ফনেটিক ইউনিজয়
সেলুলয়েডের ছোঁয়ায় ৭১-এর ছবি
মান্নাফ সৈকত
গেরিলা চলচ্চিত্রের একটি দৃশ্য
----

আমরা অনেকেই মুক্তিযুদ্ধ দেখিনি। যুদ্ধের নির্মমতা, ভয়াবহতা ও নিষ্ঠুরতা সম্পর্কে তেমন কোনো ধারণা আমাদের অনেকেরই নেই। শোনার চেয়ে  দেখার মধ্যে যুদ্ধের বিভীষিকা বেশি ধরা পড়ে। এ জন্যই হয়তো মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে তৈরি হয়েছে কত শত চলচ্চিত্র। এসব ছবি সেই সময়ের কথা বলে, সেই সময়কে আমাদের কাছে তুলে ধরতে চায়। মুক্তিযুদ্ধের প্রেক্ষাপট কিংবা যুদ্ধ-পরবর্তী বাংলাদেশ সেলুলয়েডের পর্দায় ফুটে উঠেছে বিভিন্নভাবে। কিন্তু প্রয়োজনের তুলনায় সেটি একেবারে অপ্রতুল।
ঢাকায় এফডিসি নির্মিত হওয়ার পর থেকে জীবনঘনিষ্ঠ চলচ্চিত্র নির্মিত হলেও মূলত মুক্তি সংগ্রামের বিষয়টিকে সেলুলয়েডের পর্দায় বন্দি করতে উদগ্রীব ছিলেন জহির রায়হান। প্রকৃত মুক্তির আকাঙ্খা আর সংগ্রামকে প্রথম যে ছায়াছবি মূর্ত করে তোলে, তার প্রমাণ জীবন থেকে নেয়া। আমজাদ হোসেনের কাহিনি অবলম্বনে জহির রায়হান পরিচালিত ১৯৭০ সালে নির্মিত এ ছবিটি এক অবিস্মরণীয় সৃষ্টিতে পরিণত হয়েছে।
সেলুলয়েডের ছোঁয়ায় ‘৭১-এর মুক্তিযুদ্ধ এই অল্প পরিসরে বর্ণনা সম্ভব নয়। তাই উল্লেখযোগ্য কিছু সিনেমা নিয়েই আলোচনা করা হলো।
প্রথমেই বলতে হয়, মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বিশ্বজনমত গড়ে তোলার জন্য জহির রায়হান প্রামাণ্যচিত্র স্টপ জেনোসাইড তৈরি শুরু করেন ১৯৭১ সালের জুলাই মাসে। যুদ্ধের ভয়াবহতা, প্রাণ বাঁচার আশায় অসহায় মানুষের শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণের চিত্র বাস্তব ও মর্মস্পর্শী হয়ে ফুটে উঠেছে এ ছবিতে। এ ছাড়া জহির রায়হানের তত্ত্বাবধানে আলমগীর কবির তৈরি করেন প্রামাণ্যচিত্র লিবারেশন ফাইটার্স। বঙ্গবন্ধুর সাতই মার্চের ভাষণ সাউন্ডট্র্যাকে ওভারল্যাপ করে এ ছবিতেই প্রথম ব্যবহার করা হয়। শিশুদের ওপর পাকিস্তানি হানাদার বাহিনীর বর্বরতা তুলে ধরেছেন বাবুল চৌধুরী তাঁর প্রামাণ্যচিত্র ইনোসেন্ট মিলিয়নস-এ। পাশাপাশি জহির রায়হান আ স্টেট ইজ বর্ণ নির্মাণ করে মুক্তিযুদ্ধকে ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে স্থাপন করে। বিদেশিদের ক্যামেরায়ও স্থান পেয়েছিল আমাদের মুক্তিযুদ্ধ। ভারতীয় প্রামাণ্যচিত্র নির্মাতা শুকদেবের নাইন মান্থস অব ফ্রিডম, ব্রিটিশ টিভি চ্যানেল প্রাগডার উদ্যোগে নির্মিত মেজর খালেদ’স ওয়ার, জাপানি চলচ্চিত্রকার নার্গিশ ওলিমার বাংলাদেশ স্টোরি, ভারতের গীতা মেহতার ডেটলাইন বাংলাদেশ ও দুর্গাপ্রসাদের দুরন্ত পদ্মায় প্রামাণ্যচিত্রগুলো আমাদের মুক্তিযুদ্ধকে দিয়েছে উচ্চমাত্রায় সম্মান। এ ছাড়া ১৯৯০ দশকের মাঝামাঝি সময় ব্রিটিশ টিভি নেটওয়ার্ক চ্যানেল-৪-এর উদ্যোগে গীতা সায়গল ডেভিড বার্গম্যান নির্মাণ করেন ওয়ারক্রাইমস ফাইল।আর আমাদের পূর্ণদৈর্ঘ্য চলচ্চিত্রগুলোর মধ্যে রয়েছে-

