ফনেটিক ইউনিজয়
মেথর! কেমন আছেন তাঁরা?

তিন.
লালবেগী

প্রাচীনকালে বঙ্গের অধিবাসীরা মনে করত, কোনো হিন্দু জাতিচ্যুত হলে সে হালালখোর জাতের অন্তর্ভুক্ত হবে। সে হিসেবে লালবেগীরাও মেথর শ্রেণির মানুষ। বলা হয়, সব বর্ণের মধ্যে লালবেগী হলো শেষ আশ্রয়স্থল, কেননা লালবেগীদের মধ্যে ধর্মের অনুশাসনে তেমন কড়াকড়ি নেই। হিন্দু বা মুসলিম বা আধা হিন্দু গোছের গোত্র এটি। স্বভাবগতভাবেও এরা শান্তশিষ্ট ও যথেষ্ট অনুগত। তাই যেকোনো বর্ণের লোক অতি সহজে তাদের সঙ্গে মিলে মিশে যেতে পারে। জন্মলগ্ন থেকেই তাদের দারিদ্র্যের মাঝে বসবাস করতে হচ্ছে এবং এখান থেকে বের হয়ে আসার তেমন কোনো প্রচেষ্টা তাদের মধ্যে দেখা যায় না। পুরাণ অনুসারে তাদের জন্মকাহিনি হলো, তারা ব্রাহ্মণ পরিবারভুক্ত বিধবা নারীর গর্ভে শূদ্রের ঔরসজাত সন্তান। তাই ব্রাহ্মণ্যবাদীদের চোখে জন্ম থেকেই অভিশপ্ত বলে তারা মানুষের মলমূত্র পরিষ্কার কাজ করতে থাকে। তবে এটা যে ব্রাহ্মণ পণ্ডিতেরা দুরভিসন্ধিমূলকভাবে প্রচার চালিয়েছিল এবং প্রথাটি চালু করেছিল, তা বলার অপেক্ষা করে না।
মুসলিম রাজত্বকালে তাদের প্রধান পেশা ছিল ঝাড়ূদারের কাজ। এ ছাড়া মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামির ফাঁসির কার্য সমাধানের জন্য মুসলিম শাসকেরা তাদের জল্লাদের চাকরিতেও নিযুক্ত করেছিল। সম্রাট শাজাহানের রাজত্বকালে তাদের নাগরিকদের বাড়িতে বাড়িতে নিযুক্ত করা হতো। বাড়ির দেখাশোনা ও পরিচ্ছন্নতার কাজের ফাঁকে তাদের যে কাজটি করতে হতো তা হলো, বাড়ির দাস-দাসী থেকে গোপন তথ্যসংগ্রহ করে তা নগর পুলিশ প্রধান ও কোতোয়ালকে জানানো। ইউরোপীয়রা এ দেশে বসবাস শুরু করার পর তাদের মধ্যে থেকে গৃহপরিচালক বা রাঁধুনি নিযুক্ত করে থাকে। তবে তাদের একটা অংশকে ভারতের উত্তর প্রদেশ থেকে ধরে নিয়ে আসে ব্রিটিশ সরকার এবং মেথরের কাজে নিযুক্ত করে। সেই থেকে তাদের বড় অংশই মেথরের কাজ করে যাচ্ছে। এ ছাড়া তারা বিভিন্ন সরকারি ও বেসরকারি অফিসে ধোয়ামোছা ও ঝাড়ূদারের কাজ করছে। আবার কেউ কেউ গার্মেন্টসহ বিভিন্ন কলকারখানায় চাকরি করছে।
লালবেগিরা প্রাচীন সংস্কৃতির উত্তরাধিকারী। তারা এমন কিছু আচার-অনুষ্ঠান পালন করে, যা হিন্দুধর্মের সঙ্গে মিল, আবার কিছু ক্ষেত্রে মুসলমানের সঙ্গে মিল। যেমন তারা নামাজ পড়ে, কিন্তু মসজিদে যায় না। রোজা রাখে কম। তারা গুরুত্ব দিয়ে বছরে একটি ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালন করে থাকে, যা হিন্দুধর্মের সঙ্গে মেলে। যেমন দিওয়ালি ও হোরি উৎসব উদ্যাপন। এই উৎসব উপলক্ষে তারা পাঁচ গম্বুজ বিশিষ্ট মসজিদের একটি নমুনা বানায় মাটি দিয়ে। এ রকম একটি মসজিদ গজনির গড়ে এখনো বিদ্যমান। উৎসবের দিন এই মসজিদ প্রাঙ্গণে ভক্তদের মাঝে পোলাও, শরবত ও মিষ্টি, শিন্নি হিসেবে দেওয়া হয়।
