ফনেটিক ইউনিজয়
অনীহা

এই যে জীবন ভেসে চলে, তরতর করে বয়ে যায় সময়ের শকট, এর মধ্যে আচমকা যে না-চলা এসে থমকে দাঁড়ায়, এটাই অনীহা। অনীহা হলো না-যাওয়া। পথে যেতে পা না সরা। ঈহা হলো ইচ্ছা। অনীহা না-ইচ্ছা।
জীবনে ইচ্ছা থাকেই। শপেনহাওয়ারের কথাটা হলো দুনিয়াদারী মূলত ইচ্ছারই সমষ্টি। কিন্তু না-ইচ্ছাও তো আছে।
কোথা থেকে আসে ইচ্ছা? সেখানেই কি না-ইচ্ছার জন্ম? অনীহার বাবা-মা কারা? অনীহা কি জীবনের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো নয়? জীবন নিজেই কি নিজের বিরুদ্ধতা চায় না? অনীহা কি ইচ্ছার মতোই কাম্য? অনীহার পিছনে কী ইচ্ছা লুকিয়ে রাখে জীবন?

দুই.
অনীহা নাই কার? যা সে করতে চায় না, কেন চায় না? আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ খরগোশের দৌড় শেষ না করার জন্যে তার তুলতুলে শরীরকে দায়ী করেছেন। পারলে তো দৌড় শেষ করে তবেই বিশ্রাম নিত, প্রতিযোগিতার মাঝখানে কে ঘুমায়? যার ঘুম আসে। কচ্ছপ যে পিছিয়ে আছে এটা তার অজুহাত। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ তার সংগঠন ও বাঙালী বইয়েও একই কথা পেড়েছেন। শরীর পারে না, তাই উদ্যম নেই, তাই ভাঙা শরীরের এই জাতির অনীহা অশেষ। কিছুই করতে চায় না’র একদল আছে। এরা বেড়ে বেড়ে না করার এক অতিকায় জীবনে প্রবেশ করছে সকলকে নিয়ে। বিবেকানন্দ যে শরীর গড়াকে আগে রেখেছিলেন সে কথাকেও তিনি অনীহা নিধনের কুঠারবাণী বলে মনে করেন।
কেন আমরা আরেকজনকে বলি, ‘ফ্যানটা একটু দিয়ে দেন না ভাই!’, পানির বোতল এগিয়ে দিয়ে বলি, ‘একটু ঢাকনাটা খুলে দেবেন?’, কেন ঘুম থেকে উঠতে গিয়ে ফের বিছানায় পড়ে যাই? ক্লান্তি আর অপারগতার শরীর আমাদের প্রায় কিছুই যেন করতে দিতে চায় না। শরীরের শক্তিতে যে খাটো, তার অনীহা বেশি। ক্লান্ত তাই অনীহা। অভুক্ত তাই অনীহা। অতিভুক্ত তাই অনীহা।
কিন্তু দুয়েকটা যে শরীর-ভালো আছে, তারও তো অনীহা দেখি একই মাত্রার। বলবান হৃষ্টপুষ্ট, অথচ কিছুই করতে চায় না, আছে তো এরকম অনেক। আয়না দেখে আর পোশাক সামলায়। কাজের কথায় যত পটু, কাজে তার ততই অনীহা। আদেশমূলক জীবন। উপদেশ তার স্বদেশ। ‘এটা করো’, ‘ওটা করা উচিত’, ‘এইভাবে না করলে তো পারবে না’। কেন সে নিজে কিছু করে না? ফাঁকির জীবনই সাধনা কেন তার? সে কি মনে করে সে পারবে না কিছুই? তার ইচ্ছে করে না? আরামকেই সে সুখ ভাবে কেন? কেন শ্রমে তার আনন্দ হয় না?
এও কি তার শরীরের ভেতরের কলকব্জায় লেখা আছে? দেহের খোসা হয়তো চক্ষুসুখের, ভেতরে লিভারখানা হয়তো নাজুক। কিডনি নাজেহাল। হয়তো হজমের নালায় জমে জমে আছে বিষচূর্ণ। পাঁচদশ বছর হয়তো ঠেলে ঠেলে চলবে। পরিপাটি জামা আর দম্ভের হাঁক। তারপর কোনো এক ল্যাবএইডে ইঞ্জিন বসে যাবে হয়তো।
অনীহা কি তবে সিগন্যাল? শরীরের দিকে তাকানোর। দেখার আহ্বান দেহরহস্য, অনীহা কি সেখান থেকে আসা সংবাদপত্র, না পড়ে ফেলে রাখি যেটা আমরা রোজই? অনীহা তো জিজ্ঞাসা করে, ‘কী হবে করে?’, ‘কী হবে পেয়ে?’, ‘কি হবে শিখে’। ‘কী হবে না করে বা না শিখে এই প্রশ্ন অনীহা জানে না, বা জানতে চায় না। অনীহা তো না-চাওয়া। অপারগতা। নিঃস্পৃহতা। অনীহা কী আসলে চোরাবালির ফাঁকি নয়? তলিয়ে যেতে থাকার ‘যেতে থাকা’ যেখানে বড়, তলিয়ে হারানোটা ততটা হয়তো নয়।

