ফনেটিক ইউনিজয়
সা ক্ষা ৎ কা র
‘এই দেশ আমাদের’

শাহীন সামাদ। বাংলাদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধে সশস্ত্র যোদ্ধাদের পাশে থেকে লড়াইকে বেগবান করেছেন সুর দিয়ে। ছোটকাল থেকেই গানের প্রতি তার প্রবল ঝোঁক। মহান মুক্তিযুদ্ধের সেই সময় ও সমসাময়িক বিভিন্ন বিষয় নিয়ে কথা বলছেন তিনি। সাক্ষাৎকার নিয়েছেন এনআই বুলবুল

মুক্তিযুদ্ধে অংশগ্রহণের কথা জানতে চাই?
১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ পাক বাহিনী দেশজুড়ে নির্যাতন ও হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। তখনই সিদ্ধান্ত নিই, দেশের জন্য আমার কিছু করতে হবে। সুযোগ বুঝে ২০ এপ্রিল বাসা থেকে বেরিয়ে পড়ি। কুমিল্লা হয়ে ভারতের উদ্দেশে রওনা করি। বাসে, ট্রেনে, গাড়িতে পাক সেনারা সে সময় অনুসন্ধান করত মুক্তিযোদ্ধাদের। পাক সেনাদের হাতে যেন ধরা না পড়ি, এজন্য বোরখা পরেছিলাম।

যুদ্ধে অংশগ্রহণের ক্ষেত্রে আপনার মায়ের নিষেধ ছিল। সেটি কীভাবে অতিক্রম করলেন?
ছায়ানটের শিক্ষার্থী ছিলাম বলেই মা অনেক ভয় পেত। ভাবত এ মেয়ে তো যেকোনো দিন যেকোনো কিছু ঘটিয়ে ফেলবে। প্রেরণা কোত্থেকে এল, যদি বলি তাহলে বলব, সেটা গান গাইতে গিয়েই। ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানে অংশ নিয়েছিলাম। ছায়ানট থেকে রাস্তায়, শহীদ মিনারে, ইঞ্জিনিয়ারিং ইনস্টিটিউটে প্রচুর অনুষ্ঠান করেছি। পরে তো ’৭১ এল। তখন সবে কলেজ পেরিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়েছি। প্রতিজ্ঞার কাছে অবশেষে জয়ী হয়েছি।

একাত্তরের সেই উত্তাল দিনগুলোর কথা মনে পড়ে?
সে মুহূর্তগুলো তো ভুলে যাওয়ার মতো নয়। পঁচিশে মার্চে যখন জানলাম, চারদিকে আর্মি চলে এসেছে। চতুর্দিকে ট্যাংক নেমে গেছে, চারদিকে কারফিউ, পাক বাহিনী দিকে দিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়েছে, হলগুলোয়ে তারা ঢুকে পড়ছে। হত্যাযজ্ঞ তখন শুরুই হয়ে  গেল। সমগ্র ঢাকা তখন থমথমে। কিন্তু আমরা মনোবল হারাইনি। দেশকে রক্ষা করতে হবে, মনের ভেতর এ প্রতিজ্ঞা ছিল।

মুক্তিযোদ্ধাদের কীভাবে প্রেরণা দিয়েছেন?
কলকাতায় পৌঁছে বাংলাদেশ মুক্তিসংগ্রামী শিল্পী সংস্থার সঙ্গে কাজ শুরু করি। সংস্থার শিল্পীরা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিভিন্ন অঞ্চলে উদ্দীপনামূলক গান পরিবেশন করতেন। ভাঙা ট্রাকে চড়ে প্রত্যন্ত অঞ্চলে ঘুরে ঘুরে গান করতাম আমরা। দিনের পর দিন নিজেদের খাওয়া, পোশাক কিংবা ঘুমানোর কোনো ঠিক ছিল না। এমনকি একবার টানা ১০-১২ দিন শাক-ভাত খেয়ে কাটাতে হয়েছে। সবকিছুর মূলে ছিল মুক্তিযোদ্ধাদের মনে সাহস জোগানো।

দেশের জন্য যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছেন, এখন অনুভূতি কেমন?
 একটি দেশ সৃষ্টির লড়াইয়ের সঙ্গে নিজের কণ্ঠ দিয়ে যুক্ত থাকতে পেরেছিলাম বলে নিজেকে সৌভাগ্যবতী মনে করি। দেশের জন্য সবাই ত্যাগ স্বীকার করতে পারে না। এ দেশ আমাদের। সেদিন যুদ্ধে অংশগ্রহণ করতে পেরেছি বলেই আজ একটি স্বাধীন দেশ পেয়েছি। স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারছি। এখনকার তরুণ প্রজন্মও নিজেদের সেই সৌভাগ্যের অংশীদার করতে পারবে। যদি তারা মুক্তিযুদ্ধের চেতনা নিয়ে দেশ গড়ার কাজে অংশ নিতে পারে।

নতুন প্রজন্ম সম্পর্কে আপনার মন্তব্য কী?
নতুন প্রজন্ম এখন নানাভাবে মুক্তিযুদ্ধের সঠিক ইতিহাস জানতে পারছে। প্রযুক্তির আধুনিকায়নে এখন সব তথ্য গুগুল ও বিভিন্ন ওয়েবসাইটে পাওয়া যায়। তারাও দেশের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে জানতে অনেক আগ্রহী। মাঝে একটি প্রজন্ম সঠিক ইতিহাস জানা থেকে বঞ্চিত হয়েছে। তবে এখন আর সে অবস্থা নেই।

দেশ নিয়ে আপনার অভিপ্রায় কী?
দেশ এগিয়ে যাচ্ছে। বর্তমান সরকারও দেশের উন্নয়নের প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। দেশে রাজনৈতিক সংকট থাকবেই। কিন্তু এর মধ্য দিয়েই দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে হবে আমাদের নতুন প্রজন্ম ও মুক্তিযুদ্ধের চেতনার সরকারকে।

বর্তমান ব্যস্ততা জানতে চাই।
নিয়মিত গান করছি। ফেব্রুয়ারিতে বিভিন্ন চ্যানেলের জন্য গান করেছি। স্বাধীনতার মাসেও অনেকগুলো অনুষ্ঠানের কথা চলছে। সেগুলোয় অংশগ্রহণের আশা রয়েছে।

Disconnect