ফনেটিক ইউনিজয়
চ ল চ্চি ত্র
রূপালী পর্দার সোনালি অতীত
ফ্লোরা সরকার

আমেরিকার আইডাহোর বয়জি শহরে মরিসন থিয়েটারের প্রবেশপথে বেশ সুন্দর একটা কথা লেখা, বাংলা করলে যা দাঁড়ায়-‘শিল্পসাহিত্য নির্মাণ করা হয় সুন্দরের জন্য, প্রয়োজনের জন্য নয়’-অর্থাৎ মানুষ তার জীবনধারণের জন্য যা যা প্রয়োজন, সেসব প্রয়োজন মেটানোর পর শিল্পসাহিত্য তার সুন্দরের ডালা নিয়ে মানুষের সামনে উপস্থিত হয়। খাদ্য যেমন শরীরের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য প্রয়োজন, ঠিক তেমনি চিত্ত বা হৃদয়ের ক্ষুধা নিবৃত্তির জন্য বিনোদনের প্রয়োজন। শিল্পসাহিত্যের মাধ্যমে সেই বিনোদন আমরা পেয়ে থাকি। শিল্পের কাজ শুধু চিত্তের ক্ষুুধা নিবৃত্তির জন্যই নয়, একই সঙ্গে নিজেকে এবং নিজেদের উন্নত করার জন্যও প্রয়োজন।  আর সেই প্রয়োজন অনুভব করার কারণে শিল্পসাহিত্যের অঙ্গনে যুগে যুগে নতুন নতুন কলা এসে হাজির হয়েছে। সিনেমা সেসব কলার সর্বকনিষ্ঠ কলা। সর্বকনিষ্ঠ হলেও সিনেমা আবিষ্কারে সঙ্গে সঙ্গে তার প্রভাব ছিলো অত্যন্ত
শক্তিশালী ও সুদূরপ্রসারী। আমরা যদি বিশ্বচলচ্চিত্রের ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটের দিকে একটু চোখ বুলিয়ে নিই, তাহলে দেখব, একেবারে একই সময় না হলেও, প্রায় কাছাকাছি সময়ে সিনেমা শিল্পগুলো গড়ে উঠছিল। ১৮৯৫ এর ২৮ ডিসেম্বর লুমিয়ের ভাইদের (আগস্ত লুমিয়ের ও লুই লুমিয়ের) দ্বারা সর্বপ্রথম সিনেমার পর্দা উন্মোচনের পরেই বিশ্বের প্রায় সব দেশের প্রেক্ষাগৃহে এক এক করে সিনেমার পর্দা উন্মোচিত হতে থাকল। ১৯২৭ সালের অক্টোবরে স্ববাক ছবি দ্য জ্যাজ সিঙ্গার-এর আগে নির্বাক ছবির যুগেই ফ্রান্স, স্পেন, ইতালি, রাশিয়া, আমেরিকা, জার্মানিসহ প্রায় সমগ্র ইউরোপ ও আমেরিকায় সিনেমার বিস্তার ঘটে যায়। কিছু ব্যতিক্রম ছিল ঔপনিবেশিক দেশগুলোর ক্ষেত্রে। যে কারণে সেসব দেশে সিনেমার বিকাশ ঘটে বেশ দেরিতে। যেমন আফ্রিকার প্রায় অনেক দেশ ফরাসি উপনিবেশের অন্তর্ভুক্ত থাকার কারণে স্বাধীনভাবে সিনেমা নির্মাণ সেসব দেশে সম্পূর্ণভাবে নিষিদ্ধ ছিল। সত্তরের দশকের কিছু আগে থেকে দেশগুলো স্বাধীন হওয়ার পর সেখানে সিনেমা-শিল্পের বিস্তার ঘটতে থাকে। অন্যদিকে লাতিন আমেরিকায় বিশেষ করে মেক্সিকো, আর্জেন্টিনা ও ব্রাজিলে নির্বাক যুগেই সিনেমা শিল্প গড়ে উঠতে দেখা গেলেও, পঞ্চাশের দশকের আগে পর্যন্ত সেখানকার ছবিগুলো বিশ্বের কাছে বিশেষভাবে সমাদৃত হতে পারেনি। এমনকি আমাদের এদিকেও যদি দৃষ্টি ফেরাই, তাহলে দেখতে পাব, অন্তত চল্লিশ বা পঞ্চাশের দশকের আগে পর্যন্ত এখানে সিনেমা-শিল্পের তেমনভাবে প্রসার ঘটেনি। ভারতে চল্লিশের দশকে হিন্দি ছবির প্রসার হলেও, বাংলা বা অন্যভাষার ছবি তেমনভাবে তখনো গড়ে ওঠেনি। শ্রীলঙ্কা, জাপান এবং চীনের ক্ষেত্রেও দেখা যায় পঞ্চাশের দশকেই সেসব দেশে ছবির প্রসার ঘটে বেশ দ্রুত। কাজেই ১৯৫৬ সালে আমাদের এখানে মুখ ও মুখোশ ছবির আবির্ভাব যে ঘটবেই, তাতে এখন আর অবাক হতে হয় না। কেননা, চলচ্চিত্রের ইতিহাসে পঞ্চাশ ও ষাটের দশককে, একরকম বলা চলে ‘সিনেমার স্বর্ণযুগ’। সেই সময়ে সমগ্র পৃথিবীতে শুধু সিনেমা নির্মাণই নয়, নান্দনিক,  ধ্রুপদি এবং বৈচিত্র্যময় সিনেমা নির্মাণের এক প্রতিযোগিতা যেন শুরু হয়ে গিয়েছিল। রুপালি পর্দাকে মানুষ আক্ষরিক অর্থেই রূপকথার পর্দা মনে করত।
সিনেমা নির্মাণের কৌশল, কারিগরি শিক্ষা ইত্যাদি জানা না থাকলে সিনেমা নির্মাণ কঠিন হয়ে যায়। তার ওপর, ক্যামেরা, এডিটিং, অভিনয়শিল্পীদের অভিনয়দক্ষতা, স্টুডিও, মেকআপ, লাইটিং ইত্যাদি শুধু আধুনিক নয়, অত্যাধুনিক হওয়া চাই। মুখ ও মুখোশ-এর আগেও এখানে চলচ্চিত্র নির্মাণের চেষ্টা হয়েছিল। মূলত ঢাকার নবাবদের প্রচেষ্টায় সেটা হয়েছিল। বিভাগ-পূর্ব ১৯২৭ সালে তাঁদের প্রচেষ্টায় সুকুমারী নামে একটা ছবি নির্মিত হয়, কিন্তু সেটা মুক্তির মুখ দেখতে পায়নি। তারপর আবার নবাবদের প্রচেষ্টায় ১৯৩১ সালে দ্য লাস্ট কিস নির্মিত হলে, মুকুল সিনেমা হলে সেটা দেখানো হয়। অবাক হওয়ার বিষয় হলো, সেই সময় থেকে এখন পর্যন্ত এখানে কোনো ফিল্ম ইনস্টিটিউট বা স্কুল গড়ে ওঠেনি (বর্তমানে বিভিন্ন প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে ফিল্মের ওপর কিছু বিভাগ খোলা হয়েছে এবং ব্যক্তিগত উদ্যোগে ফিল্ম ইনস্টিটিউট খোলা হচ্ছে)। কোনো রকম কারিগরি শিক্ষা, অভিনয় শিক্ষা ইত্যাদি ছাড়াই এই দেশে চলচ্চিত্র নির্মিত হওয়ার বিষয়টা আমাদের অবাক না করে পারে না। ব্যক্তিগত উদ্যোগে কেউ কেউ মুম্বাই বা