ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘বড় লোকগো মায়া-দয়া নাই’
দীপংকর গৌতম

পথে হাঁটতে হাঁটতে পরিচয়। ৫ টাকা দেওয়ার চেয়ে কিছু একটা কিনে দিলে খুব খুশি হয় আয়েশা। একখানা রুমাল দিতে চায়। সবকিছু মিলিয়ে মনে হয় মেয়েটার আদরের খুব অভাব। একটু মাথায় হাত বোলালেই কেঁদে ওঠে। ওর কাজের এলাকা মহাখালী রেলগেট থেকে কাকলীর ডিভাইডার। মহাখালী ডিওএসএইচের ভেতরে কোনো গার্মেন্টস বা বায়িং হাউস থেকে ৬ থেকে ৮ টাকা করে বিভিন্ন মাপের রুমাল কিনে ১০ টাকায় বিক্রি করে। তার পুঁজি ২০০ টাকা। এর মধ্যে যে কয়টা রুমাল পায় তা ফুরালে আবার কিনে আনে। সন্ধ্যা পর্যন্ত বিক্রি করে। অনেকে রুমাল না নিলেও আয়েশার মায়াভরা মুখ দেখে এমনি দিয়ে দেয়। অনেকে কাজের জন্য নিতে চায়, কেউ মেয়ে হিসেবে নিতে চায়। কিন্তু ওর ভয় করে। আয়েশা বলে, ‘বুজ্জেন স্যার, বড় লোকগো মায়া-দয়া নাই। গাড়িতে কইরা ভালো কথা কইয়া নিয়া গরম খুন্তি দিয়া ছ্যাঁকা দেয়। মারে। পরে চোখ, কিডনি বেইচ্চা দেয়।’ এসব কে বলেছে? জিজ্ঞেস করলে বলে, ‘মা কইছে। টেলিভিশনেও দেখছি।’ হাসিমুখের আয়েশার চারদিক অন্ধকার। আপন বলতে কেউ নেই। আয়েশার বাবার গ্রামের বাড়ি ভোলার দৌলতখান। কবে সেখান থেকে এসেছিল মনে নেই। তারা দুই বোন। মা বাসায় কাজ করতেন আর বাবা ছবের আলী রিকশা চালাতেন। বাবা মাকে প্রায়ই মারতেন। মাকে মারার সময় তারা কাঁদলে তাদেরও মারতেন। বাবা লোক ভালো নন, তার খালা ও পাশের বাসার লোকেরা বলেছেন। ‘মার নাকি খালি মাইয়া অয়। এডা নাকি মার দোষ।’ আয়েশা জিজ্ঞেস করে, ‘স্যার, মাইয়া অওন খারাপ?’ আমি উত্তর দিই, খারাপ হবে কেন? সবাই তো মানুষ। এ সময় এক নারী গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছিলেন। আমি তাঁকে বোঝাই এই নারীর গাড়ি চালানো আর পুরুষের গাড়ি চালানোর  মধ্যে তফাত আছে? আয়েশা কোনো কিনারা খুঁজে পায় না। আয়েশা জানায়, একদিন রাতে তার বাবা তার মাকে খুব মারলেন। আয়েশা সেদিন ভয়ে পাশের ঘরে গিয়ে পালাল কাঁদতে কাঁদতে। ‘পাশের বাসার খালা বলল, আব্বা নাকি বিয়ে করতে চায়। আম্মা তার বিরোধিতা করে বলে এভাবে মারে। সেই রাতে খুব মার খেল মা।’ অনেক রাতে বাসায় এসে তারা না খেয়েই ঘুমিয়ে পড়ল। সেদিন ঘুম থেকে উঠে আয়েশা দেখে তার মা বিছানায় নেই। সে ভাবে, মনে হয় কাজে গেছে। ‘কিন্তু মায়ের আশায় থাইক্কা থাইক্কা না খাইয়া রইছি। মা কোথায় জানি না। এহনো হ্যারে খুঁজি’ বলে কাঁদতে থাকে আয়েশা। তার মা চলে যাওয়ার পর তার বাবা তাকে এক বাসায় কাজে দিতে চেষ্টা করেন। আয়েশা যেতে চায় না। তার বাবা সেই বাসা থেকে আগেই টাকা এনেছিলেন তাকে কাজে দেবেন বলে। এ জন্য তাকে বেশি বেশি মারত। আয়েশা একদিন পালিয়ে তার খালার বাসায় চলে যায়। খালা চোখে দেখেন না, অন্ধ। ঘরে অভাব। দুদিনের মধ্যেই খালা তাকে চলে যেতে বলেন। আয়শা কোথায় যাবে? সারা দিন হেঁটে মাকে খোঁজ করত। ‘বস্তিতে সবাইরে মায়ের মতো দেহায়। কিন্তু আসলে কেউ মা নয়।’ আয়েশার কথায় দার্শনিকতা ফুটে ওঠে। খালাতো ভাই জিয়াদ রুমাল বেচে দেখে আয়েশাও রুমাল বেচা শুরু করে একসময়। এখন গাড়ি থামলেই দৌড়ে যায় রুমাল নিয়ে। প্রতিদিন ২০০ থেকে ৩০০ টাকা আয় করে। টাকা দিয়ে কী করো? জিজ্ঞেস করলে আয়েশার সরল স্বীকারোক্তি, ‘স্যার, ভালো খাই নাই তো। তাই খালি ভালো খাওন খাইতে ইচ্ছা করে। আমি হোটেলে যাইয়া ভালো খাওন পেট ভইরা খাই। মারে পাইলে হ্যারেও খাওয়ামু। মারেও কুনোদিন ভালো খাইতে দেহি নাই। খালি মাইর খাইছে।’ গাড়ির সিগন্যাল পড়লে ‘যাই স্যার,’ বলে গাড়ির ভিড়ে মিশে যায় আয়েশা জিয়াদসহ আরও কয়েকজন। আমি তখন আইএলও কনভেনশন বিষয়টা কী, বোঝার চেষ্টা করি।

Disconnect