ফনেটিক ইউনিজয়
চলচ্চিত্রে মুক্তিযুদ্ধ : এত বছরেও সংখ্যায় সীমিত
মান্নাফ সৈকত

চলচ্চিত্র এমন এক গণমাধ্যম, যেখানে দেশের মানুষের চিন্তা-চেতনা, আশা-আকাক্সক্ষা আর জীবনবোধের প্রতিফলন হয়। বাঙালির হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ কীর্তি মুক্তিযুদ্ধ তাই স্বাভাবিকভাবেই এ দেশের চলচ্চিত্রে উঠে আসার কথা। কিন্তু স্বাধীনতার এত বছরেও আমাদের চলচ্চিত্রের ইতিহাসে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক সিনেমার সংখ্যা একবারেই হাতেগোনা। চলচ্চিত্রে নেই মুক্তিযুদ্ধের উজ্জ্বল প্রতিফলন। দুর্ভাগ্য যে, এখন স্বাধীনতার ৪৭ বছর চললেও মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে ৪০টির বেশি চলচ্চিত্র নির্মাণ করা হয়নি। যদিও দেশ স্বাধীন হওয়ার অব্যবহিতপরই আমাদের গৌরবোজ্জ্বল মুক্তিযুদ্ধ থেকে দারুণভাবে অনুপ্রাণিত হয়েই পরিচালকরা বানাতে শুরু করেন অনবদ্য সব ছবি। সেসব ছবিতে উঠে এসেছিল মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস আর দেশকে সবাই মিলে পুনর্গঠন করার প্রত্যয়।
কিংবদন্তি চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থানের পর নির্মাণ করেছিলেন ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটি। ১৯৭০ সালে মুক্তি পাওয়া এ চলচ্চিত্রে সংসারের একগোছা চাবির মধ্য দিয়ে পাকিস্তানি স্বৈরচারী শাসনক্ষমতা বোঝানো হয়। প্রতীকী হলেও এখানে যুক্ত হয়েছে প্রভাতফেরির দৃশ্য, ১৯৬৯ সালের গণআন্দোলন। এ চলচ্চিত্রে ব্যবহার করা হয় ‘আমার সোনার বাংলা’ ও ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গান দুটি। এ দুটি গানের একটি স্বাধীন বাংলাদেশের জাতীয় সংগীত, অন্যটি একুশের গান হিসেবে সবার হৃদয়ে জায়গা করে নিয়েছে।
আবার মুক্তিযুদ্ধের আগে স্বাধীনতার বাণী নিয়ে নির্মিত হয়েছিল আরও একটি চলচ্চিত্র। ছয় দফা আন্দোলনকে ভিত্তি করে ১৯৭০ সালে নির্মিত ফখরুল আলম পরিচালিত ‘জয়বাংলা’ চলচ্চিত্রটি পাকিস্তান সেন্সর বোর্ড আটকে রাখে। ১৯৭২ সালে এটি মুক্তি পায়। এ দুটো চলচ্চিত্রকে মুক্তিযুদ্ধভিত্তিক চলচ্চিত্রের ভিত্তিপ্রস্তর বলা যায়।
দেশ স্বাধীন হওয়ার পর পরই নির্মাতা চাষী নজরুল ইসলাম তৈরি করেন ‘ওরা এগারো জন’, সুভাষ দত্ত তৈরি করেন ‘অরুণোদয়ের অগ্নিসাক্ষী’। আনন্দের পরিচালনায় বাঘা বাঙালী ও মমতাজ আলীর পরিচালনায় রক্তাক্ত বাংলা ছবিটি মুক্তি পায়। ১৯৭৩ সালে খান আতাউর রহমান তৈরি করেন ‘আবার তোরা মানুষ হ’। খ্যাতিমান নির্মাতা আলমগীর কবির ১৯৭৩ সালে নির্মাণ করেন মুক্তিযুদ্ধকে উপজীব্য করে চলচ্চিত্র ‘ধীরে বহে মেঘনা’ ও আলমগীর কুমকুম তৈরি করেন ‘আমার জন্মভূমি’। এসব চলচ্চিত্রে একটি স্বাধীন দেশের মানুষের স্বপ্ন, পাক হানাদার বাহিনীর নৃশংসতা আর বাঙালির যুদ্ধ জয়ের ইতিহাসই উঠে এসেছে। নারায়ণ ঘোষ মিতার পরিচালনায় ‘আলোর মিছিল’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। চাষী নজরুল ইসলামের ‘সংগ্রাম’ মুক্তি পায় ১৯৭৪ সালে। হারুনর রশীদ ১৯৭৬ সালে তাঁর ‘মেঘের অনেক রং’ ছবির মধ্যদিয়ে যুদ্ধ ও মানবিকতার এক অনন্য গল্প ফুটিয়ে তোলেন। এর পরই ধীরে ধীরে মুখ থুবড়ে পড়তে শুরু করে মুক্তিযুদ্ধের গল্পভিত্তিক সিনেমার ভাগ্য। আশির দশকে বাংলাদেশের সিনেমাজগতের পুরোটাই নিয়ন্ত্রণ করেছে ফ্যান্টাসি ও অ্যাকশন। এসব ছবিতে নান্দনিকতার চেয়ে ব্যবসার দিকটায় বেশি প্রাধান্য দেয়া হয়েছে। তবে কিছুটা আশার আলো আবারও দেখা যায় নব্বইয়ের দশকের শেষের দিকে।
এ সময় নির্মাণ করা হয় একাত্তরের যীশু (১৯৯৩), হাঙ্গর নদীর গ্রেনেড (১৯৯৭), গেরিলা (২০১১), আমার বন্ধু রাশেদ (২০১১) ইত্যাদি। আবার পরোক্ষভাবে মুক্তিযুদ্ধের ভয়াবহতাকে উপস্থাপন করা হয়েছে, এ ধরনের চলচ্চিত্রের মধ্যে আছে, মুক্তির গান (১৯৯৫), শ্যামল ছায়া (২০০৩) ও খেলাঘর (২০০৬)। এ চলচ্চিত্রগুলো বরাবরই মুক্তিযুদ্ধের স্বরূপ তুলে ধরে, যা আমাদের চলচ্চিত্রকে আরও সমৃদ্ধ করে। কিন্তু আমাদের এ সীমিত সংখ্যার পরিধি আরও বাড়াতে হবে এবং যুদ্ধের সঠিক ইতিহাস তুলে ধরতে হবে, যেন নতুন প্রজন্ম এ ধরনের চলচ্চিত্র দেখে মুক্তিযুদ্ধকে খুব কাছ থেকে অনুভব করতে  শেখে।

Disconnect