লন্ডন থেকে কিছু শিক্ষা নিয়ে এসেছিলেন, কিন্তু সার্বিকভাবে, সবার জন্য জাতীয় পর্যায়ে এখানে কোনো ফিল্ম স্কুল গড়ে তোলা হয়নি। এত সব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও, ষাটের দশকে ছবি নির্মাণের যে বিপুল স্রোত আমরা দেখতে পাই এবং সেই স্রোতে ভেসে যাওয়া ছবিগুলো শুধু সেই সময়ের দর্শকদের না, এমনকি আজও আমাদের মুগ্ধ করে তা সত্যি বিস্ময়কর। যদিও নির্মাণকৌশল, অভিনয়, কারিগরি দিকগুলো উন্নত বিশ্বের ছবির তুলনায় ততটা উন্নত ছিল না, তবু ছবিগুলো অন্তত সেই সময়ের দর্শককে প্রগাঢ়ভাবে ধরে রাখত এবং কিছু ছবি আজও ধরে রাখে। এখন প্রশ্ন হলো, কেন সেসব ছবি সেই সময়ের দর্শকদের এভাবে ধরে রাখতে পেরেছিল? তার অনেকগুলো কারণ আছে। সংক্ষেপে কিছু কারণ এখানে দেওয়া হলো। এক. দর্শক মূলত তাদের জীবনের প্রতিচ্ছায়া এবং তাদের থেকে আরও ভালো জীবনের প্রতিচ্ছায়া ছবিতে দেখতে চায়। যেগুলো সেই সময়ের, সেই ছবিগুলো, বিশেষ করে সামাজিক ছবিগুলো পূর্ণভাবে পূরণ করতে পেরেছিল। দুই. সিনেমা-শিল্পকে তখন পর্যন্ত ছবির পরিচালক-প্রযোজক-শিল্পী ও কলাকুশলীরা বাণিজ্যিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখা শুরু করেনি। যে কারণে আসিয়া (১৯৬০), কখনো আসেনি (১৯৬০), সূর্য স্নান (১৯৬২), কাঁচের দেয়াল (১৯৬৩), ধারাপাত (১৯৬৩), তালাশ (১৯৬৩), দুই দিগন্ত (১৯৬৪), সুতরাং (১৯৬৪), কার বউ (১৯৬৬), আনোয়ারা (১৯৬৭), নিশি হলো ভোর (১৯৬৮), ময়নামতি (১৯৬৯), নীল আকাশের নিচে (১৯৬৯), পিচঢালা পথ ( ১৯৭০) ইত্যাদির মতো সামাজিক ছবি যেমন পাই, তেমনি পাই এ দেশ তোমার আমার (১৯৫৯), নবাব সিরাজউদ্দৌলা ( ১৯৬৭), জীবন থেকে নেয়া (১৯৭০) ইত্যাদির মতো দেশাত্মবোধক, ঐতিহাসিক ও রাজনৈতিক ছবিও নির্মিত হয়েছিল। আবার রূপবান (১৯৬৫), ভাওয়াল সন্যাসী (১৯৬৬), গুনাই বিবি (১৯৬৬), হিরামন (১৯৬৭), সাত ভাই চম্পা (১৯৬৮), অরুণ বরুণ কিরণমালা (১৯৬৮), গাজি কালু চম্পাবতী (১৯৬৯) ইত্যাদির মতো মিথলজিকাল ও রূপকথাভিত্তিক সিনেমা। ১৯৬৬ সালে নির্মিত ১৩ নম্বর ফেকু উস্তাগার লেন, বাংলাদেশের একমাত্র কমেডি ছবি, যে ছবি শুধু সেই সময়েই না, এখন পর্যন্ত দর্শককে একটানা ধরে রাখে। এসব ছবির নির্মাতা ও কলাকুশলীরা সিনেমাকে ভালোবেসে সিনেমার