ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘কুনদিন জানি মইরা যামু’
দীপংকর গৌতম

বিআরটিসির ডাবল ডেকার বাস। শাহবাগ-প্রেসক্লাব-গুলিস্তান বলে চেঁচাচ্ছিলেন বাসের হেলপার। শুক্রবার। আমাদের যেতে হবে প্রেসক্লাব। দ্রুত উঠে পড়া। পেছন দিকটায় অনেক সিট খালি। এর এক সিটে বসে আছেন এক নারী। চুপচাপ। রোদ পোড়া বরণে বয়সের ছাপ। কপালে বড় সিঁদুর। ঝোলা ব্যাগ সঙ্গে। মাথায় জট। চোখ ভরা নেশা। মনে হয় কতকাল যেন ঘুম নেই। পারতপক্ষে কথা বলেন না। কিন্তু তাঁর সঙ্গে কথা বলতে আমি মরিয়া।
এমন জীবন যারা বেছে নেয়, তাদেরও তো একটা ব্যাখ্যা আছে। কী সেটা? দক্ষিণ ভারতে দেবদাসী প্রথা এখনো রয়েছে। পঞ্জিকায় দিনক্ষণ দেখেন ব্রাহ্মণ। তারপর বাবা-মা অর্থসংকটে মেয়েকে বিয়ে না দিতে পেরে ভগবানের কাছে দান করে যান। ভগবান এ ক্ষেত্রে ভিন্নরূপী। স্বরূপে আসেন না, থাকেন ব্রাহ্মণদের মধ্যে। মেয়েটা ভগবানের নামে উৎসর্গ করার পর সে অস্পৃশ্য থাকে না। বছর বছর বাচ্চা হয়Ñকত রকমে তাকে ব্রাহ্মণেরা ভোগ করেন, ঠিক নেই। তবু রা শব্দটি হবে না। কারণ, ভগবান পাপ দেবেন স্বর্গে বসে। আর মর্তে ব্রাহ্মণেরা। এই নারী ভিন্ন নামে আসলে দেবদাসী কি না, জানতেই কথা বলার আগ্রহ। তাঁর কথা জানতে পাশে বসে নমস্কার জানাতেই তিনি খুশি হলেন। আমার সঙ্গী তরুণ সাংবাদিক অজিত। কেবল বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বের হয়েছে। আমাদের দুজনের ভক্তি তাঁকে মুগ্ধ করেছিল। কোথায় থাকেন? জিজ্ঞেস করতেই উত্তর যা দিলেন, তালিকা অনেক বড়। শুক্র, শনিবার পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে। ইব্রাহিমপুর, বারোদী, জামালপুরসহ ভারতের বিভিন্ন তীর্থে। তাঁর কোথাও ভিসা বা ভাড়া লাগে না। যাওয়ার আগে তিনি অনেক মালা নেন। ত্রিশূল নেন। হাতে রুদ্রাক্ষ। সাজ একটা না নিলে কেউ মানবে কেন? বলতে বলতে হেসে ফেলেন। এত বড় জট হলো কীভাবে? জিজ্ঞেস করলে বলেন, বাবার আশীর্বাদে। বাবা স্বপ্ন দেখানোর পর এক রাতের ভেতরেই জট হইয়া গেল।
বাবা কে?
লোকনাথ ব্রহ্মচারী। বাবা আমার সঙ্গে কথা বলেন। এটা সব ভক্তই জানে। প্রথমে বাবা রেগে ছিলেন। বলতেন, তুই আমার গায়ে পা দিছস। আমি একদিন বেলগাছের নিচে বসছিলাম। ওই সময় বাবার গায়ে পা লাগছিল। বহুদিন পর বাবার রাগ ভাঙছে। এবার জিজ্ঞেস করলামÑ
বাড়িতে যান?
না।
ছেলেমেয়ে?
দুইজন। বিয়ে হয়ে গেছে। কারও সঙ্গে যোগাযোগ নাই।
স্বামী থাকেন কোথায়?
বাড়িতে।
বাড়ি কোথায়?
জামালপুর।
একা থাকেন?
কত সময় চুপ করে থেকে তিনি কেঁদে ফেলেন। বলেন, বাবা তিনি বহু আগে নতুন ঘর করেছেন (বিয়ে)। সে ঘরে তিন ছেলেমেয়ে। বাবায় স্বপ্ন দেখাইছে কবে? স্বামী নতুন বিয়ে করার আগে না পরে। তিনি উত্তর দেন, পরে। এ কথা বলার পরেই তিনি মূলত সব কথা বলার জন্য ব্যাকুল হয়ে পড়েন।
বাবা-মা শখ করে বিয়ে দিছিল। স্বামী বড়লোক ছিল না। কিন্তু যা আয় করত, তাতে ভালোমতো চইলা যাইত। মাঝেমধ্যে গায়ের রং কালো বা বাপের বাড়ি থেকে যৌতুক দেয় নাই, এ জন্য রাগারাগি করত। এর মধ্যেই সন্তান হইলো দুইজন। তারা বড় অইল, বিয়া দিলাম। দিনে দিনে সে আমারে মারধর করতে শুরু করল। আগে বকত বা গালাগালি করত। আমি ধীরে ধীরে শুনি তিনি আরেকজনের সাথে ঘর করার আয়োজন করছে। মাঝেমধ্যে রাতে আসত না। জিজ্ঞেস করলেই মারত। কত মানুষের দুয়ারে, মন্দিরে সাধু বাবাগো কাছে গেছি। কিন্তু তার মন ফেরেনি। গ্রামের কত লোক সালিস কইরা দিছে। ঘরে যাইতে না যাইতে আবার মারছে। পরে একদিন এক সাধু বুঝাইলো, যে তোরে রাখতে চায় না, তার পিছে এভাবে ছোটস কেন? শুইনা বাড়ি আইলাম। সেদিন রাতে আমারে মাইরা ঘর থেকে বাইর কইরা দিল। আমার ছেলেমেয়ে তারাও তাদের মায়ের খোঁজ নিল না। আমার তো ঘর থাকল না। সেই রাতে গ্রামের একবাড়ি থাকলাম। তারপর থেকে শ্মশানে-মন্দিরে পইরা থাহিরে বাবা, কুনদিন জানি মইরা যামু। কেউ জানবে না। এইডা কুনো জীবন? কবে যে ঠিকমতো ঘুমাইছি কইতে পারতাম না বাবা। মন্দিরেও খারাপ মানুষ থাকে। সবার হাত থেকে বাঁচতে এই রূপ ধরছি। কোনো শান্তি নাই। কত পাপ যে করছি।
তাঁর কান্নার সুর স্পষ্ট হতে থাকে। রাস্তা ফুরিয়ে যায়। আমি তাঁর হাতে কয়টা টাকা দিয়ে কিছু খেতে বলি। তিনি আমার মোবাইল নম্বর চান। নম্বর লিখে দিয়ে কথা বলতে বলতে প্রেসক্লাব এলাকায় নেমে পড়ি। শ্মশানচারী চমকা শীল তখন গাড়ির জানালা দিয়ে তাকিয়ে থাকতে থাকতে অদৃশ্য হয়ে যান। আমি অজিত মিশে যাই, রাজধানীর জনারণ্যে।

Disconnect