বঙ্গীশ থের: ইতিহাসের প্রথম বাঙালি কবি

ছবি: পাল যুগের একটি শিল্প।

ছবি: পাল যুগের একটি শিল্প।

চর্যাপদ যে বাংলা ভাষায় সাহিত্যচর্চার প্রাচীনতম নিদর্শন, এটা বর্তমানে সর্বজন স্বীকৃত। কিন্তু প্রায় দুই হাজার বছরেরও আগের রচিত পালি সাহিত্যে বাঙালি ভিক্ষু ‘বঙ্গীশ থের’ নামের এক সুখ্যাত কবি ছিলেন- বুদ্ধের আশিজন প্রধান শিষ্যগণের একজন। খ্রিষ্টপূর্ব দ্বিতীয়/তৃতীয় শতাব্দীর পূর্বে পালি ভাষায় সম্পাদিত ‘অপাদান’ গ্রন্থে বঙ্গীশ থের, বঙ্গের ঈশ বা মহাপুরুষ (‘বঙ্গে জাতোতি বঙ্গীসো’) বলে উল্লেখ আছে। একই গ্রন্থে বলা হয়েছে বঙ্গীশের প্রতিশব্দ বাগীশ বা বাগীশ্বর (‘বচনে ইস্সরোতি বা’)।

যে কোনো বিষয়ে তাৎক্ষণিক পদ্য রচনার অসাধারণ প্রতিভা ছিল বলে ভগবান গৌতম বুদ্ধ তাঁর শিষ্যগণের মধ্যে বঙ্গীশ থেরকে সর্বশ্রেষ্ঠ ‘পটিভাণ’ কবি বলে আখ্যা দিয়েছেন। সংযুক্ত নিকায়ের বঙ্গীশ সংযুক্ত অধ্যায়ে বঙ্গীশের জীবনের বিভিন্ন ঘটনা ও সেখানে ভাসিত গাথার উল্লেখ আছে। ‘থেরগাথা’ নামক প্রাচীন পালি পদ্যগ্রন্থে বঙ্গীশ থের-এর পদ্যের সংখ্যাই সবচেয়ে বেশি। ১৯৯৭ সালে জন আয়ারল্যান্ড নামের একজন পালি সাহিত্যের স্কলার বঙ্গীশের পদ্যগুলো সংকলন করে তার ইংরেজি অনুবাদ প্রকাশ করেন।

পালি সাহিত্যে ‘গাথা’ হিসেবে আখ্যায়িত করা হলেও এগুলো অনেকাংশে আধুনিক পদ্য বা কবিতার সমতুল্য। এই পদ্যগুলো আধ্যাত্মিক মেজাজ এবং বৌদ্ধ চিন্তা ধারায় বেষ্টিত, তবে যে কোনো পাঠকের কাছে নান্দনিকভাবে উপভোগ্য এবং মননের রসদ হিসেবেও পাঠযোগ্য।

বঙ্গীশের একটি কবিতায় উল্লেখ আছে যে, তিনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে এবং শহরে-নগরে ভ্রমণ করে করে কাব্য চর্চা করতেন। ‘অপাদান’ গ্রন্থে বলা হয়েছে, প্রথম জীবনে বঙ্গীশ থের মৃত লোকের মাথার খুলি দেখে বলতে পারতেন সে কোথায় পুনর্জন্ম লাভ করেছে। এ বিদ্যায় সুদক্ষ ছিলেন বলে বঙ্গীশের বেশ খ্যাতি ছিল।

একদিন তার সঙ্গে বুদ্ধের সাক্ষাৎ হয়। বুদ্ধ তাঁকে একজন মৃত অর্হতের মাথার খুলি দেন এবং সে কোথায় জন্মলাভ করেছে সেটা নির্ণয় করতে বলেন। একজন অর্হত হচ্ছেন সে ব্যক্তি, যিনি সকল প্রকার ক্লেশ তথা ভবচক্র সমূলে ধ্বংস করেছেন। সুতরাং বঙ্গীশ শত চেষ্টা করেও মাথার খুলিটির অধিকারী ব্যক্তি কোথায় জন্ম নিয়েছেন, সেটা নির্ণয় করতে ব্যর্থ হন, কারণ অর্হতগণের পুনর্জন্ম হয় না। অতঃপর বঙ্গীশ বুদ্ধের নিকট শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। বঙ্গীশের জীবন ও কাব্যপ্রতিভা সম্পর্কে জন আয়ারল্যান্ডের অভিমত প্রণিধানযোগ্য। 