জগতে এসেছিলেন, কোনো ধরনের বাণিজ্য করার বা তারকা হওয়ার আশায় তাঁরা আসেননি। তাই ভালোবেসে সেই সময় যা-ই নির্মিত হয়েছে সেগুলো খাঁটি সোনা হয়ে দেখা দিয়েছিল। তিন. অধিকাংশ ছবিই ছিল কাহিনিনির্ভর ছবি। মানুষ চিরকাল গল্প শুনতে ভালোবাসে। সেই গল্প যখন রুপালি পর্দায় দেখা যায়, তখন খুব স্বাভাবিকভাবেই ছবি দেখার আগ্রহ বেড়ে যায়। চার. সিনেমা যাত্রার শুরুতেই এখানে কিছু ছবি বিদেশি অ্যাওয়ার্ড পাওয়া শুরু করেছিল। যেমন এ জে কারদার পরিচালিত জাগো হুয়া সাভেরা ১৯৬০ সালে মস্কো ফিল্ম ফ্যাস্টিভালে শ্রেষ্ঠ ছবির অ্যাওয়ার্ড পায়, সুভাষ দত্ত পরিচালিত সুতরাং ছবিটি ১৯৬৫ সালে ফ্রাঙ্কফুর্ট ফিল্ম ফ্যাস্টিভালে দ্বিতীয় পুরস্কার লাভ করে, ১৯৬৭ সালে নবাব সিরাজউদ্দৌলা তাসখন্দ চলচ্চিত্র উৎসবে শ্রেষ্ঠ ছবির অ্যাওয়ার্ড পায় ইত্যাদি। একটা দেশে কিছু সিনেমা যখন বিদেশি অ্যাওয়ার্ড পেতে থাকে, দর্শক তখন নিশ্চিত হতে থাকে, ছবিগুলো অবশ্যই ভালো এবং দেখা দরকার। ফলে তারা তখন হলমুখী হতে থাকে। পাঁচ. অধিকাংশ ছবিই তখন হিট বা সুপারহিট হতো। জনপ্রিয় সিনেমা, নির্মাতাদের পাশাপাশি দর্শককে ছবি দেখার বিষয়ে অত্যন্ত আগ্রহী করে তোলে। ষাটের দশকের প্রায় সব ছবিই জনপ্রিয় হতো। ফলে একদিকে হলের সংখ্যা যেমন বাড়তে শুরু করল অন্যদিকে সিনেমা ও দর্শকের সংখ্যাও ক্রমান্বয়ে বাড়তে শুরু করেছিল। ছয়. টেলিভিশনের প্রভাব না থাকা। ১৯৬৪ সালে এখানে প্রথম যখন টেলিভিশনের আগমন ঘটে, তখনো টেলিভিশন সিনেমার প্রতিদ্বন্দ্বী হয়ে ওঠেনি। তা ছাড়া টেলিভিশনের দর্শকসংখ্যা ছিল খুব কম। কেননা, টেলিভিশন কেনার সক্ষমতা তখন সবার ছিল না। ফলে বিনোদনের জন্য চলচ্চিত্র, রেডিও আর মঞ্চনাটকই ছিল একমাত্র মাধ্যম। আর যেহেতু রুপালি পর্দার মাদকতা দর্শকের কাছে পরিপূর্ণরূপে নতুন এবং আবেদনময়ী ছিল, ফলে দর্শক হলে ভিড় করত বেশি। মোটামুটিভাবে এসব কারণেই সেই সময় সিনেমার জনপ্রিয়তা বর্তমানের চেয়ে এত অধিক পরিমাণে ছিল।