‘ওরা ১১ জন’
বাংলাদেশ যুদ্ধ জয়ের কিছুদিন পরেই ১৯৭২ সালে এই সিনেমা মুক্তি পায়। যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশে শহীদের রক্তের দাগ তখনো শুকায়নি। ঠিক সেই সময় পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম আর প্রযোজক মুরাদ পারভেজ দায় অনুভব করলেন এ সময়ের সাক্ষী হওয়ার।

‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’
সুভাষ দত্তের পরিচালনায় ১৯৭২ সালে নির্মিত আরেকটি চলচ্চিত্রের নাম অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী। যুদ্ধের সময় পাকিস্তানি বাহিনীর কলুষিত হাত পড়ে আমাদের দেশের লাখো নারীর প্রতি। মূলত বীরাঙ্গনা নারীদের আকুতির প্রেক্ষাপট নিয়েই আবর্তিত হয় ছবিটির মূল কাহিনি।

‘আগুনের পরশমণি’
নন্দিত কথাসাহিত্যিক ও নির্মাতা হুমায়ূন আহমেদ উপহার দিয়েছিলেন অনন্য এক মুক্তিযুদ্ধের ছবি। অত্যন্ত সহজ-সরল ভাষায়, প্রাণবন্ত অভিনয় আর কুশলী উপস্থাপনায় তিনি তৈরি করেছিলেন আগুনের পরশমণি।

‘হাঙর নদী গ্রেনেড’
বাংলা সাহিত্যের খুব পরিচিত মুখ সেলিনা হোসেন। তাঁর হাত ধরে আমরা পেয়েছি হাঙর নদীর গ্রেনেড-এর মতো অসাধারণ এক উপন্যাস। সেই উপন্যাসের প্রতিটি চরিত্রকে কল্পনা থেকে বাস্তবে রূপ দিয়েছেন প্রখ্যাত চিত্র পরিচালক চাষী নজরুল ইসলাম।

‘গেরিলা’
সব্যসাচী লেখক সৈয়দ শামসুল হকের মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক উপন্যাস নিষিদ্ধ  লোবান। এই উপন্যাসের  প্রেক্ষাপটে ২০১১ সালে নাসির উদ্দীন ইউসুফ নির্মাণ করেন গেরিলা চলচ্চিত্রটি। একজন বলিষ্ঠ নারী চরিত্রকে কেন্দ্র করে এগিয়ে যায় গল্পের চিত্রপট।
এ ছাড়া পরিচালক আলমগীর কবিরের ধীরে বহে মেঘনা, খান আতাউর রহমানের আবার তোরা মানুষ হ, তানভীর মোকাম্মেলের  নদীর নাম মধুমতি, তৌকীর আহমেদের জয়যাত্রা, মোরশেদুল ইসলামের আমার বন্ধু রাশেদ ইত্যাদি উল্লেখযোগ্য।

Disconnect