ফনেটিক ইউনিজয়
পথে পথে
‘মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিতে চায়’
দীপংকর গৌতম
মণি মণ্ডল ও তাঁর শিল্পকর্ম
----

তাঁর নাম মণি মণ্ডল। মুখে খোঁচা খোঁচা কাঁচা-পাকা দাড়ি। সুঠাম শরীর। বয়সের ছাপ পড়েছে। গুনে গুনে বললেন, বয়স ৬৩ বছর। লম্বা মানুষ। টান টান কথা বলেন। চলনে বলনে একটা সূক্ষ্ম ঔদ্ধত্য কাজ করে। বাড়ি সাগরপারে। সমুদ্রের গর্জন শুনে ঘুম আসে, ঘুম ভাঙে তার। গ্রামের নাম রূপধন। এই রূপধনের মোহ তাঁকে কখনো ছাড়েনি। ১৯৭১ সাল সারা দেশের মতো রূপধনেও হানাদার বাহিনী পৌঁছে যায়। তাঁর বয়স তখন ১৫ বা ১৬। এসএসসি পরীক্ষার্থী। চারদিকে অত্যাচার, হত্যা, খুন চলছে। মণি মণ্ডলের রূপধন তখন জ্বলছে। অবশেষে যুদ্ধে যাওয়ার প্রস্তুতি। মণি মণ্ডল বলেন, ‘যুদ্ধে যেতে হবে পণ করলাম। কিন্তু বাবা ও ছোট বোনকে কোথায় রেখে যাব। অন্যদিকে আমার গতিবিধি দেখে রাজাকাররা অনুমান করে, এখান থেকে দূরে যাওয়ার চেষ্টা করছি। পিস কমিটি ও বর্বর পাকিস্তান বাহিনী আমাকে খুঁজতে শুরু করে। আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে পালিয়ে বাঁচলেও শেষ রক্ষা হবে না বুঝতে পারি। তখন প্রশিক্ষণ নিতে সবাই যাচ্ছে। একদিন ঘরের তিনজনসহ পাড়ি জমাই মঠবাড়িয়ার উদ্দেশে। মঠবাড়িয়া, গুলিসাখালিতে সমস্যা না হলেও চরদোয়ানীতে আমি রাজাকারদের হাতে ধরা পরলাম। ভাবলাম এবারই বোধ হয় শেষ। কিন্তু না, ১০ ঘণ্টা আটকে রাখে তারা। পিস কমিটির পোস্টমাস্টারের বউ আমাকে মুক্ত করার ব্যবস্থা করে দেয় বাবা, বোন ও আত্মীয়স্বজনের কান্নাকাটিতে। সেই রাতেই আমরা সুন্দরবনের বগীতে যাই। বাবা-বোনকে রেখে যাই মঠবাড়িয়ায়। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধাদের সহযোগিতায় রেয়াজদ্দিনের নৌকায় ২২ দিনে ভারতের ঝরখালি পৌঁছাই। সুন্দরবনে যখন অবস্থান করছিলাম, জানতে পারি আমার বাড়ি পুড়িয়ে দিয়েছে এলাকার খলিল মিয়া। খানসেনারা আমার জেঠা শরৎ মণ্ডলকে গুলি করে মারে। ভারতের ঝরখালি থেকে কেনিং হয়ে হাওড়ায় ভাইয়ের বাসায় উঠি। বাসায় বাবাকে চিঠি লিখে পালিয়ে যাই মুক্তিযুদ্ধে। ২০ শে অক্টোবর পৌঁছি হাসনাবাদ আমলানী ক্যাম্পে। গিয়ে দেখি পাশের বাড়ির মান্নান, খলিল, ইউনুস (তালিকায় নাম নেই), বাদশা পহলান, দেবরঞ্জনসহ মঠবাড়িয়ার আরও অনেকে। প্রশিক্ষণ শেষে ৯ নম্বর সেক্টরে যোগদান করি।’
কিন্তু এখন স্বাধীন দেশে এই বীর যোদ্ধার মুক্তিযুদ্ধ করাটা কাল হয়ে দেখা দিয়েছে। বাড়িঘর সহায়-সম্পত্তি দখলের উদ্দেশ্যে মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে তাঁর নাম বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চলছে। একটি বিশেষ মহল তাঁকে চাপ দিচ্ছে দেশ ছেড়ে যাওয়ার। প্রাণনাশের হুমকি দিচ্ছে। আর অপমান যে কতভাবে করা যায়, তার ইয়ত্তা নেই। এই দেশপ্রেমিক বীর যোদ্ধা ১৯৭৯ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে ভাস্কর্য বিভাগে এমএএফএ করে ১৯৮৩ সালে বের হন। নগর সভ্যতাকে বিদায় জানিয়ে নিজ গ্রাম রূপধন চলে যান। সেখানে বসে জমিতে ফসল ফলান আর শিল্পচর্চা করেন। এলাকার ঝাড়ামুড়ার মাটির নিচে পাওয়া কালো কাঠের ওপর কাজ করেন নিরন্তর। রূপধন আর্ট স্কুল নামের একটা স্কুল আছে তাঁর। কিন্তু দুই ছেলেমেয়ে আর স্ত্রী নিয়ে তাঁর সুখের সংসার নষ্ট করতে তৎপর একটি মহল।