স্বাধীনতা-পরবর্তী সময়ে সত্তর ও আশির দশক পর্যন্তও মানুষ হলমুখী ছিল। কেননা, তখনও ছবিতে গল্পের প্রভাব, রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সামাজিক জীবনের প্রভাব বাংলা সিনেমায় কার্যকর ছিল। এই সময়ে আমরা বেশকিছু ভালো ছবি নির্মিত হতে দেখি, যেমন নাচের পুতুল (১৯৭১), আবার তোরা মানুষ হ (১৯৭৩), তিতাস একটি নদীর নাম (১৯৭৩), আলোর মিছিল (১৯৭৪), সুজন সখী (১৯৭৫), লাঠিয়াল (১৯৭৫), পালঙ্ক (১৯৭৫), নয়নমণি (১৯৭৬), বসুন্ধরা (১৯৭৭), সারেং বৌ (১৯৭৮), গোলাপী এখন ট্রেনে (১৯৭১), ছুটির ঘণ্টা (১৯৮০), দুই পয়সার আলতা (১৯৮২), প্রাণ সজনী (১৯৮৩) ইত্যাদি ছবি। পাশাপাশি এখানে প্রথম মুহম্মদ খসরুর উদ্যোগে ১৯৬৩ সালে ‘পাকিস্তান চলচ্চিত্র সংসদ’ প্রতিষ্ঠার মধ্যে দিয়ে সৎ চলচ্চিত্র আন্দোলনের পথযাত্রা শুরু হয়েছিল। ১৯৭৫ সালে যার নামকরণ হয় ‘বাংলাদেশ ফেডারেশন অব ফিল্ম সোসাইটিজ’। এটা ছাড়াও মুহম্মদ খসরু প্রতিষ্ঠা করলেন ফিল্ম আর্কাইভ ইত্যাদি (সূত্র : বাংলাদেশের চলচ্চিত্র সংসদ আন্দোলন, মুহম্মদ খসরু)। এখানে বলে রাখা ভালো, মুহম্মদ খসরুর উদ্যোগে যে সৎ চলচ্চিত্র আন্দোলন শুরু হয়েছিল, তা শুধু ভালো ছবি নির্মাণের উদ্দেশ্যেই করা হয়নি। সিনেমা নিয়ন্ত্রণ আইন বাতিলসহ অন্যান্য প্রতিবন্ধকতা দূর করা, চলচ্চিত্র বিষয়ে হাতেকলমে শিক্ষা দেওয়া ইত্যাদি উদ্দেশে শুরু করা হয়েছিল। এই আন্দোলন কতটুকু কার্যকর হয়েছিল, সেটা এক বিস্তর আলোচনার দাবি রাখে, তবে মুহম্মদ খসরুর এই উদ্যোগের ফলে, আলমগীর কবীর, কবীর আনোয়ার এবং আরও পরে তারেক মাসুদ, তানভীর মোকাম্মেলের মতো এমন কিছু নির্মাতার উদয় ঘটে, যাঁরা মূলধারার পাশাপাশি আরও ভালো ছবি নির্মাণে মনোযোগ দেন এবং আমরাও বেশকিছু ভালো ছবি দেখার সুযোগ পাই।
নব্বইয়ের দশক থেকে ধীরে ধীরে মানুষ সিনেমা হলে যাওয়া কমিয়ে দিতে শুরু করল। শুধু যে টেলিভিশনের জনপ্রিয়তা বেড়ে গিয়েছিল সেই কারণে নয়, মূলত সিনেমার গল্পগুলো ধীরে ধীরে দূর্বল হতে শুরু করেছিল সেই সময় থেকেই। শুধু প্রেম, গ্ল্যামার আর মারামারি দিয়ে সিনেমার দর্শককে যে ধরে রাখা যায় না, সেটা নির্মাতারা হয় বোঝেননি অথবা বুঝেও বুঝতে চাননি। তা ছাড়া পাইরেসির হার বেড়ে গিয়ে, মুম্বাই ছবির কপি-পেস্ট করে ছবি নির্মাণ শুরু হয়েছিল। পাইরেসির কারণে যে দর্শক বাড়িতে বসে, যে হিন্দি ছবিটা দেখেছেন ভিডিওতে, উনি নিশ্চয়ই দ্বিতীয়বার বাংলায় নির্মিত একই ছবি সিনেমা হলে গিয়ে দেখতে যাবেন না। শুধু সেটা না, সিনেমাকে অত্যধিক