ফনেটিক ইউনিজয়
আমাদের ঈদের হাসির নাটক
ফ্লোরা সরকার

"Make the plot fit the scenes,
rather than the scenes to plot"- Denis Diderot
(১৭১৩-৮৪) ১৮ শতকের অন্যতম দার্শনিক ডেনিস দিদেরো যখন নাটক প্রসঙ্গে কথাটা বলেন, তখন আমাদের টিভি নাটকের ভুলত্রুটিগুলো যেন আরো স্পষ্ট হয়ে ওঠে। এই প্রসঙ্গে যাবার আগে, নাটক বিষয়ে কিছু কথা বলে নেয়া ভালো, বিশেষ করে কমেডি নাটক। কেননা ঈদকে সামনে রেখে প্রতি বছর, সিরিয়াস বা ট্র্যাজেডি নাটকের চেয়ে, নির্মাতারা কমেডি নাটকের প্রতি ঝুঁকে যান বেশি। তাছাড়া ঈদ মানেই আনন্দ আর সেই আনন্দকে সামনে রেখে, আরো আনন্দ প্রদানের উদ্দেশ্যে কমেডি নাটকের একটা স্রোত যেন বয়ে যায়।
“শিল্পের জন্যই শিল্প” বা শুধু “আনন্দের জন্যই শিল্প” কথাটা যখন বলা হয়, তখন ধরেই নেয়া হয়, নাটকের সাথে জীবন বা বাস্তবতার খুব বেশি মিল বা একাত্মতার প্রয়োজন নেই। আনন্দ দেয়ার জন্য গল্পকে যেভাবে খুশি সেভাবেই সাজানো যেতে পারে। কিন্তু সমস্যা হয়, বাস্তব মানুষই কিন্তু এই অবাস্তব আনন্দ গ্রহণ করে। দর্শক যখন কোনো নাটক দেখতে বসে, তখন সেখানে সে তার নিজের বা তার আশপাশের ঘটে যাওয়া গল্পগুলোকেই কিন্তু খুঁজে বেড়ায়। যদি কেউ না-ও খোঁজে, তবু হঠাৎ কোনো নাটকের সাথে যখন তার বা তার আশেপাশের ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা বা কাহিনীর মিল পেয়ে যায়, তখন সেই নাটক তার কাছে আরো উপভোগ্য হয়ে ওঠে। আনন্দপ্রদ হয়ে ওঠে। আমাদের নাটকগুলোতে আমরা কি দেখতে পাই?
আমাদের আশেপাশের কিছু ছড়িয়ে ছিটিয়ে থাকা চরিত্রদের হঠাৎ করে পর্দার সামনে এসে হাজির হতে দেখি। যাদের অধিকাংশই ধনীর ছেলেমেয়ে, তাদের জীবনে “প্রেম” ছাড়া আর কোনো সংকট নেই। একমাত্র “প্রেম”কে ঘিরেই তাদের সব সমস্যা। হাসির নাটক বা কমেডিতেও তা-ই দেখা যায়। তবে কমেডির অবস্থা আরো শোচনীয়। স্থান, কাল এবং পাত্র (চরিত্র) এই তিনটা বিষয় নাটকের জন্য অপরিহার্য উপাদান। আমাদের কমেডি নাটকের স্থান, অধিকাংশ ক্ষেত্রেই গ্রাম প্রধান হয়ে থাকে। ভাবখানা এমন, গ্রামেই যত হাসির কর্মকা-গুলো ঘটে থাকে। শহরের মানুষ, বেশি সিরিয়াস তাই তাদের জীবনে কোনো আনন্দঘন গল্প নেই। দ্বিতীয়ত হাসির নাটকের জন্য, আঞ্চলিক ভাষার (বিশেষ করে নোয়াখালী ও ঢাকাইয়া) যেন কোনো বিকল্প নেই। একমাত্র আঞ্চলিক ভাষায় কথা বলা হলেই যেন, আনন্দ প্রদান করা যাবে। এখানেও “প্রেম” একমাত্র উপজীব্য বিষয়।
গ্রামের নাটক যাকে আমরা পরিশীলিত ভাষায় লোককাব্য বলি, এই প্রসঙ্গে উৎপল দত্ত তার গদ্য সংগ্রহে চমৎকার একটা কথা বলেছেন- “লোকশিল্পের আঙ্গিক ব্যবহার করতে গেলে আগে কবি হতে হয়। লোককবির অন্তরের সঙ্গে পরিচিত হতে হয়, লোককাব্যের ব্যাকরণে সিদ্ধ হতে হয়। কথাকে আগে ভাবগভীর করে সাজাতে না জানলে, বিজন ভট্টাচার্যের ‘জীয়নকন্যার’ মতন কাব্য সৃষ্টি করতে না জানলে, গ্রামীণ সুর চিরদিনই বাঁদরের মুখ-খেঁচানির মতন শোনাবে।” আমাদের অধিকাংশ গ্রামের নাটকগুলো তাই, “মুখ-খেঁচানির” মতই দেখায়। নাটকের দ্বিতীয় উপাদান, কাল বা সময় সম্পর্কে লিখতে গেলে