ফনেটিক ইউনিজয়
শ্রদ্ধাঞ্জলি
আনিসুল হক কেন বেঁচে থাকবেন

২০০৭ সালের ২৬ ডিসেম্বর দৈনিক যায়যায়দিন-এ একটি রিপোর্ট করেছিলাম, যার শিরোনাম ছিল ‘আধা কিলোমিটারের যন্ত্রণা’। রাজধানীর কারওয়ানবাজার রেলক্রসিং পার হয়ে সাতরাস্তা পর্যন্ত এই রাস্তাটি দিয়ে প্রতিদিন আমাকে অফিসে যাতায়াত করতে হতো। তখন এটিকে মনে হতো বিশ্বের সবচেয়ে যন্ত্রণাদায়ক সড়ক।
বস্তুত ওখানে সড়ক বলে কিছু ছিল না। প্রশস্ত এই রাস্তার তিন-চতুর্থাংশজুড়েই থাকত ট্রাক। যেন ওই পুরো সড়কটাই আসলে ট্রাক স্ট্যান্ড। তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে এই রাস্তাটি কিছুদিনের জন্য দখলমুক্ত করার চেষ্টা হয়েছিল। কিন্তু পরে সেটি আবার পুরোনো চেহারায় ফিরে যায়। অর্থাৎ সেনা-সমর্থিত সরকারও ট্রাক মালিক-শ্রমিকদের সঙ্গে পেরে ওঠেনি। কিন্তু এই রাস্তাটিকে দখলমুক্ত তো বটেই, মাঝখানে ডিভাইডার দিয়ে দুপাশে সুন্দর ফুটপাত এবং একটি অংশে দৃষ্টিনন্দন পাবলিক টয়লেট নির্মাণ করে ঢাকা উত্তর সিটির প্রয়াত মেয়র আনিসুল হক যে অসাধ্য সাধন করেছিলেন, তা এই মহানগরীর মানুষ বহু বছর মনে রাখবে।
যাঁরা এই রাস্তা দিয়ে নিয়মিত চলাচল করেন, তাঁরা জানেন আনিসুল হক মেয়র হওয়ার আগে এর কী বেহাল ছিল এবং ট্রাক শ্রমিকদের কী ভয়াবহ দৌরাত্ম্য এখানে ছিল। সেই দৌরাত্ম্য, মাস্তানি আর রাজনৈতিক প্রভাব-প্রতিপত্তির বিপরীতে দাঁড়িয়ে কী ভীষণ দৃঢ়চেতা আর সাহসিকতার সঙ্গে ওই পরিস্থিতি আনিসুল হক মোকাবিলা করেছিলেন, সেই বিরল দৃশ্যের সাক্ষী আমিও। সুতরাং ব্যক্তিগতভাবে তাঁর একজন শুভাকাক্সক্ষী না হোক, অন্তত এই মহানগরীর একজন নাগরিক হিসেবে আমার হৃদয়ে তিনি বেঁচে থাকবেন। তাঁর দৈহিক মৃত্যু হলেও এই মহানগরীর কোটি মানুষের যে ভালোবাসা, শ্রদ্ধা আর স্নেহ তিনি অর্জন করেছেন, তাতে আনিসুল হককে কোনোভাবেই মুছে ফেলা যাবে না। তিনি বেঁচে থাকবেন যুগের পর যুগ। তিনি প্রেরণা হয়ে থাকবেন ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য, যাঁরা সত্যিকারেই মানুষের জন্য কাজ করতে চান।
বাংলাদেশ টেলিভিশনের জনপ্রিয় ম্যাগাজিন অনুষ্ঠান ‘ইত্যাদি’তে একবার হানিফ সংকেত প্রখ্যাত শিক্ষাবিদ আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে প্রশ্ন করেছিলেন, ঢাকার মেয়র হলে আপনি কী করবেন? জবাবে সায়ীদ স্যার বলেছিলেন, ‘আমি এমন কাজ করব যাতে এই শহরে মানুষ পা রেখেই বুঝতে পারে যে এখানে একজন মেয়র আছেন।’ আনিসুল হক মেয়র হওয়ার পর আমরা সত্যিই বুঝতে শুরু করেছিলাম যে এই শহরে একজন মেয়র আছেন।
আনিসুল হক সেসব বিরল প্রতিভাধর মানুষের একজন, যাঁরা যেখানে হাত দেন, সেখানেই সোনা ফলে। গার্মেন্টসের একজন সামান্য চাকরিজীবী থেকে দেশের শীর্ষ ব্যবসায়ী এবং ব্যবসায়ী নেতাদের সংগঠনের প্রধান, টেলিভিশনের সফল এবং ঈর্ষনীয় উপস্থাপক, মানুষকে মোহাবিষ্ট করে রাখার মতো কথার জাদুকর, অসাধারণ সম্মোহনী ক্ষমতা, মানুষের প্রতি মমত্ববোধ, সংবেদনশীলতা-সব গুণই ধারণ করতেন আনিসুল হক।
