ফনেটিক ইউনিজয়
সংকটে দেশের মঞ্চনাটক
মান্নাফ সৈকত
মঞ্চনাটকের মাধ্যমেই নাট্যচর্চা বাড়াতে হবে
----

মঞ্চকে বলা হয় অভিনয়ের স্কুল। একটা সময় অভিনয় বলতে মঞ্চের অভিনয়কেই বোঝাতো। কারণ তখন বাংলাদেশের বিভিন্ন অঞ্চলে, বিভিন্ন এলাকায় গড়ে উঠতো মঞ্চ, আর সেই অঞ্চলের লোকজন অভিনয় করতো সেই মাঠেই। এরপর সময়ের আবর্তে মঞ্চ গড়ে ওঠে রাজধানীতেও সেখান থেকে শিখে টেলিভিশনের পর্দায় হাজির হন শক্তিশালী অভিনেতা ও অভিনেত্রীরা। বর্তমান সময়েও বাংলাদেশের ছোট বা বড় পর্দায় প্রতিষ্ঠিত শিল্পীদের অতীত দেখলে বোঝা যায় তারা কোন না কোন মঞ্চের মাঠ পেরিয়েই ডিজিটাল মাধ্যমে শক্ত অবস্থান গেড়েছেন। উদাহরণ হিসেবে আমরা তাকাতে পারি শক্তিশালী অভিনেতা প্রয়াত আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রয়াত হুমায়ুন ফরিদীর দিকে। এ তালিকায় রয়েছেন, ড. ইনামুল হক, ফেরদৗসী মজুমদার, রামেন্দু মজুমদার, আলী যাকের, মামুনুর রশীদ, পীযূষ বন্দ্যোপাধ্যায়, সারা যাকের, সুর্বণা মুস্তাফা, আফজাল হোসেন, অপি করিমসহ প্রমুখ। প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তাদের এখনও সময়ে- অসময়ে ছুটতে দেখা যায় সেই স্কুলে নাট্যচর্চার জন্য। কারণ মঞ্চনাটক শুধু বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং চির তরুণ মনের নানা রঙে সাজানো সমাজ ও সভ্যতার এক বাস্তব প্রতিচ্ছবি। বাংলাদেশে মঞ্চনাটক সত্যিকার অর্থে বিকাশ লাভ করে স্বাধীনতা-উত্তর সময়ে। ওই সময়ে মঞ্চনাটকে বেশ দর্শক তৈরি হয়। কিন্তু এই সময়ে মঞ্চনাটক নানা সংকটে রয়েছে বলে জানা যায়। এ কারণে দিন দিন নাটকের চর্চা মঞ্চে কমছে বলে মনে করেন অনেকেই।
মঞ্চে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে অনেকেই মনে করেন, সংস্কৃতির উন্মুক্ততা ও প্রযুক্তির মাত্রাতিরিক্ত উৎকর্ষতার কারণে নাট্যচর্চার এ অঙ্গনটি বর্তমানে আগের মতো আর উজ্জ্বল নেই। এছাড়া নাটকের দলের তুলনায় মিলনায়তনের স্বল্পতা, দিন দিন দর্শকদের অনাগ্রহ, নারী নাট্যকর্মীর অভাব ও পোশাদারীর অভাবে নাটকের পাঠশালা বলে খ্যাত মঞ্চনাটক বর্তমানে ঐতিহ্য থেকে অনেকাংশেই বিচ্যুত।
এই সময়ের মঞ্চনাটক প্রসঙ্গে গুণী অভিনেত্রী ফেরদৌসী মজুমদার বলেন, এখন মঞ্চনাটকে দর্শক দেখি না আগের মতো। মঞ্চনাটকে অভিনয়ের প্রধান শক্তি হলো দর্শকের উপস্থিতি। দর্শকের উপস্থিতি ব্যতীত মঞ্চনাটকে অভিনয় করে মন ভরে না। এ সময়ে মঞ্চনাটক নানা সংকটে আছে এটি সত্যি। নতুন প্রজন্মের অনেকেই মঞ্চের প্রতি আগ্রহ দেখায়। কিন্তু সঠিকভাবে তারা নিজেদের উপস্থাপন করতে পারছে না।
মঞ্চনাটককে উপজীব্য করে নাট্যাঙ্গনে যারা নিজেদের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখার চেষ্টায় ব্যস্ত রয়েছেন নাটকের উন্নয়নে ও সমৃদ্ধিতে তাদের তেমন মাথাব্যথাও নেই। থিয়েটারে বিভক্তি ও নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব মঞ্চনাটককে ক্ষতিগ্রস্ত করছে বলে মনে করেন বিভিন্ন নাট্যদলের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। বিভিন্ন নাটকের দলের ভাঙনের মধ্যদিয়েও এটা প্রতীয়মান হয় যে, নাটকের চর্চার  চেয়ে নেতৃত্ব প্রতিষ্ঠার ব্রত নিয়েই সংস্কৃতির এই অঙ্গনে নিজেদের আবির্ভূত করেছিলেন বিভিন্ন দলের সঙ্গে সম্পৃক্তরা। একসঙ্গে নাট্যচর্চা ও নাট্য আন্দোলনের প্রত্যয় নিয়ে কাজ শুরু করে পরে ভাগ হয়ে যায় রাজধানীর বেশ কয়েকটি নাটকের দল। এরমধ্যে নাগরিক নাট্যসম্প্রদায় ভেঙে গঠিত হয় নাগরিক নাট্যাঙ্গন ও নাগরিক নাট্যাঙ্গন অনসাম্বাল থিয়েটার। আবার আরামবাগ, তোপখানা, বেইলী রোডের থিয়েটারও বিভক্ত হয় কয়েক ভাগে। অন্যদিকে  লোক নাট্যদল ভেঙে তৈরি হয় লোক নাট্যদল (সিদ্ধেশ্বরী), লোক নাট্যদল (বনানী) ও লোক নাট্যদল (টিএসসি)।
নাগরিক নাট্যসম্প্রদায়ের ড. ইনামুল হক বলেন, মঞ্চ এখন আগের মতো নেই। তবু আমরা ভালোবেসে এটি নিয়ে কাজ করছি। নতুন প্রজন্মের মধ্যে মঞ্চনাটক দিয়ে নাট্যচর্চা বাড়াতে হবে। কারণ মঞ্চনাটকের মধ্যদিয়ে সমাজের নানা অসঙ্গতি তুলে ধরা যায়। কিন্তু এর জন্য প্রয়োজন সুস্থ পরিবেশ। সরকারকে মঞ্চনাটকের জন্য আরও বেশি আন্তরিক হতে হবে।

Disconnect