ফনেটিক ইউনিজয়
সা ক্ষা ৎ কা র
‘আগামী’কে মুক্তি দিন...

আন্তর্জাতিক চলচ্চিত্রে বাংলাদেশের হাতে গোনা যে কজন নির্মাতা উজ্জ্বল আলোয় উদ্ভাসিত তাদের মধ্যে মোরশেদুল ইসলাম অন্যতম। বিভিন্ন বিষয় নিয়ে চলচ্চিত্র নির্মাণ করলেও তাঁর কাজে প্রাধান্য পেয়েছে মুক্তিযুদ্ধ। চাকা, দীপু নাম্বার টু, প্রিয়তমেষু, আমার বন্ধু রাশেদ, অনিল বাগচীর একদিন  ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য নির্মাণ। মুক্তিযুদ্ধসহ চলচ্চিত্রের বিভিন্ন বিষয়ে কথা বলেছেন এ নির্মাতা। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন সুলতান মাহমুদ সোহাগ

এ দেশের চলচিত্রে বিকল্পধারা ও মূলধারা নামে দুটো ভাগ লক্ষ করা যায়। আপনাদের সময় থেকেই এ ভাগ শুরু হয়েছে। এই ধারা সম্পর্কে একটু জানতে চাই।
বিকল্পধারা বলতে আমরা যেটা বোঝাতে চেয়েছি সেটা হচ্ছে, এফডিসির  নিয়মকানুন থেকে বের হয়ে বিকল্পভাবে তৈরি। এখন ৩৫ মিলিমিটারে খুব বেশি সিনেমার শুটিং হয় না। তখন হতো। আমরা ১৬ মিলিমিটারে শুটিং করলাম। এতে খরচ অনেক কমে গেল। আবার সেট না বানিয়ে আমরা যেকোনো লোকেশনে কাজ করতাম। কয়েকজন মিলে কাজটা হতো। অডিটরিয়াম ভাড়া করে এটি প্রদর্শন করতাম। এই যে সবকিছু বিকল্পভাবে তৈরি হতো বলে এটাকে আমরা বলতাম বিকল্পধারার ছবি। আর প্রচলিত ধারায় চলচ্চিত্র বানানো হলো মূলধারার চলচ্চিত্র।

জীবনের ঠিক কোন সময় এসে সিদ্ধান্ত নিলেন চলচ্চিত্র নির্মাতা হওয়ার?
যখন স্কুলে পড়ি, তখন থেকেই প্রচুর সিনেমা দেখতাম। এরপর একটু বড় হয়ে ফিল্ম সোসাইটির সদস্য হই। সেই সঙ্গে বিভিন্ন দেশের চলচ্চিত্র দেখা শুরু করি। তখন থেকেই মনে হলো চলচ্চিত্র একটি বড় মাধ্যম। নির্মাণের কথা তখনো ভাবিনি। বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার সময় তিন মাসের একটি ফিল্ম এপ্রিসিয়েশন কোর্সের আয়োজন করেছিল বাংলাদেশ ফিল্ম আর্কাইভ। ভর্তি হলাম। তখন থেকেই ইচ্ছেটা শুরু হলো চলচ্চিত্র নির্মাণের। ওই কোর্সের পরিচালক ছিলেন আলমগীর কবির। তিনিই আমাদের সাহস দিতেন। এই সাহসটাকে সঙ্গে নিয়ে আমার প্রথম চলচ্চিত্র আগামী বানিয়েছিলাম। সেটি একটি মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা ছিল।

আপনার চলচ্চিত্রের বিষয় হিসেবে মুক্তিযুদ্ধকেই আমরা বেশি দেখতে পাই, ব্যাখ্যাটা একটু জানতে চাই।
মুক্তিযুদ্ধের সময় আমার বয়স ছিল ১৩ বছর। মুক্তিযুদ্ধ ছিল আমাদের কাছে একেবারে জ্বলজ্বলে স্মৃতি। কোন বিষয় নিয়ে নির্মাণ করব প্রথম চলচ্চিত্র বানানোর আগে এটা ভাবতেই আমার সামনে মুক্তিযুদ্ধের কথাই মনে হলো। মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তি তখন বিভিন্ন সুযোগ-সুবিধা ভোগ করছিল, আর মুক্তিযোদ্ধারা কোনো প্রতিবাদ করতে পারছিল না। এই বিষয়গুলোই আমার প্রথম চলচ্চিত্রে তুলে আনার চেষ্টা করেছি। জয় বাংলা সেøাগান থাকার কারণে আগামী চলচ্চিত্রটি সেন্সর আটকে দিল। ৫২ জন বুদ্ধিজীবীর একটা বিবৃতি ছাপা হয়েছিল বিভিন্ন পত্রিকার প্রথম পাতায়, ‘আগামীকে মুক্তি দিন’ শিরোনামে। তারপরই কিন্তু সরকার এটি মুক্তি দিতে বাধ্য হলো।

