নবীনদের জন্য যতো বই প্রকাশ করা হবে ততোই উত্তম

বইমেলা, বিশেষ করে একুশের বই মেলা একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংস্কৃতিক বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে- এই স্বাধীন বাংলাদেশে। স্বাধীন- কথাটা বললাম এই জন্য যে, বাংলাদেশ স্বাধীনতা না পেলে বইমেলার মতো এমন একটি অসাম্প্রদায়িক, জ্ঞানচর্চার মেলা- সর্ব সাধারণের জন্য সম্ভব ছিলো না।

সেই দিকে যদি একটু লক্ষ্য করি- আমাদের চোখের সামনেই ’৭২-এ স্বাধীনতার পরপরই বইকে স্বাধীনতার অস্ত্র হিসেবে- যে প্রকাশক এবং ব্যক্তিত্ব গ্রহণ করেছিলেন তিনি মুক্তধারার চিত্তরঞ্জন সাহা। তিনি বাংলা একাডেমিতে ফেরিওয়ালার মতো মুক্তধারার বই বিছিয়ে বসেছিলেন। সেই বইগুলো ছিল ৭১-এর মুক্তিযুদ্ধে এবং স্বাধীনতার পরে বের করা ১৫টি বই। তারপরের বছরই তিনি এলেন এবং টেবিল চেয়ার বিছিয়ে একাই মেলা করলেন।

এই যে শুরুটা হলো, কিছু বিশেষ মানুষ-ই কিন্তু অসাধারণ দায়িত্ব পালন করেন সমাজে। চিত্তরঞ্জন সাহা এমনই একজন। তিনি ভেবেছিলেন এই যে বইমেলা হতে পারে একটা সাংস্কৃতিক মেলা, জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানচর্চার মেলা এবং পারস্পরিক মমত্ববোধ, লেখক- প্রকাশক- জনগণ সবার এক সম্মিলন। যে জন্য তাকে বিশাল সম্মান জানিয়েছে বাংলা একাডেমি, তিনি একুশে পদকও পেয়েছিলেন এ জন্য। 

তিনি তো যুদ্ধ শুরু করেছেন একাই- তারপর বাংলা একাডেমি সুধীজন লেখক কবি ধীরে ধীরে মেলা শুরু করে দিলো। প্রতি বছর এর পর থেকেই ধারাবাহিকভাবে মেলা শুরু হচ্ছে। এক সময় দীর্ঘকাল ধরে মেলা হয়েছিলো বাংলা একাডেমির চত্বরে। আর এই যে যখন মেলা শুরু হয় আমার তখন বারবার মনে পড়ে যায়- আমরা যে স্বাধীনতা অর্জন করেছি, যুদ্ধ করেছি, ৩০ লাখ মানুষ শহীদ হয়েছে, ৬ লাখ মা-বোন নির্যাতিত হয়েছেন সেসব কথা।

কিন্তু আমরা পিছিয়ে নেই। আমাদের দুঃখ আছে কিন্তু হতাশা নেই- তাই সংস্কৃতি যে একটা বিরাট শক্তি হতে পারে, বিশেষ করে বই- চিত্তরঞ্জন সাহা তা দেখিয়েছেন। কলকাতায় মুক্তধারা প্রকাশনা করে তার ধারাবাহিকতা তিনি ঢাকাতেও দেখিয়েছেন। ৭১-এ যখন পরাজিত পাকিস্তানিরা ঠান্ডা মাথায় নীল নকশার মাধ্যমে এদেশের লেখক বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে, তারা তখন আসলে বুঝেছিলো এই লেখক, এই বই, এই শিক্ষাচর্চাই মানুষকে এতখানি শক্তিশালী করেছে।

যারা পৃথিবীর শক্তিশালী সমরাস্ত্রে সমৃদ্ধ হয়েও এই বাঙালি, যাদের ঘৃণা করেই ওরা বাঙাল বলত, শুধু তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করতো, তারা শুধু মনের শক্তি বলে, বঙ্গবন্ধু যে মনের শক্তি তাদের মনের মধ্যে সৃষ্টি করতে পেরেছিলো আর বই যা দিয়ে শিক্ষা দিয়ে অর্জন করা যায়, মৃত্যু ভয়কে উপেক্ষা করা যায়- সেটা তারা বারবার প্রমাণ করেছে।

আমি যেমন মুক্তিযুদ্ধের মধ্যে ছবি আঁকলেও- সারাজীবন প্রায় রাস্তায় ছিলাম সাধারণ মানুষের সঙ্গে।  সেই ৫০-৬০’র দশকে চারুকলায় ভর্তি থাকলেও আমার প্রথম কাজই ছিলো- বই পড়া, বইয়ের লাইব্রেরি খোঁজা। আমি ড্রয়িং স্কেচ করতাম- ছুটির সময় আর লাইব্রেরিতে বেড়াতাম। ফুটপাতে বইয়ের দোকান বসতো, সেই বইয়ের দোকান হাতড়ে বেড়াতাম দিনের পর দিন।