পৃথক একটা প্রবন্ধের প্রয়োজন পড়বে। সংক্ষেপে বলা যায়, নাটকের কাল বা সময় হলো নাটকের প্রাণ। আমরা যখন সক্রেটিসের জবানবন্দি, আন্তিগোনো বা হ্যামলেট দেখতে বসি, নাটকের কাল বা সময়, আমাদের সেই খ্রিস্টপূর্ব গ্রিস বা এলিজাবেথের সময়ে নিয়ে যায়, আমাদের অজান্তেই। আমাদের টিভি নাটকগুলো একমাত্র পোশাক-পরিচ্ছদ, চরিত্রদের সাজগোজ ছাড়া কোন সময়ে ঘটনা বা গল্প সংঘটিত হয়েছে, দর্শক অনুমান করতে পারে না। সময় বা কাল হলো, কোনো ঘটনার সাক্ষী, সেই ঘটনা যত ছোট হোক তাতে কিছু যায় আসে না। আমাদের কোনো নাটকই, কোনো কাল বা সময়ের সাক্ষী বহন করে না, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। নাটকের তৃতীয় উপাদান পাত্রপাত্রী অর্থাৎ চরিত্র। আমাদের অধিকাংশ নাটকের চরিত্ররা, চরিত্রহীন। অর্থাৎ এদের কোনো চরিত্র থাকে না। কমেডি নাটকের চরিত্ররা তো রীতিমতো ভাঁড়। এরা শুধু অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নেড়ে কথা বলে। কি যে বলে, সেটারও কোনো সুনির্দিষ্ট দিকনির্দেশনা নেই। এ সবকিছু ঘটার মূলে যে কাজটা দায়ী, সেটা হলো দিদেরো কথিত কথাটা।
যেহেতু আমাদের নাটকে কোনো গল্প থাকেনা (শুধু নায়ক-নায়িকার প্রেম বা ভাঁড় চরিত্র দিয়ে ঘেরা থাকে) সেহেতু কোনো দৃশ্যই ঠিকমতো সাজানো হয় না। দৃশ্যগুলো একটু মনোযোগ দিয়ে দেখলেই বোঝা যায়, হঠাৎ হঠাৎ এসে হাজির হয়েছে। অর্থাৎ গল্প দিয়ে আমাদের নির্মাতারা দৃশ্য সাজান না। দৃশ্য দিয়ে গল্প তৈরির একটা ব্যর্থ চেষ্টা করেন শুধু। এ ব্যর্থতার কারণেই আমাদের কমেডিগুলো ট্র্যাজেডিতে (tragedy) রূপ নেয়। দর্শক হাসতে বসে পারলে শুধু কাঁদে।
আমাদের টিভি নাটকের বয়স কিন্তু কম না। প্রায় একান্ন বছর ধরে আমাদের টিভি নাটকগুলো প্রচারিত হচ্ছে। অথচ এই একান্ন বছরে, বিটিভি সময়ের হাতে গোনা কয়েকটা নাটক ছাড়া বাকি সব নাটকই বিলীন হওয়ার পথে। সব নাটকই ভালো হতে হবে এমন নয়। কিন্তু কিছু মানসম্মত নাটক তো নির্মাতারা নির্মাণ করতে পারেন।
পৃথিবীর সবচেয়ে কঠিন কাজ মানুষকে আনন্দ প্রদান করা, তাই শিল্পের জন্য শিল্প কথাটা যত সহজে উচ্চারণ করা যায়, বাস্তবায়ন করা তার থেকে অনেক কঠিন। বিগত বেশ কিছু বছর থেকে, ঈদের নাটকের মান ক্রমেই নিচে নেমে যাচ্ছে। বিশেষ করে কমেডি নাটক। মানুষকে হাসাতে যেয়ে যদি বিরক্ত প্রদানই করা হয়, তাহলে সেই হাসির নাটক নির্মাণ না করাই ভালো। সার ফিলিপ সিডনি তার “অ্যান অ্যাপলজি ফর পোয়েট্রি” বইয়ে (১৫৯৪), কমেডি নাটক প্রসঙ্গে সুন্দর একটা কথা বলেছেন, “আনন্দের আনুষঙ্গিক হিসেবে হাসি আসতে পারে কিন্তু হাসির কারণই- এটা সত্য না। আমরা আনন্দ প্রদানের চেষ্টা করি সেখানেই, যেখানে আমাদের বা সমাজের বাসনাকুল ব্যাপার ঘটে আর আমাদের হাসি আসে সেখানে আমরা বিসদৃশ কোনো কিছু দেখি। বিকৃতি দেখে আমরা হাসি কিন্তু আনন্দ প্রকাশ করিনা।” কাজেই আমরাও, আমাদের হাসির নাটক প্রসঙ্গে একই কথা বলতে পারি। আমাদের কমেডি বা হাসির বিকৃত নাটকগুলো দেখে আমরা হয়তো হাসি, কিন্তু সেসব নাটক আমাদের কখনোই আনন্দ প্রদান করে না।

Disconnect