ডিসেম্বর বা মার্চ মাসেই আমরা কেবল মুক্তিযুদ্ধের ছবি নিয়ে কথা বলি, নির্মাণ করি, মুক্তি দেওয়া হয়? সারা বছর এটা করা হয় না?
বাংলাদেশের মানুষের কাছে ডিসেম্বর ও মার্চ দুটি বিশেষ মাস। এই দুটি মাসেই আমরা মুক্তিযুদ্ধের কথা স্মরণ করি। স্মৃতি রোমন্থন করি। এ কারণেই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা আমরা বেশি দেখতে চাই। তা ছাড়া মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা খুব বেশি নির্মাণ হয় না। হলে অন্য সময় হয়তো মুক্তি দেওয়া হতো। তবে এ ধরনের সিনেমা বেশি নির্মাণ হওয়া দরকার বলে মনে করি।

মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা খুব বেশি নির্মিত না হওয়ার কারণ কী?
কারণ একটাই। এর বাণিজ্যিক সম্ভাবনা কম। তার মানে ব্যবসা নেই। এ জন্যই মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা কম নির্মিত হচ্ছে। এটি কিন্তু একটি বড় সংকট। এ ছাড়া নতুন প্রজন্মের কাছে মুক্তিযুদ্ধের সিনেমা নির্মাণের আগ্রহ কম। আগ্রহ বাড়াতে হবে। তারা যদি আগ্রহী হয়, তাহলে কিন্তু ভিন্ন মাত্রা পাবে। আমাদের আবেগ আর তাদের আবেগ দুই ধরনের। এরপরও কেউ কেউ বানাচ্ছে, আমি দেখেছি তাদের সিনেমা, ভালো হয়েছে। তাদের আরও এগিয়ে আসতে হবে, তাহলেই এই সংকট দূর হবে। এ জন্য রাষ্ট্রকেও সহযোগিতা করতে হবে। তা ছাড়া সম্ভব হবে না। আরেকটা বিষয় মাথায় রাখতে হবে, সব সময় বাণিজ্যকে প্রাধান্য দেওয়া যাবে না।

শিগগিরই মুক্তি পেতে যাচ্ছে আপনার চলচ্চিত্র ‘আঁখি ও তার বন্ধুরা’। এর গল্প একটু শুনতে চাই।
সিনেমাটি নিয়ে আমি খুব আশাবাদী। দীপু নাম্বার টু-এর মতো এই সিনেমাটিও সবার ভালো লাগবে। ড. মুহম্মদ জাফর ইকবালের গল্পে ‘আঁখি’ নামের ছোট একটি মেয়েকে নিয়েই এই চলচ্চিত্রের মূল কাহিনি। মেয়েটি অন্ধ। কিন্তু সে  প্রতিবন্ধী স্কুলে না পড়ে সাধারণ স্কুলে পড়তে আসে। আঁখির বেশকিছু বন্ধু হয়। কিন্তু শিক্ষকদের দুর্ব্যবহারে আঁখি যখন চলে যেতে চায়, তার বন্ধুরা তখন এগিয়ে আসে। আঁখি জানায়, সে অন্ধ হিসেবে বিবেচিত হতে চায় না। সে অন্য সবার মতো হতে চায়। আঁখির এই চ্যালেঞ্জ গ্রহণ করে বন্ধুরা। আঁখিকে অন্ধ হিসেবে কোনো করুণা করে না তারা। ¯্রফে বন্ধু মনে করে। এরপর নানা ঘটনার মধ্য দিয়ে এগিয়ে যায় কাহিনি। এই মাসেই মুক্তি পাচ্ছে ছবিটি। সবাইকে দেখার জন্য আমন্ত্রণ।

Disconnect