ফনেটিক ইউনিজয়
বাংলাদেশের রাজনীতিকদের বোলচাল ও অপরিণামদর্শিতা

আজ থেকে বহু বছর আগে সম্ভবত ১৯৫০-এর দশকে স্কুলজীবনে মেঠো ভাষায় একটি প্রবাদ শুনেছিলাম, ‘রাজার পুতে আতি মাইরা লাজে না করে রাও/ তাঁতির পুতে বাতি মাইরা ভূমিত না রাখে পাও’। চলিত বাংলায় এর অর্থ এই যে, ‘বাঘ শিকারে যেয়ে রাজার ছেলে হাতি মেরে ফেলে, এই লজ্জায় সে রা করে না। যদিও তাঁতির ছেলে এক চড়ূই পাখি মেরে এমনই লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিল যে মাটিতে তার পা-ই ঠেকে না’। অভিজাতের একটি পরিমিতি বোধ থাকে, যেটা সাধারণের কাছে আশা করা যায় না। আমাদের রাজনীতিকেরা অবশ্যই অভিজাত। তাঁদের কাছ থেকেও আমরা সে ধরনের বোলচালই আশা করি। একজন অজ্ঞাতনামা কবি বলেছেন, ‘গাছে ফল ধরে যত/ নত হয়ে বিলায় তত/ নিজে খায় না’। রাজনীতিকদের মনে রাখা দরকার যে তাঁদের পরিশ্রমের ফল জনকল্যাণার্থে, নিজের ভোগের জন্য নয়। এ কথাটা আমাদের রাজনীতিকেরা প্রায়ই ভুলে যান বলেই তাঁদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ ওঠে। ফলত সরকার দুর্বল হয়।
পদ্মা সেতু নির্মাণের জন্য বিশ্বব্যাংকের অর্থসাহায্য দেওয়ার কথা ছিল। সাহায্য দেওয়ার আগেই দুর্নীতির অভিযোগ এনে বিশ্বব্যাংক তা দিতে অস্বীকৃতি জানায়। তখন আমিও একটি জাতীয় দৈনিকে লিখেছিলাম, আমাদের খরচেই পদ্মা সেতু নির্মাণ করা যায়। যাহোক। বিশ্বব্যাংকের সে অভিযোগ বাংলাদেশের ও কানাডার আদালতেও টেকেনি। ইতিমধ্যে বাংলাদেশ নিজ খরচেই পদ্মা সেতু নির্মাণের কাজ শুরু করে। ভালো কথা। কিন্তু কাজ শুরুর সঙ্গে সঙ্গে সরকারের কতিপয় কর্তাব্যক্তি ও বুদ্ধিজীবী এমন সব লম্ফঝম্ফ শুরু করে দিলেন, যা দেখে ও শুনে মনে হলো তাঁরা বিশ্বব্যাংককে এক হাত দেখে নেবেন। যে ভাষায় তাঁরা বিশ্বব্যাংককে আক্রমণ করলেন, তা শুনে মনে হয়েছে যেন পৃথিবীর আর কোনো দেশ বিশ্বব্যাংকের সাহায্য ছাড়া এ মাপের বা এর চেয়েও বড় মাপের কোনো সেতু নির্মাণ করেনি। আত্মম্ভরিতারও একটা সীমা থাকে।
কানাডার আদালতে পদ্মা সেতু দুর্নীতি মামলায় বিশ্বব্যাংক হেরে যাওয়ার পর সরকারের এক প্রবীণ মন্ত্রী বলেছেন, ‘এবার বিশ্বব্যাংককে কান ধরে উঠবস করতে হবে।’ মামলায় এক পক্ষ হারবে, এক পক্ষ জিতবে। এটাই স্বাভাবিক। মামলায় হেরে গেল বলে বিশ্বব্যাংককে কান ধরে উঠবস করতে হবে কেন? তিনি কি জানেন না, বিশ্বব্যাংক থেকে এর আগে ও পরে বাংলাদেশ উন্নয়ন সাহায্য নিয়েছে এবং নিচ্ছে? একজন মন্ত্রী পদমর্যাদার লোকের মুখে এ কথা বেমানান। বিশ্বব্যাংক একটি শক্তিশালী ও প্রভাবশালী বিশ্ব সংস্থা। প্রায় সাত দশক আগে থেকে বিশ্বের উন্নয়নশীল ও স্বল্পোন্নত দেশগুলোয় ঋণদানের জন্য কাজ করছে বিশ্বব্যাংক। এ সংস্থার তহবিলের জোগান আসে প্রভাবশালী ও বিত্তশালী উন্নত দেশগুলো