তিনি বলেন,  এই যে- বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাতের পূর্বে বঙ্গীশ যে কাব্য চর্চায় আবিষ্ট ছিলেন এতে সন্দেহের কারণ নেই। তবে তার মৃত-লোকের খুলি পাঠ করার ব্যাপারটি কিছুটা উদ্ভট। যেহেতু এর বিপরীত কোনো প্রমাণ বা তথ্য আমাদের কাছে নেই, এই বিষয়টি কৌতূহলোদ্দীপক হিসেবেই ধরে নিতে হবে।

বঙ্গীশের যে বিষয়টি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ সেটি হচ্ছে, তার কবিত্ব বা কাব্যপ্রতিভা- যেটি বুদ্ধের সঙ্গে সাক্ষাৎ হওয়ার অনেক আগে থেকেই, দীর্ঘ সময় ধরে তিনি প্রতিপালন এবং বিকশিত করেন। আমরা এটাও ধরে নিতে পারি যে, বঙ্গীশের মতো তাৎক্ষণিক কবিতা-রচনায় অসাধারণ একজন প্রতিভাবান কবি নিশ্চয়ই অনেক কবিতা রচনা করেছেন। সে তুলনায় খুব কমসংখ্যক কবিতাই সময়ের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়েছে। তাঁর রচনা সম্ভারের অনেক বড় অংশই চিরতরে হারিয়ে গেছে।

বঙ্গীশের কবিতা সাধারণত উপদেশমূলক। আধ্যাত্মিক চর্চায় তাঁর বিচ্যুতি, সাধনার পথে তাঁর আত্মোপলব্ধি এবং একান্ত অভিজ্ঞতাও ব্যক্ত হয়েছে তাঁর পদ্যে। বুদ্ধভক্তিও তাঁর কবিতার একটি প্রধান বিষয়। সারিপুত্র, মৌদগল্যায়ন, কউ-িন্য আদি বুদ্ধের প্রধান শিষ্যগণের গুণাবলী উল্লেখ করে স্তুতিও রচনা করেছেন বঙ্গীশ।

অনেক সময় বুদ্ধের দেশনাও সংক্ষেপে গাথাকারে ব্যক্ত করতেন তিনি। একসময় বুদ্ধ সৎ বাক্য ভাষণের গুরুত্বের ওপর একটি দেশনা দেন। বঙ্গীশ তাৎক্ষণিক সেটা পদ্যাকারে ব্যক্ত করেন। সে পদ্যের মূল বিষয় হলো- 

“যে বাক্যের দ্বারা নিজেকে অনুতাপ করতে হয় না 

অন্যের প্রতি হিংসার প্রকাশ হয় না 

সেরূপ বাক্যই সুভাসিত বাক্য। 

সেরকম বাক্যই বলা উচিত- 

যেটা শুনতে প্রিয় ও অন্যের দ্বারা নন্দিত হয়, 

এবং অন্যের পাপচিন্তার হেতু না হয়। 

সত্যই হচ্ছে অমৃত, সত্যই সনাতন, 

সত্যের মধ্যেই ধর্ম, অর্থ, এবং শান্তি প্রতিষ্ঠিত। 

বুদ্ধ যেই বাক্য ভাষণ করেন-

সে বাক্যের মূল লক্ষ্য দুঃখ নিরসন করে নির্বাণ লাভ। 

সে বাক্যই উত্তম বাক্য।” 

বঙ্গীশের কবিতায় মানব মনের স্বাভাবিক অনুভূতি এবং অভিব্যক্তি সহজ সরল ভাষায় প্রকাশ পেয়েছে। যেমন একটি কবিতায় তিনি অকপটে বুদ্ধের শিষ্য আনন্দকে বলেছেন-

