ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘গরিবের জন্য এ দেশে সব নিষিদ্ধ’
দীপংকর গৌতম

বাংলাদেশ পাখ-পাখালি, জল-জঙ্গলের দেশ, নদী মেখলা, বিল-বাঁওড়ের দেশ। আশ্বিন মাস শেষ হতেই বিশ্বের শীতপ্রধান দেশগুলোয় বরফ গলতে শুরু করে। অমনি ওই দেশের পাখপাখালিরা শীতের হাত থেকে বাঁচতে আমাদের দেশে পাড়ি জমায়। মূলত সাইবেরিয়া, মঙ্গোলিয়া, চীন ইত্যাদি সুদূরের শীতপ্রধান দেশ থেকে আমাদের দেশে আসে। কারণ শীতের সময় এসব দেশে অতিরিক্ত শীত পড়ে। সে সময় দেখা দেয় তীব্র খাদ্যসংকট। ফলে হাজার হাজার মাইল দূর থেকে আমাদের দেশে পাড়ি জমায় পরিযায়ী পাখিরা। এরপর স্থান করে নেয় আমাদের আশপাশের জলাশয়, দিঘি, বিল, হাওর ও পুকুরে। নগরে অতিথি পাখিদের বিচরণক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাস। জলাশয়ের মধ্যে হাকালুকি, চলনবিল, টাঙ্গুয়ার হাওর, বগুড়ার শিবগঞ্জ উপজেলার বিহার ইত্যাদি জায়গায় বেশি দেখা মেলে এসব অতিথি পাখির।
পাখি বিষয়ে বাংলার মানুষের ভালোবাসা ভিন্ন রকমের। প্রাচীনকাল থেকে কার্তিক মাসে ধান কাটার পর যে নবান্ন অনুষ্ঠিত হয়, সে উৎসবে খুব ভোরে বাড়ির ছেলেমেয়েরা একসঙ্গে কোনো এক গাছতলায় গিয়ে বসে কাককে নেমন্তন্ন করে। সুর করে তারা গায়, ‘কাউয়া কো কো কো, আমাগো বাড়ি আইও, একটা একটা করা দেব পেটটা ভরে খাইয়ো।’ এবং লক্ষণীয় যে কাককে না খাওয়ানো পর্যন্ত কেউ নবান্ন স্পর্শ করত না। পশু-পাখি-নিসর্গপ্রেমী বাঙালির এমন বহু উৎসব নাগরিক জটিলতায় আটকে গেলেও যতটা রয়েছে, তা কম নয়। কিছু অসাধু পাখি ব্যবসায়ী ও শিকারিদের উপদ্রবে অতিষ্ঠ এসব অতিথি পাখিরা।
শীতের পাখি আসতে শুরু করার সঙ্গে সঙ্গে হাওর এলাকায় নানা রকমের জাল, পিঞ্জর, ফাঁদ তৈরির প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। পাখি শিকার মানেই নিষ্ঠুরতা, অমানবিকতা আর নৃশংসতা। বাজারে দশ-বিশ-একশ টাকায় পরিযায়ী পাখি বিক্রি হতে দেখা যায়। রাতের বেলা জালের সাহায্যে ফাঁদ পেতে বন্দি করা হয় পাখিদের। দিনে এয়ারগান, বন্দুক এসব ব্যবহার করে মারা হয়। এখানে একটি ব্যাপারে দৃষ্টি দেওয়া দরকার যে পাখি শিকারের অস্ত্র হিসেবে প্রধানত এয়ারগান ব্যবহার করা হয়। কার্যকারিতার দিক থেকে পাখি মারা ছাড়া আর কোনো কাজে এয়ারগানের ব্যবহার নেই। এয়ারগান কেনা আর লাইসেন্স করার উদ্দেশ্য একটাই-পাখি শিকার। আমাদের কর্তাব্যক্তিরা এসব যে জানেন না, তা নয়। কিন্তু সব জেনেও কেন এয়ারগান ব্যবহার অবৈধ ঘোষণা করা হচ্ছে না?
আশির দশকে এ দেশে আসা পাখির সংখ্যা ছিল প্রায় ৩০০ প্রজাতির। কিন্তু বর্তমানে এর সংখ্যা নেমে এসেছে ৭০-৮০ প্রজাতিতে। পাখি-বিশেষজ্ঞদের মতে, এভাবে পাখি নিধন পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর। এ জন্য শুধু পরিযায়ী পাখি নয়, দেশে সব ধরনের পাখি নিধন আইনত নিষিদ্ধ করা হয়েছে। কিন্তু কে মানছে এ আইন? বাস্তবে এ আইনের কোনো প্রয়োগ নেই।
বনানী কামাল আতাতুর্ক এভিনিউতে সুপার মার্কেটের দ্বিতীয় গেটের কাছে বিকেলে পড়ন্ত আলোয় প্রায়ই পাখি বিক্রি করতে দেখা যায় শহীদকে। পুরো নাম শহীদুল ইসলাম। হাতে দু-তিনটা পাখি নিয়ে লোক দেখলেই তিনি রুমালের মতো পাখি ওড়ান, আস্তে করে পাখি শব্দ করে। ক্রেতারা এগিয়ে যায়। ছালার ভেতরে পাখির লোহার খাঁচা ঢুকিয়ে তিনি এমনভাবে পাখি বিক্রি করেন যে টের পাওয়া কঠিন। গাজীপুর থেকে তিনি আসেন। তাঁর বাড়ি কাপাসিয়ায়। নেত্রকোনার বিভিন্ন বাঁওড় থেকে আসে তাঁর পাখি। ক্রমে সব খবর জানতে জানতে যখন জিজ্ঞেস করি, পাখি মারা যে নিষিদ্ধ, আপনি জানেন না? তিনি উত্তর দেন-
‘জানি। গরিবের জন্য এ দেশে সব নিষিদ্ধ। পাখি ধরতে যারা টাকা নেয়, তারা সরকারি লোক। আমি যে এখানে পাখি বেচি, তাও সরকারি লোক টাকা খায়। হেগোর তো কিছু হয় নাই। আমরা গরিব মানুষ, আমাগো পরে যত আইন। ওই যে যানজট, তা কি গরিবরা করে? গুলশান-বনানীর ধনীরা এত বড় দালান বানানোর টাকা পায় কই? তাগোরে সরকার কিছু কয়? আমরা গরিবরা কি দ্যাশ ছাইড়া যামু? চালের দাম আমরা বাড়াই? খাবারে ফরমালিন আমরা দেই? তো পাখি বেইচ্চা দুইডা টাকা নিয়া ভাত খাই, পোলাপানরে খাওয়াই। আমরার প্যাডে লাতি না মারলে অয় না?’
আমি কোনো উত্তর দিতে পারি না। শহিদুল বলতেই থাকেন-
‘বিএ পাস কইরা চাকরি পাই নাই। ঘুষ দিতে পারি নাই। এহন সিজনে কয়ডা পাখি বেচি।’
তাঁর ছবি তুলতে গেলেই তিনি তাঁর হাতের পাখি বস্তায় ঢুকিয়ে সটকে পড়েন। আমি আকাশচুম্বী ভবন দেখি। আর শহীদের কথা ভাবতে থাকি। সন্ধ্যা নামে। থিয়েটারের পর্দার মতো নিয়ন আলো তীব্র হয়ে উঠলে বনানীর চেনা দৃশ্যপট হারিয়ে যায়। আমি নতুন পথে পা বাড়াই।

Disconnect