ফনেটিক ইউনিজয়
সালমান শাহর ২১তম মৃত্যুবার্ষিকী
আজও রহস্যে ঘেরা তাঁর মৃত্যু
মান্নাফ সৈকত

পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রের স্বল্পদৈর্ঘ্য ক্যারিয়ার। তিন বছর পাঁচ মাস ১২ দিন। এই অল্প সময়েই দেশ কাঁপিয়েছেন বাংলা চলচ্চিত্রের ক্ষণজন্মা নায়ক সালমান শাহ। ২৭টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করে নব্বইয়ের দশকে বাংলাদেশের চলচ্চিত্রে আলোড়ন তুলেছিলেন তিনি। এসব ছবির বেশির ভাগই ছিল আলোচিত ও ব্যবসাসফল। জনপ্রিয়তার তুঙ্গে থাকা এ নায়ক ১৯৯৬ সালের ৬ সেপ্টেম্বর মাত্র ২৫ বছর বয়সে পাড়ি জমান না-ফেরার দেশে। বাসায় পাওয়া যায় তাঁর মরদেহ। ওই দিনটি ছিল শুক্রবার। সালমানের মা নীলা চৌধুরীকে টেলিফোন করে বলা হলো ছেলের বাসায় যেতে। টেলিফোন পেয়ে তিনি ছুটে গেলেন ছেলের বাসায়। ইস্কাটনের বাসায় গিয়ে ছেলের মরদেহ দেখতে পান নীলা চৌধুরী।
সালমান শাহ আজ আমাদের মাঝে নেই, তবে তাঁর এই মৃত্যুরহস্যও রয়ে গেছে অজানা। এটি ‘আত্মহত্যা নাকি পরিকল্পিত হত্যা’, তার উত্তর মেলেনি আজও। তবে নীলা চৌধুরী প্রথম থেকেই দাবি করে আসছেন, সালমানের স্ত্রী সামিরাসহ তাঁর পরিবারের লোকজনই হত্যা করেছে তাঁর ছেলেকে। তিনি বলেন, ‘আমি নিঃস্ব। সব শেষ হয়ে গেছে আমার। কিন্তু আমার জানার অধিকার আছে। যত দিন বাঁচব, আমার ছেলের হত্যার বিচার চেয়ে যাব। দরকার হলে আন্তর্জাতিক আদালতের আশ্রয় নেব।’
এ তো গেল শুরুর কথা। তবে কিছুদিন আগে পুরো দেশবাসী ভেবেছিলেন, এবার বোধ হয় এ রহস্য কিছুটা হলেও উন্মোচন হতে চলেছে। সালমান শাহ হত্যা মামলার ৮ নম্বর আসামি রাবেয়া সুলতানা ওরফে রুবি সালমান অধ্যায়কে যেন আবারও নাড়িয়ে দিয়েছিলেন। সালমানের সে সময়ের প্রতিবেশী ও তাঁর স্ত্রী সামিরা হকের মামি। গত ৭ আগস্ট নিজের ফেসবুক পেজে এক ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘সালমান শাহ আত্মহত্যা করে নাই, সালমান শাহ খুন হইছে। আমার হাজব্যান্ড করাইছে এটা আমার ভাইরে দিয়ে, এটা সামিরার (সালমানের স্ত্রী) ফ্যামিলি করাইছে। আর সব ছিল চায়নিজ মানুষ।’ ওই সময় প্রকাশিত ভিডিওতে রুবি দাবি করেন, তিনি একমাত্র জীবিত ব্যক্তি, যার কাছে প্রমাণ আছে, সালমান আত্মহত্যা করেননি, তাঁকে হত্যা করা হয়েছে। তিনি দীর্ঘদিন ধরে যুক্তরাষ্ট্রের পেনসিলভেনিয়ার ফিলাডেলফিয়ায় চায়নিজ স্বামী ও দুই সন্তানসহ বসবাস করছেন। জানা গেছে, সালমান শাহ রুবিকে আন্টি ডাকতেন। সালমান ও সামিরার সাথে তাঁর বেশ ভালো সম্পর্ক ছিল। সালমান মারা যাওয়া পর অনেকের মতো রুবিকেও পুলিশ সন্দেহ করে। কিন্তু ঘটনার সঙ্গে তাঁর সংশ্লিষ্টতার কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি। এর আগে অনেকবার সালমানের মৃত্যুর ব্যাপারে কিছু জানেন না বলে তিনি দাবি করেন।