আবার এই সংবেদনশীল মানুষটিই যখন একটি মহানগরীর মেয়র, তখন তিনি দৃঢ়চেতা, অকুতোভয়, নিরাপস, অন্যায়ের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ানো সিংহপুরুষ। অনেকে বলার চেষ্টা করেন যে তিনি সেনাপ্রধানের ভাই, তাই মাফিয়া ও দুর্নীতিবাজদের বিরুদ্ধে এত সাহস দেখাতে পেরেছেন। কথাটি হয়তো আংশিক সত্য। কিন্তু তারও চেয়ে বড় সত্য, মানুষের প্রতি কমিটমেন্ট না থাকলে সেনাপ্রধান কেন, প্রধানমন্ত্রীর ভাই হলেও লাভ নেই। ব্যক্তিগতভাবে আমি এটা বিশ্বাস করি, আনিসুল হক যদি সেনাপ্রধানের ভাই না-ও হতেন, তা-ও তিনি এই কাজগুলোই করতেন। কারণ তিনি চারিত্রিকভাবেই এমন সাহসী, দৃঢ় ব্যক্তিত্বের অধিকারী। সুতরাং এই নগরীর মানুষ এমন একজন তীক্ষè মেধাবী, ক্ষুরধার ব্যক্তিত্বসম্পন্ন সাহসী মেয়র, যিনি কাজ করে দেখাতে পছন্দ করেন, যিনি শুধু নিজে স্বপ্ন দেখেন না বরং মানুষকেও সেই স্বপ্নের সারথি করেন, এমন দরদি মেয়র এই শহরের মানুষ আবার কবে পাবে? বছর কয়েক আগেও আমরা এই মহানগরীতে পর্যাপ্ত ও মানসম্মত পাবলিক টয়লেট না থাকার যে আক্ষেপ করতাম, এখন সেখানে ঝকঝকে পাবলিক টয়লেট রাস্তার পাশেই দেখতে পাই, যেখানে ৫ টাকা দিয়ে টয়লেট করতে হলেও সেখানে ঢুকলেই মনটা ভালো হয়ে যায়। পাবলিক টয়লেট মানেই দুর্গন্ধ, কাদাপানিতে সয়লাব আর ইজারাদারের গলা খাকানোর চিরাচরিত দৃশ্য বদলে গেছে। তাঁর আরেকটি বড় কাজ নিশ্চয়ই ঢাকার আকাশ বিলবোর্ডের জঞ্জালমুক্ত করা।
গুলশান-বারিধারার মতো অভিজাত এলাকার ফুটপাত দখলমুক্ত করতে আনিসুল হক যেসব অভিযান চালিয়েছেন, যেভাবে ক্ষমতাবানদের চ্যালেঞ্জ করেছেন, তা বিস্ময়ের। গুলশানে হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার পর থেকেই গুলশান ও বনানীর নিরাপত্তা বাড়ানোর উদ্যোগ নেন তিনি। এ জন্য গুলশান এলাকায় নিয়ন্ত্রিত নিবন্ধিত রিকশা চালু এবং গুলশানের ভেতর দিয়ে বিভিন্ন রুটে চলাচলকারী বাসের রুট পারমিট বাতিল করে শুধু গুলশান-বনানীতে চলাচলকারী ‘ঢাকা চাকা’ নামে আলাদা বাসের ব্যবস্থা করেন। তেজগাঁও, মহাখালী, গুলশান, বনানী, মিরপুর, মোহাম্মদপুরসহ বিভিন্ন এলাকায় অনেক সড়ক ও ফুটপাত দখল করে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের অফিস নির্মাণ করা হয়েছিল। মেয়রের নির্দেশে সেগুলোও উচ্ছেদ করা হয়। মাত্র দুই বছরেই তিনি তাঁর নির্বাচনী এলাকায় যে ধরনের পরিবর্তনের আভাস দিয়েছিলেন, তাতে পাঁচ বছর মেয়াদ পূর্ণ করতে পারলে তিনি যে বলেছিলেন এই শহরের চেহারা বদলে দেবেন, সেটি নিশ্চয়ই করে দেখাতেন। কিন্তু দুর্ভাগ্য এই নগরীর মানুষের, যে মানুষটির অন্তত ১০ বছর দায়িত্বে থাকা উচিত ছিল, তিনি আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন মাত্র দুই বছর দায়িত্ব পালন করেই। আমরা হাজারো কেঁদেকেটেও তাঁকে আর পাব না।
আনিসুল হক হয়তো সব বদলে দিতে পারতেন না। কিন্তু বদলে দেওয়ার মানসিকতা, ইচ্ছা ও কৌশল তাঁর ছিল। সাধারণ মানুষের মনে এই বিশ্বাস তিনি তৈরি করে দিয়েছিলেন যে সদিচ্ছা থাকলে অনেক বড় সমস্যাও মোকাবিলা করা যায়। এমন মানুষ, এমন জনপ্রতিনিধি আমরা আর কবে পাব?
ঢাকাকে বদলে দিতে তিনি যে লড়াই শুরু করেছিলেন, সেটি কি তাহলে অসম্পূর্ণই থেকে গেল? কে হবেন তাঁর উত্তরসূরি? তিনি এই লড়াই অব্যাহত রাখতে পারবেন কি? তিনি কি ঢাকা বদলে দেওয়ার সেই যুদ্ধ জারি রাখবেন বা রাখতে পারবেন? যদি পারেন, তাহলে সেটিই হবে আনিসুল হকের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের সবচেয়ে ভালো উপায়।

Disconnect