তাদের বিয়ের আচার-অনুষ্ঠান আংশিকভাবে মুসলমানদের ও আংশিকভাবে হিন্দুদের সঙ্গে সাদৃশ্য আছে। মুসলমানদের মতো বিয়ের ঘটকালি করে জনৈক বয়স্ক নারী। মুসলমানদের মতো বিয়ের কাবিন দেওয়ার রীতি নেই। তবে বিয়ে পড়নোর সময় বর ও কনে উভয়কে ইশারা ইঙ্গিতে মত দিতে হয়। বরকে প্রতিশ্রুতি দিতে হয় সে দ্বিতীয় স্ত্রী গ্রহণ করবে না। মুসলমানদের বিয়ের রীতি অনুযায়ী তাদেরও বিয়ের আগের দিন কান্দুরী অনুষ্ঠান করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানে কোনো আচার্য ব্রাহ্মণ বা মৌলভির দরকার হয় না। বংশের প্রবীণ ব্যক্তিরা এই কাজটি সারেন। তাদের বিয়েতে একটা নির্দিষ্ট অঙ্কের টাকা তাদের পঞ্চায়েতপ্রধানকে দিতে হয়।
লালবেগিরা বাঙালিদের মতো খাবার খায়। ভাত, রুটি, মাছ শাক-সবজি, হাঁস, মুরগি খায়। অনেকে গরুর মাংস খায়। আবার কেউ কেউ শূকরের মাংসও খায়।
তাদের শেষকৃত্য অনুষ্ঠান একটু ভিন্ন রকমের। তারা মুসলমানদের কবরস্থানে কবর দেয় না। কোনো জঙ্গলের মতো জায়গায় কবর দেয়। পাঁচ টুকরা কাপড় দিয়ে মৃতদেহকে জড়ানো হয়। দুই বাহুর নিচে রুমালের মতো ছোট কাপড় রাখা হয়। এরপর মৃতদেহকে ব্লাউজের মতো একটি কাপড় পরিয়ে দেওয়া হয়। কবরের চারপাশে চারটি আগরবাতি জ্বালানো হয়।
রাউত
ডোমদের মতো রাউতরাও নিচু বর্ণের। তবে অর্থনৈতিকভাবে রাউতরা কিছুটা সচ্ছল। তাদের পুর্বপুরুষেরা দেখিয়া বা কুকুর পালক হিসেবে পরিচিত ছিল। আবার অন্য এক তত্ত্ব অনুযায়ী তাদের আদি পেশা ছিল বাঁশ ও বেত দিয়ে ঝুড়ি, কুলা, খাঁচি ও ঝুড়ি বানানো। রাউতদের একটা অংশ যারা কর্মনাশা নদীর তীরে বসবাস করত, তারা জাহাজের খালাসি হিসেবে ঘুরে বেড়াত এক বন্দর থেকে আরেক বন্দরে। এভাবে ভাসতে ভাসতে বাপ-দাদার ভিটেমাটি ছেড়ে এই দেশে এসে বসবাস শুরু করে। আবার অনেকেই এই দেশে আগে থেকেই বসবাস করে আসছিল। তবে রাউতদের একসময় ব্রিটিশ সরকার জোর করে ধরে নিয়ে এসে মেথর হিসেবে নিযুক্ত করে। আবার অনেককে তাদের বাসাবাড়িতে কুকুর-বিড়ালের তত্ত্বাবধান করার জন্য নিযুক্ত করে। বর্তমানে তারা ঢাকা সিটি করপোরেশনে পরিচ্ছন্নতাকর্মীর চাকরি করছে। আবার কেউ কেউ সরকারি ও বেসরকারি বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে নিম্নপদে চাকরি করছে।
