁবো- এবং দেখলো সবই ফাঁকি, প্রহেলিকা, মিথ্যে ও ভণ্ডামি কৃত্রিমতার মুখোশ পরে সেজেছে জ্ঞানী, গুণী ও পণ্ডিত। এ সব দেখে শৈশবেই র‌্যাঁবো হয়ে ওঠলো প্রতিবাদী দার্শনিক, নন্দন-লোকের নতুন নান্দনিক, শিল্পকলার প্রচলিত বৃত্ত ভেঙে হাঁটলো খোলা উন্মুক্ত উদার প্রান্তরে। তছনছ করে দিয়েছে কাঠামোগত বিশেষ নান্দনিক জগতের প্রাচীর।
তাই র‌্যাঁবো বলেছে- ‘মন থেকে মানুষী আশার সমস্ত মুকুল নির্মূল করে দিলাম। হিংস্র পশুর মতো চতুর উল্লম্ফনে গলা টিপে ধরলাম প্রতিটি আনন্দের। ডাকলাম জল্লাদদের, মরবার আগে তাদের খাঁড়ার বাঁট কামড়ে ধরবো বলে- জড়ো করলাম জাঁতার কল, তারা যেন দলে পিষে গুড়িয়ে দিতে পারে আমায় বালুর সঙ্গে, রক্তের সঙ্গে। দুঃখই হলো ভগবান। কাদার মধ্যে বিছিয়ে দিলাম নিজেকে- পাপের হাওয়ায় হাওয়ায় শুকনো হলাম, পাগলামির পাকে- পাকে চক্কর খেলাম চমৎকার।
আর বসন্ত এনে দিলো আমার নির্বোধের বীভৎস এক হাসি’।
শার্লভিলে প্রথম জীবনে মায়ের কাছেই তার পাঠ। মা ছিলেন কাব্য পিপাসু। মায়ের কাছেই কাব্য চর্চার ও অনুপ্রেরণা। এ সময় তার জীবনে ঘটে গেছে একটি অনন্য ঘটনা। র্যাঁবো তখন মাত্র তেরো বছরের এক দুরন্ত কিশোর। ছোট্ট ও প্রান্তিক শহর শার্লভিতে ফ্রান্সের যুবরাজের আগমন উপলক্ষে তাকে অভিনন্দন জানালো লাতিন ভাষায় রচিত ষাট লাইনের এক কবিতায়। এই কবিতার মাধ্যমে অনেকের সাথে পরিচিত হলো র্যাঁবো এবং যুবরাজের সাথে নিজেও নন্দিত হলো এক প্রতিশ্রুতিবান কিশোর কবি হিসেবে। এবার র্যাঁবোর সামনে উন্মোচিত হলো আর এক নতুন জগৎ। আরো তিনটি কবিতা লিখে প্রতিযোগিতায় অংশগ্রহণ করে তিনি প্রথম পুরস্কার পান। তিনি ১৮৭০ সালে La Revue Pour Tous পত্রিকায় প্রকাশিত হয়। কবিতাটির রচনাকালে ১৮৬৯ সাল এবং এর শিরোনাম Les Etrennes des orphelins. র‌্যাবোর পড়াশুনা ছিল বহুমাত্রিক। ক্ষুধার্ত গরু, পাখি যেমন সামনে যা পায় তাই বাছ বিচার না করে শুধু গ্রাস করতে থাকে র‌্যাঁবোর অবস্থাও তাই- যে সব বই সামনে পেতো তাই পড়তো। তবে পড়ার কোনো বিরাম ছিল না কখনো।
দুঃখ-বেদনায় ভরা তিক্ত অভিজ্ঞতার এক বিচিত্র রক্তক্ষরিত জীবন ছিল র‌্যাঁবোর। রেললাইনে হেঁটে যাওয়া বা প্রথাবদ্ধ ছকে আটকানো জীবন তার ছিল না। এক দুরন্ত বাধা বন্ধনহারা নোঙর ছেড়া উন্মুক্ত জীবন আর উন্মুক্ত মাঠেই সে মুক্তি খুঁজেছে। তার স্কুলের শিক্ষকদের সাথেও মানসিকতায় জটিলতা দেখা দিয়েছিল বার বার। তাই র্যাঁবো বলেছে- ‘বহুদিনের গর্ব আমার, সম্ভব-অসম্ভব সমস্ত নিসর্গ শোভার ওপরই আছে আমার দখল আধুনিক কাব্য ও চিত্রকলার গগণস্পর্শী খ্যাতির আড়ালে জেনেছি তার চূড়ান্ত অসারতা। আমাকে টানে অর্থহীন ছবি, দরজার ওপর দিকটা, সাজ-সজ্জা, ক্রীড়কের পট, বিজ্ঞাপন ফলক, লোকশিল্পের রং চং সেকেলে সাহিত্য, গির্জার ল্যাটিন, বানান ভুলে ভর্তি আদিরসের বই, প্রাগৈতিহাসিক কাহিনী, রূপকথা, শৈশবের ছোট বই, পুরোনো গীতিনাট্য, সরল অস্থায়ী অমার্জিত ছন্দ।
এরই মধ্যে র্যাঁবো বেশ অনেকগুলো কবিতা লিখে ফেললো। প্যারি যাওয়া, আরো কবিতা রচনা ও প্রখ্যাত কবিদের সাথে দেখা করা এবং পরিচিত হওয়া এ ভাবনা যেন র‌্যাঁবোকে উন্মাদ করে তুলেছে-
এ সময়েই প্যারির বড়ো বড়ো কবির সাথে র্যাঁবো চিঠির মাধ্যমে যোগাযোগও করলো এবং কয়েকটি কবিতাও পাঠিয়ে দিলো। কিন্তু কোথাও কোনো কবিতা প্রকাশিত হয়নি, তবে কেউ কেউ তাকে প্যারিস চলে আসার জন্য পরামর্শ দিয়েছে। র‌্যাঁবো যে দুরন্ত এক কিশোর। দু’চোখে দুনিয়াটাকে ছেঁকে নেবার জন্যই যেন তার জন্ম। তাই এক জায়গায় অবস্থান আর ঘরে বসে থাকা তার পক্ষে সম্ভব নয়। সে যে মুক্তি চায় প্রথাবদ্ধ জীবন ও সংস্কৃতি হতে মুক্তি; প্রচলিত ধর্ম ও চিন্তাচেতনা হতে মুক্তি এবং সে যেন বলতে চায়-
আমার মুক্তি আলোয় আলোয় এই আকাশে,
আমার মুক্তি ধুলায় ধুলায় ঘাসে ঘাসে।...
বিশ্ববিধাতার যজ্ঞশালা, আত্মহোমের বহ্নিজ্বালা
জীবন যেন দিই আহুতি মুক্তি আশে।  (চলবে)
লেখক : সাবেক অধ্যাপক, শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়, সিলেট

Disconnect