ফনেটিক ইউনিজয়
বাজারব্যবস্থা : কিছু প্রস্তাব

জনাব শামীম বাজারে গেলেন নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যসামগ্রী কিনতে। চাল কিনতে গিয়ে তিনি লক্ষ করলেন, আগের মাসে তিনি যে দামে চাল কিনেছেন, তার চেয়ে পাঁচ টাকা প্রতি কেজি বেশি দরে কিনতে হচ্ছে এবার। এভাবে প্রায় প্রতিটি জিনিসের দামের বাড়তি ভাব।
এর মাঝে, কেবল একটি আইটেম চালের বাজার বিশ্লেষণ করা যাক। ধরা যাক, কৃষক তাঁর উৎপাদিত ধান মধ্যস্বত্বভোগী ফড়িয়ার কাছে বিক্রি করলেন ৪০০ টাকায় (যা হরহামেশাই  হয়ে থাকে)। এরপর ফড়িয়াদের ডন বা হেড ফড়িয়া বেশ কয়েকজন পাতি ফড়িয়ার কাছে থেকে সেই ধান ৪৫০ টাকা দরে কিনে ধানের চাতালে চালান দিলেন ৭০০ টাকা দরে। সব খরচ বাদে ২০০ টাকা লাভ থাকলেও হেড ফড়িয়া কখনো লাভের কথা স্বীকার করেন না এবং মন্তব্য হয় এ রকম, ‘না রে ভাই, এ বছর আর ব্যবসা হলো না।’ বলাবাহুল্য, বড় ফড়িয়া হতে কিছু রাজনৈতিক যোগাযোগ রাখতে হয়। লাভের একটা অংশ সেদিকেও দিতে হয়।
এদিকে চাতালে আসা ধান সেদ্ধ হবে, শুকাবে,  মেশিনে ভাঙা হবেÑতারপর হবে চাল। কিন্তু রংপুরের এক বৃদ্ধ খালার কাছে জানতে পেলাম, তিনি ১৯৯০-এর দিকে যখন ধানের খোলাতে (চাতালে) কাজ করতেন, তখন তাঁদের এক মণ ধান সেদ্ধ ও শুকানোর জন্য দেওয়া হতো চার আনা, যা ১৯৯৫-এ আট আনা এবং ২০০০-এ সম্ভবত ১-২ টাকা হয়েছিল। এরপর ওই খালা আর ধানের খোলাতে (চাতালে) কাজ করেননি।
এ তো গেল শোষণের চিত্র। এবার ব্যবসার অঙ্ক। এক মণ ধানে ভালো চাল পাওয়া যায় ২৫ কেজি। ভাঙা চাল ৩ কেজি আর ধানের ছিলকা বা তুষ ১২ কেজি। ধানের তুষের বাজারদর ১০-১৫ টাকা, ভাঙা চাল সর্বনিম্ন ২০ টাকা, আর সর্বোপরি এক মণ ধান প্রক্রিয়াজাত করতে ৩০ টাকা খরচ হলে প্রতি কেজি ভালো চালের দামের অঙ্কটা দাঁড়ায় (৭০০-১২×১০-৩ × ২০ + ৩০) / ২৫ = ২২ টাকা। প্রশ্ন হলো, এই ২২ টাকার চাল আপনি, আমি, আমরা কেন ৫০-৬০ টাকায় খাই? উত্তরটা ওই মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছে আছে। একই রকম অবস্থা শাকসবজি, মাছ, তেল, নুন ইত্যাদি  ভোগ্যপণ্যের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। উল্লেখ্য, করপোরেট কোম্পানি কর্তৃক বিপণনকৃত কনজ্যুমার আইটেমের ক্ষেত্রে এই মধ্যস্বত্বভোগিতা খুব সুন্দরভাবে উৎপাদক, ডিস্ট্রিবিউটর, ডিলার ও সাব-ডিলারদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়। এসব দ্রব্যের মান সংশয় থাকলেও বা বাংলাদেশের কনজ্যুমার ফোরাম বা আইন থাকলেও সবই যেন ধোঁয়াশা।
সমস্যার সমাধানেও কিছু কথা উপস্থাপন করা যাক। লক্ষণীয় যে উন্নত বিশ্বের প্রায় সব দেশেই সুপার মার্কেটের (প্রায় সব পণ্যই পাওয়া যায়) ছড়াছড়ি। যদিও এই সুপার মার্কেটকে করপোরেট বডি ছাড়া কেউ ভাবেন না বা ভাবতে পারেন না। কিন্তু সামাজিক সমবায়ভিত্তিক চিন্তা করলেই কতক ব্যক্তি-গোষ্ঠী নিয়ে এলাকাভিত্তিক সুপার মার্কেট করা সম্ভব। তবে যে ছোট পরিবর্তনের প্রয়োজন হবে, তা হলো উৎপাদক সরাসরি সুপার মার্কেটে তাদের সামগ্রী সরবরাহ করবে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই। যদিও এই পরিবর্তন আশা করা খুব সহজ কাজ নয়, তবে সামগ্রিকভাবে এই ক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টি হলে পুরো দেশে যে কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তার সৃষ্টি হবে, তা দেশের বৃহত্তর জনগণের জন্য ব্যাপক স্বস্তি আনবে।
এই সুপার মার্কেট মডেল কীভাবে কার্যকর হবে, তা একটু বিশ্লেষণ করা যাক :
ধরা যাক, উৎপাদক সব রকম ভোগ্যপণ্য উৎপাদন করছেন আর তা সরাসরি সুপার মার্কেটে সরবরাহ করছেন। এখানে ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ পণ্যের গুণগত মান যাচাই-বাছাই করছে আর বিপণনকারী সরাসরি সুপার মার্কেটে তা বিক্রি করছেন।
এভাবে যদি ওই চাল উৎপাদনকারী কৃষকের কথা চিন্তা করা যায়, যিনি উৎপাদিত চাল সরাসরি সুপার মার্কেটে সরবরাহ করছেন, তবে হয়তো দেখা যাবে, এক কেজি চাল আমারা ২০ টাকায় কিনতে পারছি, যার লভ্যাংশ কৃষকের বা উৎপাদকের ও বিপণনকারীর কাছে সমতা রক্ষা করেই ভাগ হয়ে যাচ্ছে, আর ভোক্তা পূর্বমূল্যের চেয়ে কম দামে দ্রব্যসামগ্রী কিনতে পেরে একই টাকাতে কিছু বেশি ভোগ্যপণ্য কিনে রাখছেন বা রাখবেন, যাতে প্রতিটি পরিবারের খাদ্য নিরাপত্তা বেড়ে যাবে বহু গুণে, আর বিক্রয় বা বিপণনকারীরও দ্রব্য নিয়ে চিন্তা করতে হবে না।
এ কথাগুলো যদিও সহজে বলা গেল, তবে এর  প্রশাসনিক আয়োজন হবে অনেক। এই প্রশাসনিক কাজের মধ্যে থাকবে পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণ।  বাংলাদেশের কৃষি, খাদ্য, মৎস্য, পাট ও বস্ত্র ও বাণিজ্য ইত্যাদি মন্ত্রণালয়গুলোকে করপোরেশনে পরিবর্তন করে সেখানকার কর্মকর্তা ও কর্মচারী প্রত্যেককে সরাসরি উৎপাদক, বিপণনকারী ও ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ ও পণ্যের মান নিয়ন্ত্রণ ও পর্যবেক্ষণের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট থাকতে হবে।
এ রকম বাজার ব্যবস্থাপনা হলে মধ্যস্বত্বভোগী জনগোষ্ঠী কয়েক ভাগে বিভক্ত হবে। কেউ হবে উৎপাদক, কেউবা হবে বিপণনকারী; কেউবা ভোক্তা অধিকার কর্তৃপক্ষ। ব্যাপারটা একটু বাজার সিন্ডিকেটের মতো শুনতে মনে হলেও এই সুপার মার্কেট কনসেপ্ট উন্নত বিশ্বের প্রায় সবখানে কার্যকর রয়েছে। আমাদের দেশের বাজার নিয়ন্ত্রণেও এর বিকল্প নেই। এই ধরনের বাজার ব্যবস্থাপনাতে যেহেতু প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের অনেক স্থানে সফলতা এসেছে সুতরাং একটু সততাই যথেষ্ট হবে বাংলাদেশে এই সুপার মার্কেট কনসেপ্ট বাস্তবায়ন করতে।

Disconnect