মাত্রায় বাণিজ্যিকীকরণের কারণে, বাংলা সিনেমা, সিনেমা থেকে তার শিল্পকর্ম এবং বাণিজ্য দুটোই হারাতে শুরু করল। স্বাভাবিকভাবে হলের সংখ্যা কমতে থাকল। হলের সংখ্যা কমে যাওয়া মানেই ছবির সংখ্যা কমে যাওয়া। একটা দেশে নির্দিষ্ট কোনো পণ্যের উৎপাদন যখন কমে যায়, কিন্তু নির্দিষ্ট সেই পণ্যের চাহিদা থেকে যায়, তখন সেই পণ্য আমদানি ছাড়া চাহিদা পূরণের আর কোনো রাস্তা থাকে না। ফলে ধীরে ধীরে বিদেশি ছবি বিশেষ করে আমেরিকান ছবির আমদানির মধ্যে দিয়ে সিনেমার চাহিদা পূরণ হতে থাকল। হলিউডে কোনো ছবি মুক্তি পেলে, সেই ছবি এখানে আসতে খুব বেশি দেরি হয় না এখন। এমনকি ভারতীয় ছবি আমদানির মধ্যে দিয়েও সেই চাহিদা পূরণের চেষ্টা করা হচ্ছে, যা কোনোভাবেই উচিত না।
একবিংশ শতাব্দীতে ইন্টারনেট নামক হাওয়াই যন্ত্রটির আবিষ্কারের সঙ্গে সঙ্গে শিল্পকর্মের পুরো চিত্রটাই বদলে গেল। এখন অনেক ছবি ইচ্ছে করলেই ইন্টারনেটে দর্শক দেখতে পায়। সিনেমা দেখার অবারিত দ্বার এভাবে উন্মোচিত হবার সঙ্গে সঙ্গে আমাদের ছবিগুলো ভয়াবহ এক প্রতিযোগিতার সম্মুখীন হয়ে পড়েছে। আগেই মানুষ হলবিমুখ হয়ে পড়েছিল আর এখন নেটের কল্যাণে এই বিমুখতা বাড়বে বই কমবে না। কাজেই, এখন যাঁরা ছবি নির্মাণ করছেন বা এই শিল্পের সঙ্গে জড়িত আছেন, তাঁরা যদি পূর্ণভাবে সচেতন না হন, তাহলে হাতে গোনা যে কয়টা সিনেমা হল এখনও আছে, অচিরেই সেসব বন্ধ হয়ে যাবে। বাংলাদেশের অধিকাংশ মানুষ গরিব হলেও, অন্তত মধ্যবিত্তের বিরাট একটা অংশের ভালো ছবি দেখার মতো সামর্থ্য আছে। অন্ন-বস্ত্রের প্রয়োজনটুকু মিটিয়ে এখনও তারা ভালো ছবি দেখতে প্রস্তুত। আমাদের শুধু প্রয়োজন ভালো নির্মাতা ও কলাকুশলীর। মানুষ শুধু খেয়েপরে বাঁচে না, তার চিত্তের বিকাশ না ঘটলে সেই বেঁচে থাকার কোনো অর্থই আর করা যায় না। চিত্তের এই বিকাশের জন্য আজ ভালো সিনেমার বড় প্রয়োজন। নেটের দুনিয়ায় কাজটা কঠিন হলেও, আমেরিকা, ইরান, ভারতসহ অন্যান্য দেশ যদি তাদের সিনেমা নিয়ে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে থাকতে পারে, তাহলে বাংলাদেশ কেন নয়? এই দেশে অতীতে যদি ভালো ছবি হতে পারে, অগণিত দর্শক ছবি দেখার জন্য ছুটে যেতে পারে, তাহলে এখনও পারবে বলে আমরা আশাবাদী।

Disconnect