তাদের নিজেদের বিবরণ অনুসারে তারা দুই শাখায় বিভক্ত। দেশের উত্তরাঞ্চলে যারা বসবাস করে, তাদের সঙ্গে দক্ষিণাঞ্চলে যারা বসবাস করে, তাদের বৈবাহিক সম্পর্ক হয় না। তেমন মেলামেশাও নেই। ধর্ম পালনের দিক দিয়েও একটা অংশ হিন্দুধর্মাবলম্বী, অন্য অংশ মুসলমান। মুসলমান রাউতরা তাদের সন্তান-সন্ততিকে (পুরুষ শিশুকে) খতনা করায়। নামাজ পড়ে ও রোজা রাখে। মৃত্যুর পর তাদের সর্বসাধারণের কবরস্থানে কবর না দিলেও, মুসলিম রীতি অনুযায়ী কবর দেওয়া হয়। আবার মুসলমানদের মতো তারাও মদ ও শূকরের মাংস খায় না। অন্যদিকে হিন্দু রাউতরা তাদের শিশুসন্তানকে খতনা করায় না। দেব-দেবীর পূজা করে। তাই রাউতদের মধ্যে ধর্ম পালনের দিক দিয়ে এই বিভক্তি থাকায় তারা একে অন্যকে পছন্দ করে না। ভারতের অধিকাংশ রাউতেরা চাষাবাদ করে, কিন্তু আমাদের দেশে রাউতরা বেশির ভাগ ক্ষেত্রে চাকরি-বাকরিই করে থাকে। যারা হিন্দুধর্মালম্বী রাউত, তারা শ্রাবণ মাসে প্রধান ধর্মীয় উৎসব উদ্যাপন করে থাকে। অন্য দলিতদের মতো সবাই মিলে জঙ্গলে গিয়ে বান্দী দেবীর উদ্দেশে শূকর বলিদান করে।
অন্য গোত্রগুলোমতো তাদেরও বিয়েতে জাতিভেদপ্রথা প্রবল। ভিন্ন গোত্রের সঙ্গে এমনকি রাউতদেরই একাংশের সঙ্গে অন্য অংশের বিয়েশাদি তারা মেনে নেয় না। যদি একান্ত প্রেমের টানে কারও মধ্যে বিয়েশাদি হয়, তাহলে তাকে পঞ্চায়েত ডেকে এক ঘরে করা হয় অথবা গোত্র থেকে বের করে দেওয়া হয়। হিন্দু রাউতদের বিয়েশাদি নিচু শ্রেণির শূদ্রদের মতোই হয়। বিয়ের দিন বর যায় হেটে, আর কনে যায় কোনো যানবাহনে আরোহণ করে। আর মুসলমান রাউতদের বিয়েশাদি মুসলিম রীতিতেই হয়। তবে তাদের বিয়েতে কাবিন করা হয় না, তবে বরকে স্ত্রীর ভরণপোষণের প্রতিশ্রুতি দিতে হয়।
হিন্দু রাউতদের শেষকৃত্যানুষ্ঠান একটু ভিন্ন ধরনের। মৃত্যুর পর পরিচ্ছন্ন চাদরে শবদেহ জড়িয়ে নিয়ে যাওয়ার সময় তারা বলে রাম নাম সত্য হয়। জঙ্গলে যাওয়ার সময় একটি শূকর সঙ্গে নিয়ে যায়। বান্দী দেবীর উদ্দেশে এটি উৎসর্গ করা হয়। মৃতদেহ সৎকার করার পর ঘরে ফিরলে সবাইকে দেওয়া হয় এক গ্লাস করে শরবত। তারপর সবার হাতে হাতে মদের গ্লাস ঘুরতে থাকে। পরের দিন একটি পাথরের ওপর মৃত ব্যক্তির নাম লিখে নিয়ে তার ওপর দুধ ঢালা হয়। দুধ গড়িয়ে পড়ে মাটিতে। তাদের বিশ্বাস, এতে মৃত ব্যক্তির আত্মা দুধের মতো সাদা হয়। সাত দিন পর তারা সত্তিনীপূজা করে। পূজা করার আগে আত্মীয়স্বজন সবাই মিলে একসঙ্গে নদীতে গিয়ে স্নান করে। এই সাত দিনের মধ্যে আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে রান্না হয়, তবে মৃত ব্যক্তির বাড়িতে রান্নাবান্না হয় না। কিন্তু তারা কেউ ক্ষৌরকর্ম করে না। ১০ দিনের দিন মৃত ব্যক্তির বাড়িতে একটি ভোজের আয়োজন করা হয়। যাকে বলা হয় দশমী ক্রিয়া। সেই দিন তারা সবাই দাড়ি-গোঁফ কামায় এবং উৎসবের পোশাক পরে। তারপর চলে মদপানের অনুষ্ঠান। মৃত্যুর প্রথম বার্ষিকীতে এ রকম আরেকটি অনুষ্ঠান হয়ে থাকে। (চলবে)

আরো খবর

Disconnect