থেকে। এ কারণে, আমরা চাই আর না চাই, এর পরিচালনার ক্ষেত্রেও তাদের প্রভাব থাকে। যেমন বিশ্বব্যাংকের প্রধান কে হবেন, তা ঠিক করেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট। সুতরাং এ সংস্থা সম্বন্ধে কিছু বলার আগে কোনো রাষ্ট্রের দায়িত্বশীল ব্যক্তিকে এসব মাথায় রাখতে হয়। অন্যথায় আক্রমণকারী দেশকে বিশ্বে বন্ধুহীন হওয়ার ঝুঁকি মাথায় নিতে হবে।
প্রায় ৪৭ বছর আগে পাকিস্তানের সঙ্গে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের পর এখনো উভয় দেশের মধ্যে সম্পর্ক স্বাভাবিক হয়নি। পক্ষান্তরে ভিয়েতনামের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের রক্তক্ষয়ী দীর্ঘ লড়াইয়ের পর এখন দুদেশের সম্পর্ক বন্ধুত্বপূর্ণ। যুক্তরাষ্ট্র ও চীনের মধ্যে এশীয় প্যাসিফিক অঞ্চলে অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতা সত্ত্বেও পাকিস্তানের সঙ্গে উভয় দেশেরই সম্পর্ক বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের আগ থেকেই হৃদ্যতাপূর্ণ। স্মর্তব্য যে ১৯৬৯ সালে যুক্তরাষ্ট্রের তদানীন্তন সেক্রেটারি অব স্টেট হেনরি কিসিঞ্জার চীনের সঙ্গে সম্পর্ক উন্নয়নের লক্ষ্যে পাকিস্তানের পেশোয়ার থেকে গোপনে চীন সফরে গিয়েছিলেন। তাঁর মিশন সফল হয়েছিল। এমন দুটি পরাশক্তির সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্ক যেখানে হৃদ্যতাপূর্ণ, সেখানে বাংলাদেশের উচিত ছিল পাকিস্তানের সঙ্গে সম্পর্ক ঝালাই করে নেওয়া।
বাংলাদেশ শুরু থেকেই বলে এসেছে, ‘আমাদের পররাষ্ট্রনীতি হলো সবার সঙ্গে বন্ধুত্ব, কারও সঙ্গেই বৈরিতা নয়।’ এরই ধারাবাহিকতায় বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী শেখ মুজিবুর রহমান পাকিস্তান বাংলাদেশকে স্বীকৃতি দেওয়ার আগেই ১৯৭৪ সালে ওআইসি সম্মেলনে যোগ দিতে লাহোর গিয়েছিলেন। কিন্তু এরপর পাকিস্তান বাদে অন্যদের খুশি করতে গিয়ে বাংলাদেশ সবাইকেই হারিয়েছে। আজ রোহিঙ্গা প্রশ্নে বাংলাদেশের সংকটকালে নিকট প্রতিবেশী দেশ চীন, রাশিয়া এমনকি ভারতও নেই।
আরেকটি ভাবার মতো বিষয় হলো বাংলাদেশের ষোড়শ সংশোধনী বাতিলের রায়টি। প্রধান বিচারপতিসহ সাতজন বিচারপতি সর্বসম্মতিক্রমে রায়ের সঙ্গে দেশের রাজনৈতিক-সামাজিক পরিস্থিতি সম্মন্ধে কিছু পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেছেন। পর্যবেক্ষণগুলো নতুন কিছু নয়। দেশের রাজনীতিক ও বুদ্ধিজীবীরা বিভিন্ন সেমিনার সিম্পোজিয়াম, দৈনিক পত্রিকার কলাম বা মধ্যরাতের টেলিভিশন টক শোতে হরহামেশা এসব নিয়ে আলোচনা করেন। তবে বিষয়গুলো দেশের শীর্ষ বিচারালয়ের রায়ের সঙ্গে এসেছে বলে তা ভিন্ন মাত্রা বহন করে। তবে পর্যবেক্ষণগুলো খেলো নয়, যথার্থ। কিন্তু যেহেতু পর্যবেক্ষণগুলো সরকারের অবস্থানের বিপক্ষে গিয়েছে, তাই প্রধান বিচারপতিকে সিঙ্গেল আউট করে সরকারপক্ষের প্রবীণ-নবীননির্বিশেষে মন্ত্রী-এমপিরা যা মুখে আসে তা-ই বলে সংসদের ভেতরে ও বাইরে নাম ধরে আক্রমণ করেছেন। এক তরুণ এমপি বলেছেন যে ‘এ রায় একটি ইরেজি পত্রিকার সম্পাদক লিখে দিয়েছেন।’ এক প্রবীণ মন্ত্রী বলেছেন, ‘সিনহা তুমি পাকিস্তান চলে যাও।’ আরও কত কী। সরকারের সর্বাপেক্ষা প্রবীণ মন্ত্রী প্রধান বিচারপতি সম্পর্কে বলেছেন, ‘সরকারই তাঁকে চাকরি দিয়েছে এবং বেতন দেয়।’ প্রশ্ন হলো, আগে তাঁরা কি জানতেন না এই বিচারপতি রায় লিখতে জানেন কি জানেন না? একজন প্রধান বিচারপতিকে যে দেশে এমন ভাষায় অপমান করা হয়, সে দেশ সম্বন্ধে বহির্বিশ্বে কী ধারণা হতে পারে, সেটা তাঁরা ভেবে দেখেননি।
সম্প্রতি হলি আর্টিজান বেকারির ঘটনার পর সরকার প্রায় প্রতিদিন র‌্যাব ও পুলিশ দিয়ে ‘জঙ্গি’ দমনের নামে অসংখ্য অভিযান চালিয়ে বহু লোককে গ্রেপ্তার ও হত্যা করছে। পশ্চিমারা জঙ্গি বলতে মুসলমানদেরই বোঝে। এসব অভিযোগ কতটা সত্য, সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারাই ভালো বলতে পারবেন। ক্ষতি যেটা হয়েছে, সেটা হলো প্রথমত মুসলমানরা জঙ্গি এবং দ্বিতীয়ত বাংলাদেশ একটি উদীয়মান জঙ্গি রাষ্ট্র! প্রাণ সম্বল করে মিয়ানমার থেকে পালিয়ে আসা মুসলমানদেরও এই মর্মে সন্দেহ করা হচ্ছে যে এরা আজ না হলেও ভবিষ্যতে জঙ্গি হবে। সরকারের কর্তাব্যক্তিরা বুঝতে চাইছেন না যে এটা মুসলমানদের নির্বীর্য করার একটা হীন চক্রান্ত।
দেশের প্রধান দুটি দলের নেতা-কর্মীরা একে অন্যকে এমন ভাষায় আক্রমণ করেন যে তাঁরা নিজেদের দলীয় নেতা-কর্মী ও বুদ্ধিজীবীদের বাইরে জনগণের আস্থা হারান। তাঁরা একে অন্যকে ‘চোর’ বলে সম্বোধন করেন। এ দুই দলই পালাক্রমে ক্ষমতায় আসে। তাদের উভয় পক্ষেরই উভয়ের ফাইল ও আনুষঙ্গিক দলিলপত্র দেখার সুযোগ হয়। তাই জনগণ যদি তাদের কথা বিশ্বাস করে, তবে কি ভুল হবে? তাই এই ‘চোর’-এর রাজত্ব কে চায়? বহির্বিশ্বেও তারা ‘চোর’ বলেই খ্যাত হয়। সাধারণ জনগণ এসব ‘চোর’-এর কারও সঙ্গে নেই।
দেশের রাজনীতিকদের হাজারো অতিকথন, অশোভন ও দায়িত্বহীন অদূরদর্শী কথন ও আস্ফালন এবং সেই সঙ্গে জঙ্গি দমন কর্মকা-ের উল্লেখ করা যায়। রাজনীতিকদের এসব বোলচাল দেশের ভেতরে ও বাইরে দেশ সম্পর্কে নেতিবাচক ধারণার জন্ম দিয়েছে। এসব দায়িত্বহীন কর্মকা- ও কথন বাংলাদেশের সমাজকেও কলুষিত করেছে। রাজনীতিকদের এসব অপরিণামদর্শিতার কারণেই কি রোহিঙ্গা মুসলমান সমস্যার উদ্ভব কিংবা রোহিঙ্গা মুসলমান ইস্যুতে বিশ্বে আজ বাংলাদেশ বন্ধুহীন? ব্যাপারটি আমাদের ভেবে দেখা জরুরি।              
লেখক : অর্থনীতির অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক
বিসিএস সাধারণ শিক্ষা কাডার

Disconnect