আর এই বইমেলা যখন শুরু হলো আমি সত্যি সত্যি আমার অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করতে পারব না। কি আনন্দ ছিলো বইমেলায় যাওয়া- আমি আমার বন্ধু-বান্ধবদের নিয়ে যেতাম, বই কিনতাম। আমার একটি মাত্র শখ বই কেনা। এই বই প্রীতি আমার সেই ছোটবেলা থেকেই ছিল। আগে যে পড়ার সময় কত লাইব্রেরি খুঁজে বেড়িয়েছি, ঢাকার লাইব্রেরিগুলোতে আমি অনেক সময় কাটিয়েছি। 

বই আমার প্রিয়- সেজন্য ছবি আঁকায় আসার আগে আমার ধারণা ছিলো- বইতে যে ইলাস্ট্রেশন করা হয় সেটাই আর্টিস্টদের বড় কাজ। ফলে হলো কি ইলাস্ট্রেশন-প্রচ্ছদের প্রতি আমার একটা ভালোবাসা জন্মালো। আর এই একুশে বইমেলাকে কেন্দ্র করে যখন বই প্রকাশ হতে শুরু করে- তখন স্বভাবতই আমার একটা আনন্দ ছিল, একটা আকর্ষণ ছিল, ধীরে ধীরে লেখকদের সঙ্গেও পরিচিতি বাড়তে থাকে, প্রকাশকের সঙ্গে আমার পরিচয় বাড়তে থাকে আর এই প্রচ্ছদ নিয়ে এই বই মেলার একজন অংশগ্রহণকারী হয়ে গেলাম আমিও।

প্রথমদিকে প্রচুর প্রচ্ছদ এঁকেছি, ইলাস্ট্রেশনও করেছিলাম। আমি প্রচ্ছদের চেয়ে বেশি করতাম ইলাস্ট্রেশন, বিশেষ করে ছোটদের বইতে। এবং সেটা ছিল আমার বড় আনন্দ, এখনো আনন্দ। এখন সেগুলোর কাজ কমিয়ে দিয়েছি, এখন তরুণরা অনেকেই এসেছেন- অনেক শিল্পী এই প্রচ্ছদকে কেন্দ্র করে কাজ করে যাচ্ছেন। নির্দ্বিধায় বলতে পারি, ধ্রুব এষ্ এখন অসাধারণ প্রচ্ছদ করছেন।

আরো কয়েকজন আছেন- ধ্রুব এষ্ প্রচ্ছদ ছাড়া আর কিছুই করে না। কিন্তু এটা দিয়ে সে তার জীবনকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছেন। যদিও বইমেলা উপলক্ষে তার সারা বছরই কাজ করতে হয়। বইমেলা উপলক্ষে আরো অনেক প্রচ্ছদ শিল্পীর দীর্ঘ সময় ধরে কাজ করতে হয়। তাই বইমেলাকে আমি মনে করি শিল্প-সাহিত্য-সংগীত সবকিছু মিলিয়ে। বইতো একটা বিষয়ে হয় না- বিভিন্ন বিষয়ে হয়।

কতো বিষয়ে বই হচ্ছে আজকাল- সে বিষয় গণনা করে বলা যাবে না। অনেকে বলে যে অনেক মূল্যহীন বই হচ্ছে, ঠিকমানের বই হচ্ছে না- আমি মনে করি আরো কয়েকদিন যাক না। কিছু তো হয়তো নিম্নমানের বই পাবেন। তাতে কি আসে যায়। পাঠক ভেবেই তো বেছে নেবে- ভালো কি, মন্দ কি। খুব স্বাভাবিকভাবে ধীরে ধীরে কিন্তু খারাপ বইগুলো না হলে- পাঠক-প্রকাশকরা আর আগ্রহ দেখাবে না।

খারাপ বই হতে পারে- সেটার জন্য এত চিন্তিত হওয়ার কিছু নেই। এখন বই মেলার ভিড় বেড়েছে, বাংলা একাডেমির চত্বরে করা যাচ্ছে না, তাই কয়েক বছর ধরে আমাদের রমনার মাঠে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিশাল অংশে হচ্ছে এটা খুব স্বাভাবিক। এই যে অর্জন, এই যে সম্মৃদ্ধি, এটা যত বাড়বে ততোই দেশের মৌলবাদ সাম্প্রদায়িকতা এগুলো রুখে দাঁড়াবার মতো জনগণই শক্তিশালী অস্ত্র হয়ে দাঁড়াবে।

শুধু নিরাপত্তা বাহিনী দিয়ে বর্ণবাদ-সাম্প্রায়িকতাকে রুখে দেয়া যাবে না। জনগণ যখন জাগবে- সাধারণ পাঠকেরা বই পড়ে যখন নিজের মনে শক্তি জাগাবে- তখন আপনাতেই সব অন্ধকার দূর হবে। আর নবীনদের জন্য যতো বেশি করে- নতুন নতুন বই প্রকাশ করা হবে ততোই উত্তম।

মন্তব্য করুন

সাপ্তাহিক সাম্প্রতিক দেশকাল ই-পেপার পড়তে ক্লিক করুন

© 2020 Shampratik Deshkal All Rights Reserved. Design & Developed By Root Soft Bangladesh