“আমি কামরাগে দহন হচ্ছি, 

আমার চিত্তও দগ্ধ হয়ে যাচ্ছে, 

ওগো গৌতম, অনুকম্পা করুন-

এই দহন থেকে মুক্তির উপায় আমাকে বলুন।”

প্রত্যুত্তরে আনন্দ থের বঙ্গীশকে অশুভনুস্মৃতি ধ্যান করে ইন্দ্রিয় সংযমের জন্য উপদেশ দিয়েছেন। পরে এই অশুভনুস্মৃতি ধ্যান করেই বঙ্গীশ অরহত্ত্ব ফল তথা বিমুক্তি লাভ করেন বলে উল্লেখ আছে।

‘অপাদান’ গ্রন্থের তথ্য অনুযায়ী এটা বলতে দ্বিধা নেই, যে কোনো ভাষায় লিখিত সাহিত্যের ইতিহাসে সর্বপ্রথম বাঙালি কবির নাম বঙ্গীশ থের। এর ঐতিহাসিকতা যাচাই করা এখন দুরূহ।

তবে এর দ্বারা ‘অপাদান’ গ্রন্থের লেখক যে বঙ্গ অঞ্চল সম্পর্কে জ্ঞাত ছিলেন, এটা নিশ্চিত। আর বাঙালি হিসেবে আমরা ‘অপাদান’ গ্রন্থের বঙ্গীশকে বঙ্গীয় বলে উপস্থাপন সত্য বলেই ধরে নেব। তাঁর রচনাগুলো মূলত পালি ভাষায় সংরক্ষিত আছে। ইতিহাসের প্রথম বঙ্গীয় বৌদ্ধ ভিক্ষু হওয়ার গৌরবও বঙ্গীশের। বাঙালি যে কাব্য-প্রেমী জাতি, এটা এখনকার কথা নয়। বঙ্গীশ নিজেই স্বীকার করেছিলেন- কাবেয়্যমত্তা বিচরিমহা গামাগামা পুরাপুরা- অর্থাৎ,

“কাব্যে মত্ত হয়ে, কবিতার ঘোরে,

ঘুরেছি গ্রামে গ্রামে নগরে নগরে।”

বিশেষভাবে লক্ষণীয় বিষয় এই যে বঙ্গীশের কাব্যপ্রীতি একসময় তাঁর অহংকারেও পরিণত হয়েছিল। তিনি এই বিষয়ে ছিলেন সচেতন ও অনুতপ্ত। আর নিজেকে সম্বোধন করে তিনি লিখেছিলেন-

“তুমি অহংকার পরিত্যাগ করো

সম্পূর্ণরূপে ত্যাগ করো অহঙ্কারের সেই পথ 

অহংকারের পথেই প্রমত্ত হয়ে-

আহা কত লোক অনুতাপ করে যায়

চিরকাল!”

এই কবিতাগুলোর মধ্যে একজন গভীর আত্মবোধসম্পন্ন, সংবেদনশীল এবং সত্যনিষ্ঠ স্বভাবকবির পরিচয় পাওয়া যায়। যিনি অন্যের গুণাবলিতে উচ্ছ্বাস বা স্তুতি যেমন রচনা করেছেন, তেমনি কামভাব বা অহঙ্কারের মতো স্বাভাবিক অনুভূতি ও মানবিক সীমাবদ্ধতা নিয়েও ছিলেন বিষাদগ্রস্ত। কাব্যচর্চা ছিল তার আত্মবীক্ষণ ও মুক্তির মাধ্যম, যার দ্বারা তিনি সমকালীনদের মধ্যে সর্বশ্রেষ্ঠ কবি হয়েও নিজেকে উদ্ধত না হওয়ার জন্য শাসন করতে ভুলেননি।


লেখক : পিএইচডি গবেষক, এমরয় ইউনিভার্সিটি, যুক্তরাষ্ট্র


মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh