ফনেটিক ইউনিজয়
বহু বিবাহ, ভোগবাদিতা ও সন্তানদের দুর্গতি

নর-নারীর সম্পর্ক একটি অভিন্ন সত্তা, পরস্পর পরস্পরের পরিপূরক জীবন যাপন করেন তাঁরা। পরস্পরের বন্ধু ও সঙ্গী তাঁরা। কিন্তু বাস্তবে আসলেই কি তা-ই?
পুঁজিবাদী রাষ্ট্রে সবকিছু ভোগ্যপণ্য। প্রেম-ভালোবাসা ও স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্কের ক্ষেত্রেও পুঁজিবাদী ব্যবস্থা একটি কুৎসিত রূপ পরিগ্রহ করে আছে। যেমন এখন শিক্ষিত ছেলেদের লেখাপড়া শেষ করতেই ২৫-৩০ বছর চলে যাচ্ছে, তারপরে চাকরি-বাকরি পেতে পেতে ৩৫-৪০ বছর পার হয়ে যাচ্ছে, নিজের জীবিকা গ্রহণের একটা নির্দিষ্ট অবলম্বন ছাড়া বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হতে পারছে না। তদ্রুপ মেয়েরাও। বিয়ের বয়স পার হয়ে যাচ্ছে, বিশেষ করে শহরের শিক্ষিত মেয়েদের-অথচ বিয়ে হচ্ছে না। উপযুক্ত পাত্র পাওয়া যাচ্ছে না!
অন্যদিকে, গ্রামাঞ্চলে মেয়েদের তেরো-চৌদ্দ বছর বয়সে বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। অর্থাৎ বিয়ের বয়স না হওয়ার আগেই বিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কারণ নিরাপত্তা-সংকট। এতে তাদের শারীরিক-মানসিক, যৌতুক ও নানা সমস্যায় পড়তে হচ্ছে। আর এই সমস্যার জন্য পণ্ডিত সমাজ পুরুষতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থাকে বা পুরুষদের দায়ী করছে। হ্যাঁ, পুরুষেরা দায়ী, কিন্তু কতটুকু?
বাস্তবে আমাদের দেশে নর-নারীর সম্পর্কের সমস্যা বহুক্ষেত্রে। যেমন সদ্য বিবাহিত স্ত্রীকে ঘরে রেখে স্বামী বিদেশ যাচ্ছেন। পাঁচ-ছয় বছর পরে আসছেন, এই যে বিবাহিত স্ত্রীটা, তিনি কি কাঠের পুতুল? যত কথাই বলুন, তিনি কি ঠিক থাকবেন? ঠিক থাকলেও কতটা যন্ত্রণাকর তা! আমরা কি ভেবে দেখেছি? আমি এখানে কেবল আমাদের চলতি সময়ের একটি সমস্যা-মা-বাবার বহু বিবাহের কারণে বিশেষ করে বাবার দ্বিতীয় বিয়ের কারণে ছেলেমেয়েদের যে দুর্গতি হয়, তা-ই আলোচনা করব। নিজের অভিজ্ঞতা থেকে কয়েকটি উদাহরণ দিচ্ছি :
ঘটনা ১ : নূরনবী সম্পর্কে আমার আত্মীয় হয়, সে সর্বহারা, পেশায় রিকশাচালক। ২০০১ সালে প্রথম বিয়ে করে। দুটি মেয়ে ও একটি ছেলেসন্তান হয়। ২০১০ সালে আরেকটি বিয়ে করে। ঠিকমতো ভরণ-পোষণ না দেওয়ায় এই স্ত্রী তাকে তালাক দিয়ে চলে যায়। ২০১৪ সালে সে আরেকটি বিয়ে করে ওই স্ত্রীকে নিয়ে অন্য জায়গায় চলে যায়। এদিকে প্রথম স্ত্রীও আবার বিয়ে করে। গত ৯-১০ মাস এই মা নতুন স্বামীর হাত ধরে চলে গেলে-সন্তান ৩টি চরম বিপদে পড়ে যায়। প্রথম মেয়েটির বয়স ১৩ বছর, ডেমরার ডগাইরে প্রাইম নামক একটি জুতা কারখানায় চাকরি করে। বেতন ৩ হাজার টাকা। ছোট মেয়েটির বয়স ১১ বছর পঞ্চম শ্রেণিতে পড়ত। সেও একটি কারখানায় চাকরি করে। দুই মেয়ে ওভারটাইমসহ ৬-৭ হাজার টাকা বেতন পায়। কিন্তু ঘরভাড়া ২ হাজার ৫০০ টাকা। তারপর খাওয়া ও কাপড়চোপড়ের খরচ আছে। ছেলেটির বয়স ৫ বছর। কাজ শেষ করে আসতে কোনো দিন রাত ১০টা-১১টা বেজে যায়। ভাড়া বাড়িতে এই তিন শিশু একা থাকে। আমার স্ত্রী সম্পর্কে তাদের ফুফু হয়। তার হয়েছে জ্বালা। প্রতিদিন তাদের দেখতে যায়। রাতেও ঠিকমতো ঘুমায় না। মেয়েগুলো ও ছেলেটা কীভাবে আছে, সে চিন্তায় থাকে।
প্রশ্ন হলো, আমরা সবাই শিশুশ্রমের বিরুদ্ধে। এ অবস্থায় শিশুদের যদি কাজে না নেওয়া হয়, তাহলে তারা বাঁচবে কীভাবে? আমাদের রাষ্ট্র কি তাদের দায়িত্ব নেবে? এসব মুখস্থ বুলি আওড়ানোর আগে বাস্তবতার দিকে তাকানো উচিত সবাইকে।
ঘটনা ২ : রাশি নামের একটি মেয়ে যাত্রাবাড়ীতে ছোটখাটো একটি পোশাক কারখানায় চাকরি করে। হঠাৎ শুনি কারখানার মালিক তাকে বিয়ে করে। মালিকের বয়স ৫০-৫৫ বছর। আগের স্ত্রীর ঘরে ৩-৪টি ছেলে আছে। বড় ছেলে এইচএসসিতে পড়ে। শোনা যায়, সে আরও বিয়ে করেছিল। মালিক ১০-১৫ দিন পর পর কোথাও চলে যায়। বলে যায়, পেশাগত কাজে কোথাও যাচ্ছে। কিন্তু প্রথম স্ত্রী বুঝতে পারে না, সে যে দ্বিতীয় স্ত্রীর সঙ্গে রাত কাটায়। এদিকে দ্বিতীয় স্ত্রীকে বোরকা পরতে হয়। পুরো শরীর ঢাকা থাকে বলে প্রথম স্ত্রী ও তার সন্তানেরা চিনতেও পারে না যে কে বা কারা, তারা মনে করে তাদের ফ্যাক্টরির শ্রমিক, বাবার পরিচিত। এভাবে ৫-৬ বছর চলে যাচ্ছে। একদিন রাশি আমাদের বাসায় এলে আমি তাকে জিজ্ঞেস করি, তুমি তাকে বিয়ে করায় কী লাভ হয়েছে? সন্তান হয়নি, আর ১০-১২ বছর হয়ে গেলে তোমাকে লাথি দিয়ে তাড়িয়ে দেবে, তখন তোমাকে কোন লোক বিয়ে করবে? তুমি তো স্ত্রীর মর্যাদাই পাওনি। এরূপ রক্ষিতাতুল্য হয়ে লাভ কী?
ঘটনা ৩ : একদিন একজন নারী তাবলিগ-জামাতের দাওয়াত দিতে আমাদের বাসায় এল। শোনা গেল পাশের বাড়িতে মেয়েদের নিয়ে প্রতি শুক্রবার তাবলিগ করা হয়।  পরে এই নারী সম্পর্কে বিস্তারিত জানলাম। সে ১০-১২টি বিয়ে করেছে। প্রত্যেক স্বামী থেকে নিজেই নানা অজুহাতে তালাক নিয়েছে ও তালাকের যে টাকা কাবিননামায় পাওয়া যায়, তা আদায় করেছে। এখন সে অনেক টাকার মালিক। সে টাকা সুদে খাটিয়েছে।
অনেকেই বলেন, সামাজিক নানা ব্যাধি থেকে মুক্তি দিতে পারে ধর্মীয় ও নৈতিক শিক্ষা। বাস্তবে পুঁজিবাদী সমাজে ভোগ ও মুনাফাই সর্বভুক। তার থেকে নিস্তার পেতে হলে রাষ্ট্রব্যবস্থার পরিবর্তনের ব্যাপার রয়েছে। তবে আপাতত যা বলতে চাইÑমানুষের জন্য অবসর-বিনোদনের ব্যবস্থা করা দরকার। আমাদের দেশে সাধারণ শ্রমজীবীরা অবসরই পান না। যে যতটুকু পান, তা-ও সুষ্ঠু বিনোদন করার মতো কোনো স্থান নেই। সুষ্ঠু সাংস্কৃতিক চর্চা নেই। আগে গ্রামেগঞ্জে জারিগান, পালাগান, কবিয়ালি, যাত্রা নাটক হতো। সাধারণ মানুষ নিজেরাও এসব অনুষ্ঠানে অংশ নিত ও প্রাণভরে উপভোগ করত। এভাবে তাদের সময়ও কাটত, একটা মানবিক সত্তা তাদের মধ্যে জাগরিত হতো। এখন সবাই টিভির পর্দায় হাঁ করে হিন্দি সিনেমা দেখে, ভারতীয় ও বিদেশি সিরিয়াল দেখে। সেসব বিদেশি ও কিছু দেশীয় অনুষ্ঠানেও জীবন বিচ্ছিন্ন এবং ভোগবাদী সংস্কৃতিই দেখানো হয়।
এদিকে শ্রমজীবী মানুষের আয় কম। তাই কিছু টাকা জমিয়ে যে ভ্রমণে বের হবে বা আত্মীয়স্বজনদের বাড়িতে বেড়াতে যাবে, তা-ও হচ্ছে না। আর্থিক দুর্বলতার কারণে যৌতুকপ্রথাও রয়ে যাচ্ছে। এরূপ পটভূমিতেই অধিক বিয়ের প্রাদুর্ভাব বাড়ছে। আমার নিজের পর্যবেক্ষণে সমাজের নিচুতলার মানুষগুলোর মাঝে দ্বিতীয়-তৃতীয় বিয়ের সংখ্যা খুব বাড়ছে এবং তা শিশুদের জন্য অভিশাপ হিসেবে আবির্ভূত হচ্ছে।

Disconnect