তাঁর মুক্তিযোদ্ধা সার্টিফিকেটও আছে। বর্তমানে মুক্তিযোদ্ধাদের তালিকা যাচাই-বাছাই করে নতুন তালিকা প্রকাশ করা হচ্ছে। আর রহস্যজনক কারণে সেই তালিকা থেকে মণি মণ্ডলের নাম বাদ দেওয়ার পাঁয়তারা চলছে।
মণি মণ্ডলের সম্পত্তি আত্মসাতের অসৎ উদ্দেশ্যে একদল লোক তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, তিনি প্রকৃত মুক্তিযোদ্ধা নন। অভিযোগের প্রমাণ হিসেবে বলা হয়, মণি মণ্ডলের বাবার নাম দেবেন্দ্রনাথ মণ্ডল হলেও মুক্তিযোদ্ধা তালিকার গেজেটে যে মণি মণ্ডলের নাম রয়েছে, তাঁর বাবার নাম বীরেন্দ্রনাথ মণ্ডল। অতএব, এই মণি মণ্ডল মুক্তিযোদ্ধা মণি মণ্ডল নন।
অভিযোগের ভিত্তিতে তদন্ত হলে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে সব প্রমাণপত্র মণি মণ্ডলের রয়েছে। গেজেটে বাবার নাম ভুল ছাপা হওয়াটা নিতান্তই প্রিন্টিং মিসটেক বা ছাপার ভুল। মণি মণ্ডল জানান, তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ প্রমাণিত না হলেও দুষ্টচক্রটি বসে নেই। তারা এখনো তাঁর নাম মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চক্রান্ত চালিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, ‘আমার সহায়সম্পত্তি দখল করাই ওদের উদ্দেশ্য। আমাকে সংখ্যালঘু বানিয়ে দেশ থেকে তাড়াতে চাইছে। আমি তো সেভাবে দেশ ছাড়ব না। এ মাটি আমার। আমার সাত পুরুষের ঘামের গন্ধ এ মাটিতে। বললেই চলে যাব? কিন্তু ওরা আমাকে মেরে ফেলতে চায়। মুক্তিযোদ্ধা তালিকা থেকে আমার নাম বাদ দিতে চায়, সেটা পারলে কাজটা তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।
‘’৭১-এ সহযোদ্ধা বাদশা পহলান এখন আমার বিরুদ্ধে অভিযোগকারী। তার রয়েছে একটি সংঘবদ্ধ বাহিনী। যখন যে সরকার আসে, সে সরকারের কাছের লোকদের সাহায্যে সে জমিজমা দখল করেই চলেছে। সে আমার ও সংখ্যালঘু হিন্দু সম্প্রদায়ের অনেকের জমি জোর করে ভোগদখল করে খাচ্ছে। এখন সব চায় সে। পাথরঘাটা অঞ্চলের ত্রাস বার আওলিয়া নামক ভূমিদস্যু বাহিনীর নেতা এই বাদশা পহলান। আমাকে মুক্তিযোদ্ধার তালিকা থেকে বাদ দিতে পারলেই আমার ওপর নানামুখী অত্যাচার করবে। যাচাই-বাছাই কমিটির সদস্যরা লাখ টাকা চাঁদা দাবি করছে। বারবার তিনি একটা আকুতি জানাচ্ছিলেন, আপনাদের কাছে আমার আকুল আবেদন, বাদশা বাহিনী (১২ আওলিয়ার) হাত থেকে বাঁচান। মুক্তিযোদ্ধা তালিকায় যাতে সম্মানে থাকতে পারি, তার ব্যবস্থা করার জন্য বিশেষ অনুরোধ জানাচ্ছি।’
‘গত ২৪ ফেব্রুয়ারি আমার একটি পুকুরের মাছ ধরে নিয়েছে বাদশা বাহিনীর লোকেরা। আমার জমি ও ভোগ করে।’ এ অবস্থায় খুব বিপন্ন বোধ করছেন জানিয়ে মুক্তিযোদ্ধা মণি মণ্ডল সরকারের সর্বোচ্চ মহলের সহায়তা কামনা করেছেন। তিনি এখন আতঙ্কিত। একজন শিল্পী, মুক্তিযোদ্ধার এই অবস্থা নিশ্চয়ই স্থানীয় প্রশাসন জানে। জানেন সরকারদলীয় লোকজন। তারপরও এ অবস্থা কীভাবে থাকে, সেটা বোধগম্য নয়। কথা শেষ করে মণি মণ্ডলকে বলি, যারা আপনার বাড়ি, জমি  দখল করতে চায়, তাদের নাম লিখলে আপনার সমস্যা হবে না? কত সময় চুপ থেকে তিনি বলেন, ‘লিখে দেন। এমনিতে তো প্রায় প্রতিদিন অপমান করে। এটা ছাপা হলে আবার নাহয় একবার করবে। করুক।’

আরো খবর

Disconnect