তিন.
অনীহাকে দেখি পাশে বসে থাকে আজকাল। আগেও ছিল বোধকরি। যাদের অনীহা নেই, তাদের তো নেই। যাদের আছে, তাদের প্রথম কাজ হচ্ছে, ‘অনীহা তো নাই!’ বলা। অস্বীকার প্রথম লক্ষণ। আর কিছুটা অনীহা তো অতিইচ্ছুকদেরও থাকে। কেই বা আছে সব কিছুতে ‘হ্যাঁ আছি’ ধাঁচের। অনীহা তো একটু আধটু থাকতেই হয়। তা হয়তো হয়ই। আধটু থেকে পুরোটা হয়ে যাওয়া এত দ্রুত হয়, বা হচ্ছে যে অনীহাকে ঘিরে চিন্তা করার ইচ্ছে করতে হচ্ছে। আরামের লোভ অনীহার চারা পুঁতে দেয়। না তৈরি হতে পারা শরীর, বিদ্যায় আনাড়ি মন, অকেজো মনন অনীহা এনে দেয়।
ক্লাস ফোরে যতটুকু না পারা থাকে, ফাইভে সিক্সে সেই না-পারা নিয়ে আরও না-পারার সাথে দেখা হয়। সপ্তম অষ্টম নবম দশম-  বাড়ে ক্রমশ না শেখার তালিকা। দুম করে ক্লাস ইলেভেনে পেরে যাবে সব, শেখার দুনিয়া এরকম তো না। খানিক বাদ দিয়ে দিয়ে দেখা সিনেমা, দেখা হয় বটে, শুধু ঐ দেখেছি বলে বেড়ানোই জোটে, স্বাদ পায় না মন কিছুরই। বাদ দিয়ে দিয়ে, না শিখে না শিখে, না চিনে না চিনে, না জেনে না জেনে, না বুঝে না বুঝে, এই বয়স বেড়ে একদিন সোমত্ত হয়, মাথার ভেতরে মস্ত এক অনীহাপিন্ড বয়ে বয়ে, কী সে উদ্যম পাবে সে ইহা লইয়া? তার সাথী হয় অনীহা।  
অনড় বুদ্ধিতে হু হা করিয়া কাজ চলিয়া যায়। বসে গালি দেয়া তাই বেড়েছে, তালি দেয়াও। কমেছে নিজে শুরু করা। অন্যেরা এসে বলুক, এই সামান্য করাটাই অসামান্য হয়ে যাবে, এই যেন এই কালের আশা। বড় কাজ বলে যেন কিছু নেই, কেবল লোকের বলা আছে বড় কাজ। জীবন তাই লোক খুঁজে বেড়ায়, যে এসে বলে দেবে, ‘মস্ত কাজ হয়েছে তোমার বাছা!’। অমনি হয়ে যাবে বড় কাজের কাজী।
কী হবে করে’র ছদ্মবেশে ভেতরে বসে আছে ‘আমি পারবো না’। বছরের পর বছর না-পারার সাথে বয়ে চলা, বাকী জীবন অনীহাকে ফুল মালায় সাজিয়ে জানান দেয়, ‘ওসব আমার ইচ্ছে করে না’। না-ইচ্ছে করার না-জীবনে, নিজেকে না করে করে কাকে যে ঠকায়, জানতেও পারে না সে সেটা।

চার.
এই দেশখানা কি বেশি ক্লান্ত করে দেয় সবাইকে? কাড়াকাড়ি না করে কিছুই করা যায় না প্রায়। অনীহা কি লড়াই না করার সুবোধ থেকেও আসে খানিক? হারাতেই হবে কাউকে, তা না হলে সিট পাবে না তুমি, হাজার লোক দৌড়ুচ্ছে, দম দিয়ে কতদূর যাবে, কনুই দিয়ে গুঁতো মারারা হতোদ্যম করে দেবে বারবার। অনীহা কি কৃষ্টি এখানকার? বানায় লোকে বাসায় বসে বসে। রপ্তানী করে দেয় অপরের ঘরে। কাগজে করে। বইয়ে গানে কথায় বক্তৃতায় অনীহার চারা বিনামূল্যে দিয়ে যায় বাড়ি বইয়ে এনে।
অপারগ সাথী কি টেনে ধরে পিছে? সবজি ফলালেও চাঁদা দিতে হয়, যে চাঁদা নিতে পারে তাকে। যে খাবার বানায়, তাকে অন্ধকারে রেখে সুইচের পাশে বসে থাকে ধুরন্ধর আলসে আলোব্যবসায়ী।

পাঁচ.
নির্জীবের অনীহা কি তাকে জীবন্ত করে খানিক? জীবন তো কোষের মধ্যে নড়াচড়া করে। বৃদ্ধির কথা বলে। জীবাণুদের সাথে যুঝে চলে। যে শরীর বেঁচে থাকে, তাতে অনীহার ডিপো কে খুলে বসে? ক্রমে কে কমে কমে আসে? ছোট থেকেই কি এদেশবাসী বাঁচতে না চেয়ে অনীহার লালন শুরু করে? কিছুতেই কি সে পারে না আজন্ম দেহে মিশে থাকা হীনমন্যতা কাটিয়ে উঠতে? কে শেখে না কিছুই? এই ছোট ছেলেমেয়েদের কে মেরে ফেলছে? কে বেচে চলেছে অনীহা এতো? কতোভাবে আর নিজেকেই ঠকাবে?
অনীহার দোকানপাট চিনে নাও বন্ধু। বিনি পয়সার ফসলে কৃষক মরে- দাম দাও জীবনের। অনীহা ফ্রি আসে। মূল্য দিয়ে জীবন কেনো। অনীহা দোকানিকে ফিরিয়ে দাও। দাম দাও। বিনামূল্যে দেয়ার জীবন থেকে বিনিময়ে নিয়ে যাচ্ছে মূল্যচেতনা। দাম দাও হে জীবন, জীবনের। ত্যাগে, শ্রমে, ধৈর্যে, নিষ্ঠায়, সেবায়।

আরো খবর

Disconnect