এ ভিডিওটি প্রকাশের পর থেকে সামাজিক মাধ্যম থেকে শুরু করে সর্বত্র যেন সালমান শাহ হত্যার বিচারের পুনরায় দাবি ওঠে। তবে তাঁর এই বক্তব্যের প্রতিক্রিয়ায় সালমানের মামা বলেন, রুবি সালমান হত্যা মামলার সক্রিয় আসামি। তিনি যা বলেছেন সত্যি বলেছেন।
তবে রুবি সুলতানার এ বক্তব্যকে মিথ্যা বলে দাবি করেছেন সামিরার বাবা শফিকুল হক হীরা। তিনি বলেন, ‘রুবি মানসিকভাবে বিপর্যস্ত। তিনি আরও বলেন, সালমানের মৃত্যুর পর সামিরাকে ভালো ছেলের সঙ্গে দ্বিতীয় বিয়ে দেওয়া হয়েছে। সে তার ছেলেমেয়ে নিয়ে সুখে আছে। তাই এ ঘটনা এখন আমার পরিবারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন করা ছাড়া আর কিছু নয়।’
এভাবে সালমান শাহ মৃত্যুর জট যখন খুলতে শুরু করার দুই দিন পর তা আবার নতুন মোড় নিয়েছে রুবি সুলতানার সবকিছু অস্বীকার করার ফলে। অন্য একটি ভিডিও বার্তায় তিনি বলেন, ‘সালমান শাহ খুন হতে পারে, আত্মহত্যাও করতে পারে। আমি এর কিছুই জানি না। আমি যদি খুনি হই তাহলে আমাকে প্রমাণ করুক যে আমি খুনি। আমি আমেরিকান সিটিজেন। এখানে এসে আমাকে এত সহজে ধরে নিয়ে যাওয়া যাবে না।’
রবি বলেন, ‘আমি প্রমাণ দিতে পারব যে আমি মানসিকভাবে অসুস্থ। আর সামিরার ব্যাপারে যা কিছু বলেছি সবকিছু মিথ্যে কথা। আমার মস্তিষ্ক কাজ করছিল না। তাই এইসব বলেছি।’
এদিকে সালমানের মৃত্যুর পর তাঁকে হত্যার দায় স্বীকার করে রেজভী আহমেদ ওরফে ফরহাদ নামের এক তরুণ আদালতে স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দি দিয়েছেন। ওই জবানবন্দির ভিত্তিতে সালমানের মা হত্যার অভিযোগে ১১ জনকে আসামি করে আদালতে নালিশি মামলা করেন। ওই ১১ আসামি হলেন সালমানের স্ত্রী সামিরা হক, শাশুড়ি লতিফা হক লুসি, আজিজ মোহাম্মদ ভাই, রেজভী আহমেদ ফরহাদ, চলচ্চিত্রের খল অভিনেতা আশরাফুল হক ডন, নজরুল শেখ, ডেভিড, রাবেয়া সুলতানা রুবি, মোস্তাক ওয়াইদ এবং সালমানের বাসার গৃহকর্মী আবুল হোসেন খান। সেই নালিশি মামলাটি অপমৃত্যুর মামলার সঙ্গে মিলিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
এখন বলাই যায়, জনপ্রিয় নায়ক হত্যা মামলার রহস্য এখন যেদিকেই মোড় নিক না কেন, এর সত্যিটা এখনো জানতে চায় সব দর্শক। তারা আশা করে, অচিরেই নিষ্পত্তি হবে সালমান শাহ মৃত্যুর ২১ বছরের আলোচিত অধ্যায়ের।

Disconnect